ফুলমণি ও করুণার বিবরণ
হানা ক্যাথেরিন মুলেন্স
ভূমিকা
প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলালকে (১৮৫৮) বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস বলা হয়। আবার কেউ বলেন, এটি প্রথম উপন্যাস নয়, প্রথম উপন্যাস ইউরোপিয়ান খ্রিস্টান মিশনারি হানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্সের লেখা ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’। হানা রচিত ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ ১৮৫২ সালে ক্যালকাটা ক্রিশ্চিয়ান ট্রাক্ট অ্যান্ড বুক সোসাইটি থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। খ্রিস্টান নীতিবোধ ও ধর্মীয় চেতনা এবং খৃস্ট ধর্মের মাহাত্ম্য প্রচারই ছিল এই গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য। কথ্য বাংলা এবং উত্তম পুরুষের লেখা এই গ্রন্থের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন খ্রিস্টান মিশনারি মহিলা। হানা খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত দুটি বাঙালি পরিবারের দুই মহিলার ছবি এঁকেছেন এই গ্রন্থে, তাদের একজন ফুলমণি আর অন্যজন করুণা। দেখিয়েছেন খ্রিস্টে যার আস্থা গভীর, সে সুখে থাকে এবং যার আস্থা নেই, সে থাকে কষ্টে।
অধ্যায় বিভাগ
| প্রথম অধ্যায় | |
| দ্বিতীয় অধ্যায় | |
| তৃতীয় অধ্যায় | |
| চতুর্থ অধ্যায় | |
| পঞ্চম অধ্যায় | |
| ষষ্ঠ অধ্যায় | |
| সপ্তম অধ্যায় | |
| অষ্টম অধ্যায় | |
| নবম অধ্যায় | |
| দশম অধ্যায় |
প্রথম অধ্যায়
কএক বৎসর হইল আমি বঙ্গদেশের মফ:শলে নদী তীরবর্তি এক নগরে বাস করিতাম। সেই নগরের নাম এই স্থানে লিখিবার আবশ্যক নাই। তথাহইতে প্রায় অর্দ্ধ ক্রোশ দূরে এদে-শীয় খ্রীষ্টিয়ান লোকদের এক গ্রাম আছে; ঐ গ্রামস্থ ভাতা ও ভগিনীদের সহিত আমার যে সুখজনক আলাপ এবং ধর্মের বিষয়ে কথোপ-কখন হইত, তাহা আমি অদ্যাবধি স্মরণে রাখিয়া স্বর্গস্থ পিতার ধন্যবাদ করিয়া থাকি; কারণ তৎ-কালে তাহাদের চরিত্র দেখিয়া ও কথা শুনিয়া আমার বিশ্বাসের বৃদ্ধি হইল, এবং খ্রীষ্টের শিষ্য-দের কিং করা কর্তব্য এবিষয়ে আমি পূর্বাপেক্ষা সুশিক্ষিতা হইলাম।
ধর্মপুস্তক পাঠ করিলে আমরা দেখিতে পাই যে পরমেশ্বর প্রাচীন ধার্মিক লোকদের চরিত্র বর্ণনা করণদ্বারা আপন মণ্ডলীস্থ লোকদিগকে বিশেষরূপে শিক্ষা দেন, তাহাতে যেন তাহারা ঐ ধার্মিক ব্যক্তিদিগকে নিদর্শন স্বরূপ জানিয়া তাহাদের ন্যায় সদাচারী হইতে চেষ্টা করে। ইহা জ্ঞাত হইয়া আমি বিবেচনা করিলাম, যদি উক্ত খ্রীষ্টিয়ানদের চরিত্রের বিষয়ে কিঞ্চিৎ২ লিখি, তবে ঈশ্বরের আশীর্বাদে বঙ্গদেশস্থ ভগিনীরা তাহা পাঠ করিয়া পারমার্থিক লাভ ও সন্তোষ পাইতে পারিবে। এই অভিপ্রায়ে আমি এ ক্ষুদ্র পুস্তক রচনা করিতেছি।
আপন পরিবারের সহিত উক্ত নগরে পৌঁছি-বামাত্র আমি প্রথমে সেই স্থান নিবাসি মিশনরি পাদরি সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলাম। পরে অন্যান্য বিষয়ে নানা প্রকার কথা কহিয়া আমি সাহেবকে বলিলাম; মহাশয় এই নগরের মধ্যে আমি নূতন আসিয়াছি, এখানে কাহাকেও চিনি না। অনুগ্রহ করিয়া বলুন, আপনার বিবে-চনাতে কোন সাহেব ও বিবিরা ধার্মিক বোধ হয়, কারণ আমি এমত লোকদের সহিত মিত্রতা করিতে চেষ্টা করিব। অন্যের সহিত বড় একটা আলাপ করিতে চাহি না।
পাদরি সাহেব উত্তর করিলেন; হায়! এই স্থানে যে ইরাজ লোকেরা আছে তাহাদের মধ্যে দুই এক জন মাত্র ঈশ্বরকে ভয় করিয়া তাঁহার আদেশ পালন করে, অন্য সকলে সাংসারিক কার্য্যেতে ও নানা প্রকার কৌতুকাদিতে মত্ত আছে। কিন্তু অতি নিকটবর্তি বাঙ্গালি খ্রীষ্টিয়ান-দের যে গ্রাম আছে, তাহাতে কএক জন এমত ধার্মিক লোক বাস করে যে তাহাদের বিষয়ে যথার্থ বলিতে পারি, তাহারা খ্রীষ্টের মণ্ডলীর অলঙ্কার স্বরূপ হইয়াছে।
ইহা শুনিয়া আমিঐ খ্রীষ্টিয়ান লোকদের বিষয়ে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিয়া মনে স্থির করিলাম, যে অবকাশ পাইবামাত্র আমি তাহাদের নিকটে গিয়া তাহাদের সহিত আলাপাদি করিব।
পর দিবসে দৈবাৎ আমার স্বামিকে কোন ডাকাইতের দলের বিষয়ে তত্ত্ব করিবার কারণ গৃহ ত্যাগ করিয়া পল্লীগ্রামে যাইতে হইল, তাহাতে সন্ধ্যাকালে আমার মনে বড় ঔদাস্য হইলে খ্রীষ্টিয়ান গ্রামে গিয়া তথাকার লোকদের সহিত পরিচয় ও কথোপকথন করিতে মনে স্থির করিলাম। আমার বাটীহইতে উক্তগ্রাম প্রায় অর্দ্ধ ক্রোশ দূর; কিন্তু সে দিন বড় উত্তম এবং শীতল বায়ু বহিতেছিল, এই কারণ আমি গাড়ীতে না চড়িয়া এক জন চাপ্রাসিকে সঙ্গে লইয়া পদব্রজে চলিলাম।
গ্রামে প্রবেশ করিয়া প্রথমে চারি পাঁচখানা কুঁড়ে ঘর দেখিতে পাইলাম। তাহাদের উঠান অপরিষ্কার এবং তাহাদের সম্মুখে উলঙ্গ বালকেরা কাদা ও ধূলা দিয়া খেলা করত পুত্তলাদি গড়ি তেছিল। সেই সকল ঘর যে খ্রীষ্টিয়ান লোকদের বাসস্থান তাহার একটিও চিহ্ন দেখিলাম না, বর হিন্দু লোকদের বাটী তাহাদের অপেক্ষা পরিষ্কার ও শোভিত ছিল। এই কারণ আমি তাহাদের মধ্যে প্রবেশ না করিয়া অগ্নে চলিয়া গেলাম।
কিঞ্চিৎ দূরে গিয়া একটি অতি পরিষ্কার ও পরিপাটী খোলার ঘর দেখিয়া বড় সন্তুষ্টা হই-লান, এবং ঐ ঘর নিবাসিদের পরিচয় লইতে উত্তম সুযোগ পাইলাম; অর্থাৎ আমি দেখিলাম যে ঐ ঘরের নিকটবর্তী কোন বৃক্ষের ডালের উপরে এক লোহার ভাঁড় ঝুলিতেছে, তাহাতে একটি হরিদ্বর্ণ টিয়াপাখী শিকল দ্বারা বাঁধা থাকাতে কাক সকল তাহাকে চক্ষুদ্বারা অতিশয় ক্লেশ দিতেছে। ইহা দেখিবামাত্র আমি পাখিকে ভাঁড় সহিত নামাইয়া উঠানের মধ্যে উপস্থিতা হইলাম। আমার আগমনের শব্দ গুনিয়া এক জন অর্দ্ধবয়স্কা স্ত্রীলোক বাহিরে আইল। তাহার মাথার চুল চুল সুন্দররূপে বাঁধা ও তাহার পরিধেয় শাড়ি অতিশয় পরিষ্কার ছিল।
আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ওগো এটা কি তোমার পাখী? কাক সকল ইহাকে বড় দুঃখ দিতেছিল, এজন্যে আমি ইহাকে বাটীর ভিতরে আনিয়াছি। স্ত্রীলোক উত্তর করিল, বিবি সাহেব, আপনকার বড় অনুগ্রহ। এ আমার পাখী বটে, আমার পুত্র ভুলিয়া বাহিরে ফেলিয়া গিয়াছে। ইহা বলিয়া সে পক্ষির সকল এলোমেলো পালখ গুলিতে হাত বুলাইয়া সমান করিল, এবং বোধ হইল যে পক্ষী তাহার কর্ত্রীকে ভালৰূপে চিনিত, কারণ সে তাহাকে না কামড়াইয়া তাহার বস্ত্রের মধ্যে লুকাইতে চেষ্টা করিল।
পরে ঐ স্ত্রী আমার প্রতি কিরিয়া জিজ্ঞাসিল, মেম সাহেব, আপনি আমাদিগের পাড়ার মধ্যে কি দেখিতে আসিয়াছেন? পাদরি সাহেবের মেম ভিন্ন আর কেহ এখানে আইসেন না। তাহাতে আমি উত্তর করিলাম, এ বড় দুঃখের বিষয়, কারণ বাঙ্গালি খ্রীষ্টিয়ানদের হিত চেষ্টা করা বিলাতীয় লোকদের অবশ্য কর্তব্য। আমি নূতন মেজিস্ট্রেট সাহেবের বিবি, যিনি গত মাসে আমুতলায় বড় দোতালা বাটী ভাড়া লইয়াছেন। কল্য আমি তোমাদের পাদরি সাহেবের নিকটে এই খ্রীষ্টি-য়ানদের গ্রামের বিষয় শুনিয়া অদ্য তোমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছি। ইহা শুনিয়া সেই স্ত্রীলোক বলিল, বোধ হয় বিবি সাহেব, আপনি গাড়ী চড়িয়া আসিয়াছেন?
আমি উত্তর করিলাম, না, আমি নদীর শীতল বায়ু সেবন করিতে ইচ্ছা করিয়া চাপ্-রাসিকে সঙ্গে লইয়া হাঁটিয়া আসিয়াছি; কিন্তু তোমাদের গ্রাম যে এতদূরস্থ তাহা আমি জানি-তাম না, এই কারণ চলিতে২ বড় শ্রান্তা হইয়াছি। ত্তমি যদি আমাকে একটি আসন খুঁজিয়া দিতে পার, তবে আমি কিঞ্চিৎকাল বসিয়া বিশ্রাম করি। তাহাতে সে ঘরের ভিতরে শীঘ্র গিয়া একখান পুরাতন চৌকি বাহির করিয়া আনিল। বোখ হয় ঐ চৌকি কেবল মান্য লোকদের নিমিত্তে তোলা থাকিত, কারণ তাহার উপরে কিঞ্চিৎ খুলা ছিল; কিন্তু এক নিমিষের মধ্যে ঐ স্ত্রी সকল ধূলা অঞ্চলদ্বারা ঝাড়িয়া অতি সুশী-লতা পূর্বক আমাকে বলিল, মেম সাহেব, আপনি অনুগ্রহ করিয়া বসুন, আমি আপনাকে আগেই চৌকি দিতাম, কিন্তু মেজিস্ট্রেট সাহে-বের বিবি এমত দরিদ্রের গৃহে কখন বসিবেন না; এই অনুমান করিয়া পূর্বে কিছু বলিতে সাহস করিলাম না।
আমি তখনি দাবাতে চৌকি লইয়া বসি-তেছি, এমত সময়ে সেই স্ত্রীর একটি ছোট বালক গৃহের মধ্যে কান্দিয়া উঠিল। তখন সে তাহাকে আনিবার নিমিত্তে ঘরের ভিতরে যাওয়াতে আমি কিঞ্চিৎ কাল একা থাকিয়া উঠানের মধ্যে যাহা২ ছিল তাহা দৃষ্টি করিতে সুযোগ পাইলাম। তাহার চত্তর্দিগের বেড়া নূতন দরমা ও নূতন বাঁশ দিয়া বাঁধা ছিল, এবং তদুপরি একটি সুন্দর ঝিঙা লতা উঠিয়াছিল। উঠানের এক পার্শ্বে গোৰুর একখানি ঘর দেখা গেল, তাহার মধ্যে একটি গাভি ও বৎস ধীরেখ জাওনা খাইতেছে। গোশালার হাতের উপরে অনেক পাকা লাউ দেখিলাম। উঠানের অন্য দিগে পাকশালা ছিল, এবং তাহার দ্বার খোলা থাকাতে আমি দেখিতে পাইলাম তন্মধ্যে তিন চারিটি সুমার্জিত খালা ও ঘটি এবং কএকখান পরিষ্কার পাথরও রাশীকৃত আছে। উঠান সুন্দররূপে পরিষ্কৃত ছিল, তাহাতে যেমন প্রায় সকল ঘরে রীতি আছে তেমন কোন কোণে জঞ্জালের রাশি দেখিতে পাইলাম না; সকল সমান পরিষ্কার ছিল। দাবার সম্মুখে ঘরের হাঁচির নীচে দশ বারটি চারা গাছ গাল্লাতে সাজান দেখিলাম; তাহার মধ্যে তিন চারিটি ঔষধের গাছ ছিল, অন্য সকল গ্যাঁদা তুলসী গন্ধরাজ ইত্যাদি। একটি অতি সুন্দর চীন গোলাপের চারাও ছিল, তাহাতে কুঁড়ি ও ফুল ধরিয়াছিল।
এই সকল দেখিতেছি এমত সময়ে বাটীর গৃহিণী পুনর্বার বাহিরে আসিয়া আমার চৌকির নিকটে দাঁড়াইল; পরে আমি তাহাকে বসিতে বলিলে সে আপন দ্বারের চৌকাঠের উপরে বসিয়া হেল্যাকে দুগ্ধ পান করাইতে লাগিল। সেই পুত্রসন্তান দেখিতে সুন্দর; এবং অনুমান হইল তৎকালে তাহার বয়ক্রম প্রায় এক বৎসর হইবে। তাহার গায়ে গরম কাপড়ের কুর্তী ছিল, এবং তাহার মাতাও একটা কোর্তা পরিয়াছিল। বোধ হয় যদ্যপি সকল খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোক এইরূপ উপযুক্ত বস্ত্র ব্যবহার করে তবে ভাল হয়; দুই আনা পয়সাতে একটা কোর্তার কাপড় ক্রয় করা যায়, তাহার মূল্য অধিক নয়, এবং কিঞ্চিৎ শিল্প বিদ্যা শিক্ষা করিলেই তাহা অনা-য়াসে ঘরে প্রস্তুত করা যায়।
সে যাহা হউক, ঐ স্ত্রীলোক বসিলে আমি তাহার সহিত কথোপকথন করিতে ২ জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার নাম কি? তোমার স্বামী কি কর্ম করে? ও তোমার কয়টি সন্তান? সে উত্তর করিল, আমার স্বামী পাদরি সাহেবের নিকটে হরকরার কর্মে নিযুক্ত থাকিয়া চিঠী লইয়া বেড়ান, এবং সাহেবেরা স্কুলের কার্য্য নির্বাহ করিবার কারণ যে২ দান করিয়া থাকেন, সে টাকা তাঁহাকে মাসে২ সংগ্রহ করিতে হয়; এব কখন ২ বা পাদরি সাহেবের নিমিত্তে নানা প্রকার দ্রব্য ক্রয় করিতে কলিকাতায় যাইতে হয়। আমার নাম ফুলমণি, আমার দুই পুত্র ও দুই কন্যা আছে।
কুলমণি আরো কথা বলিত, কিন্তু এমন সময়ে আর এক জন স্ত্রীলোক বহির্ভারে শত্রুরূপে আঘাত করিয়া ভিতরে আইল। তাহার কাপড় বড় ময়লা, এবং চুল বাঁধা না থাকাতে মস্তকের চতুর্দিগে পড়িয়াছিল। সে আমার মুখপানে কিঞ্চিৎকাল অসভ্যৰূপে তাকাইয়া ফুলমণির প্রতি কিরিয়া কুফাস্ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, উনি কে? কলমণি বলিল, ইনি নূতন মেজিস্ট্রেট সাহেবের বিবি।
এই কথা শুনিয়া ঐ স্ত্রীলোক কিঞ্চিৎ ভয় পাইয়া আমাকে অতি নম্রতা পূর্বক সেলাম-করিল; পরে সে ফুলমণিকে ধীরে বলিতে লাগিল, ফুলমণি, তোমার কপাল বড় ভাল। সকল সাহেব লোকেরা তোমাকেই ভাল বাসেন, আমার প্রতি কেহই দয়া করেন না। তাহাতে ফুলমণি কোন উত্তর না দিয়া বলিল, সে যাহা হউক, করুণা ত্তমি এই স্থানে এমত ব্যস্ত হইয়া কেন আইলা? কৰুণা বলিল, চড়চড়ি রন্ধন করিবার নিমিত্তে কিছু তৈল তোমার নিকটে চাহিতে আসিয়াছি, যরে একটিও পয়সা নাই, আমার পুত্র এখনি কতকগুলিন চুনা মাহ ধরিয়া আনিয়া দিল, সেই গুলিন এই বেলার মত রন্ধন করিব। আমার স্বামিকে তো জান; সে আমাকে কিছু খরচ দেয় না, তথাপি খাইতে না পাইলে সমস্ত রাত্রি তিরস্কার করিতে থাকে।
ফুলমণি বলিল, এ বড় মন্দ বটে, কিন্তু তোমার পয়সা নাই এই বা কেমন কথা? আমি প্রাতঃকালে শুনিলাম যে রমানাথ উপদেশক তোমাকে ডাকিয়া বলিলেন, আজি আমি পল্লী-গ্রামে ঘোষণা করিতে যাইব; তুমি যদি আমার পীড়িতা স্ত্রীর নিকটে থাকিয়া তাহাকে সাগু-দানা ইত্যাদি রন্ধন করিয়া দেও, তবে আমি তোমাকে ছয়টি পয়সা বেতন দিব।
করুণা হাসিতে উত্তর করিল, আমাকে যে ডাকিয়াছিল সে সত্য বটে, কিন্তু আমি যাই নাই। মধুর স্ত্রী যে পলাইয়া গিয়াছিল, তাহার সকল কথা শুনিতে২ সময় গেল; তাহাতে বাবু আপন স্ত্রীর কাছে প্যারীকে রাখিয়া চলিয়া গেলেন। মধুর স্ত্রীকে কালীপুরে পাওয়া গেল; সেখানে সে কাঠ কুড়াইয়া বেচিতেছিল, এবং তাহার যত গহনা ছিল তাহা একটিও তাহার নিকটে নাই। সে এই কথা বলে, যে একটি বৃদ্ধা স্ত্রীলোক প্রথমে আমার প্রতি বড় দয়া প্রকাশ করিয়া পাঁচ সাত দিন আমাকে ঘরে রাখিয়া খাইতে দিল। পরে এক রাত্রিতে আমি যখন ঘোরতর নিদ্রা গিয়াছিলাম, তখন কে আসিয়া আমার সমুদয় গহনা গাত্রহইতে খুলিয়া লইল। প্রাতঃকালে উঠিয়া গহনা না দেখিয়া আমি কান্দিতে২ ঐ বুড়া স্ত্রীকে কহিলাম, তুমিই অবশ্য আমার গহনা লইয়াছ; দু; তাহাতে সে আমাকে গালি দিয়া ঘরহইতে বাহির করিয়া দিল। তখন আমি বলিলাম, তবে আমি কি ক্ষুধায় মরিব? আমি নালিশ করিতে যাই। এই কথা শুনিয়া বুড়ি বলিল, তোর সাক্ষী নাই, তোর টাকা নাই, তুই কি পুকারে নালিশ করিবি? এই লও, আমি দয়া করিয়া তোকে দুইটি টাকা দিলাম; কিন্তু তুই যদি এই বিষয় প্রকাশ করিস্ তবে আমি তোর নামে নালিশ করিব।
করুণা আরো বলিল, এই সকল রাণীর কথা; কিন্তু আমার বোধ হয় তাহা সকলি মিথ্যা। মধু তো বলে, যদি সে আমার গহনা আনিয়া না দেয়, তবে আমি তাহাকে চোরের ন্যায় কয়েদ করাইব।
ফুলমণি বলিল, মধু তাহা কখন করিতে পারিবে না। বিবাহের সময়ে ঐ গহনা রাণীকে দান করিয়াছিল কি না? আর সকল গহনা কিছু মধুর দত্ত নয়, কতকগুলি গহনা রাণীর মাতা মৃত্যুকালে তাহাকে দিয়া গিয়াছিল। আমার বোধ হয় রাণী সত্য কথা বলিয়াছে। ঐ বুড়ি গহনার লালসায় তাহাকে স্থান দিয়া থাকিবে, তাহা না হইলে এমত দয়ালু কে আছে যে খ্রীষ্টিয়ানীকে আপন ঘরের ভিতরে আনিয়া আহারাদি দেয়? রাণী পলাইয়া যাওয়াতে বড় অজ্ঞানের কর্ম করিল বটে, তথাপি তাহারই সম্পূর্ণ দোষ নয়; তাহার স্বামী এবং শাশুড়ী তাহাকে যে বড় দুঃখ দেয়, তাহা আমি ভাল-ৰূপে জ্ঞাত আছি।
'কৰুণা উত্তর করিল, তুমি তো রাণীর পক্ষে অবশ্য বলিবা, কারণ সে স্কুলের মেয়া ছিল, আর সে তোমার সুন্দরীর বন্ধু। কিন্তু ফুল-মণি, আমি তোমাকে যথার্থ বলি, লোকেরা আর স্কুলের মেয়াদের সহিত আপন পূঞ্জ-দিগকে বিবাহ দিবে না। স্কুলের মেয়াদের দ্বারা বার ২ এইরূপ গোলমাল উপস্থিত হইয়া থাকে।
কুলমণি বলিল, সে অনর্থক কথামাত্র; মেয়া-দেয় তো তো চৌদ্দ বৎসর বয়স না হইতে২ সর্বদা বিবাহ হইতেছে; এবং পাদরি সাহেব যে বর অন্বেষণ করেন তাহাও নয়, লোক সকল আপনারা আসিয়া কন্যা যাজ্ঞিয়া বিবাহ করে। আর শুন, এই গ্রামের মধ্যে ঐ স্কুলের মেয়ারা প্রায় সকলে ভদ্র ঘরে দত্তা হইয়াছে। আমা-দের রমানাথ বাবুর স্ত্রীকে দেখ; এবং কোমল সরকারের স্ত্রী ও শশিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের দুই বউ, ইহারা সকলেই স্কুলের মেয়া, তথাপি তাহাদের বিরুদ্ধে একটিও কথা কেহ বলিতে পারে না। যদি রাণীর বিষয়ে বল, তবে আমার কিছু কথা আছে। সাহেব প্রথমাবধি তাহার বিবাহ দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, আমরাও তা-হাতে অনেক বাধা দিয়াছিলাম; কিন্তু রাণীর মাতা বড় অজ্ঞান ছিল। ঐ তিন খান সোনার গহনার জাঁকজমকদ্বারা তাহার দৃষ্টি এমত রোখ হইয়াছিল, যে মধুর একটিও দোষ তাহার চক্ষে পড়িল না। তুমি তো উত্তমরূপে জান যে মধু অতিশয় মূর্খ লোক, কখ পর্যন্ত জানে না; কিন্তু রাণী সফল মেয়াদের মধ্যে লেখা পড়াতে বড় নিপুণা, কেবল ঘরের কর্ম করিতে বড় একটা ভাল বাসে না। এমত বিপরীত স্বভাব বিশিষ্ট লোকদের বিবাহেতে কি কখন সুখ উৎপন্ন হইতে পারে? কিন্তু সে যাহা হউক, পরের কর্মে আমাদের হাত দেওয়া অকর্তব্য। আইস, আমি তোমাকে চড়চড়ির নিমিত্তে কিছু তৈল দিই।
অনন্তর করুণা কুলমণির পশ্চাতে ঘরের মধ্যে যাইতেছিল, এমত সময়ে তাহার আঁচলে একটি বড় হিছু থাকাতে সেই উক্ত চীন গোলাপের গাছে জড়িয়া ধরিল; তাহা কৰুণা না দেখিয়া অঞ্চলটিকে বলপূর্বক টানিয়া লওয়াতে চারাটি প্রায় মূল পর্য্যন্ত ভাঙ্গিয়া গেল। তখন আপন কৃত ঐ ক্ষতি দেখিয়া করুণার বদন বড় বিষণ্ণ হুইল, তাহাতে সেখানে বসিয়া সে ফুল পত্রাদিকে সংগ্রহ করিতে লাগিল। এমত কালে ফুলমণি কিছু না জানিয়া তৈলের ভাঁড় হাতে করিয়া বাহিরে আইল, কিন্তু আপন প্রিয়তম গাছটির অবস্থা দেখিয়া সে অতিশয় দুঃখিত হইয়া বলিতে লাগিল, হায় করুণা! তুমি কি করিলা? আমার সুন্দরীর চারাটি গেল। করুণা বলিল, আমাকে ক্ষমা কর। ফুলমণি, আমি এই বিষয়ে বড় দুঃখিত হইয়াছি। তুমি ঐ গাছটিকে তোমার সুন্দরীর নিশান স্বৰূপ জ্ঞান করিয়া অত্যন্ত ভাল বাসিতা, তাহা আমি জানি।
ইহা শুনিয়া ফুলমণির ক্রোধ নিবৃত্তি হইল, পরে সে হাস্য মুখে বলিল, ক্ষতি নাই। ইহাতে ধর্মপুস্তকের একটি অতি সান্ত্বনাদায়ক পদ আ-মার স্মরণ হইতেছে। হায় করুণা! তুমি যদি আপন মনে ঐ কথার বহুমূল্যতা জ্ঞাত হইতা, তবে তোমার দুঃখ অনেক ন্যূন হইত। সে কথা এই, "তৃণ শুষ্ক হয়, ও পুষ্প ম্লান হয়, কিন্তু আমাদের ঈশ্বরের বাক্য নিত্যস্থায়ী।" রিশয়িয় ৪০।৮
করুণা নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কিছু উত্তর করিল না, কিন্তু আমি তাহার মুখপানে চাহিয়া অনুমান করিলাম, সে ফুলমণির স্বভাব প্রপ্তা হইতে ইচ্ছা করিতেছিল। অবশেষ করুণা আপন সুশীলা বন্ধুর নিকটে বিদায় লইয়া আমাকে সেলাম দিয়া তৈলপাত্র হাতে করিয়া চলিয়া গেল।
উক্ত কথোপকথন শুনিয়া আমি অনুমান করি-লাম, ফুলমণি অতি ধার্মিকা ও নম্রমনা বটে, সেই হেতুক আমি পুনর্বার তাহাকে বসিতে বলিয়া তাহার আত্ম বিবরণ কহিতে অনুমতি দিলাম। তাহাতে সে বলিল, মেম সাহেব, আ-মার বিষয় আপনাকে আর কি জানাইব? সকলি তো জ্ঞাত করিয়াছি। তাহাতে আমি বলিলাম, ঐ সুন্দরী যাহার বিষয়ে এখন করুণার সহিত কথা হইল, সে কে? তাহা আমাকে বল; কেননা তাহার দত্ত ফুলগাছটিকে যদি তুমি এমন প্রিয় জ্ঞান কর, তবে বোধ করি সে তোমার কোন আত্মীয় ব্যক্তি হইবে।
ফুলমণি উত্তর করিল, মেম সাহেব ভাল বুঝিয়াছেন। সুন্দরী আমার জ্যেষ্ঠা কন্যা; তাহার বয়স প্রায় পোনের বৎসর হইয়াছে। দুই বৎসর গত হইল তাহার পিতা ছয় মাস পর্য্যন্ত অতিশয় পীড়িত ছিলেন, তজ্জন্য আ-মাদের বড় দুঃখ ঘটিয়াছিল। সত্যরূপে বলি-তেছি, আমরা ঐ ছয় মাসের মধ্যে কেবল অন্ন ও শাক বিনা আর কোন ভাল দ্রব্য এক দিবসও খাইতে পাইতাম না; তথাপি আমি এক পয়সা মাত্র কখন কর্জ করি নাই, কারণ আমি কর্জ্জকে সর্পের ন্যায় ভয় করি। ইহাতে আমাদের আহারের বড় ক্লেশ হইয়াছিল বটে, কিন্তু এক দিবস এলিয় ভবিষ্যদ্বক্তার বিব-রণ পাঠ করিয়া দেখিলাম যে পরমেশ্বর আপন আশ্রিত লোকদিগকে আকালের কালেও ক্ষুধায় মরিতে দেন না, বরং তাহাদের প্রাণ বাঁচাইবার কারণ আকাশের পক্ষিগণকেই আহারাদি আনি-তে আজ্ঞা করেন। ১ রাজাবলি ১৭২১-৭। ইহা পড়িয়া দুঃখ ভোগের সময়েও আমাদের মনো-মধ্যে যথেষ্ট সান্ত্বনা জন্মিল।
তৎপরে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ফুলমণি, তবে তোমাদের দিন নির্বাহ কিরূপে হইত? ফুলমণি বলিল, ইংরাজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহেন্দ্র বাবুর ঘরে। এক রন্ধনের কর্ম উপস্থিত ছিল; আমি ভাবিলাম, কর্জ করা অপেক্ষা পরের সেবা করা ভাল। অতএব সেই স্থানে গিয়া ঐ কর্মে নিযুক্ত হইলাম। তাহাতে আমাকে প্রতিদিন পাতঃকালে যাইতে হইত, কিন্তু সায় কালে ঘরে আসিবার অবকাশ পাইতাম। সুন্দরী সে সময়ে স্কুলে ছিল, ফলতঃ ঐ বিপদ কালে তাহাকে যরে আনিতে হইল, কারণ আমি কর্মে গেলে তাহাকেই আপন পিতার সেবাদি করিতে হইত। বাবুর নিকটে প্রতিমাসে তিন টাকা বেতন পাইতাম, এবং দুগ্ধ বিক্রয়দ্বারা গোৰুয় খাদ্যাদির খরচ বাদে প্রায় প্রতিমাসে আর দুই টাকা লাভ করিতাম। এইরূপে মোটা ভাত খাইয়া মোটা কাপড় পরিয়া ছয় মাস পর্য্যন্ত দিনপাত করিলাম। সুন্দরীর পিতার পীড়া হওনের পূর্বে আমরা ষোলটি টাকা জমা করিয়া-ছিলাম, তাহাতে পাঁচ টাকায় গোৰুর ঘর বানাই-লাম, আর এগার টাকা দিয়া গোৰু বাছুর কিনি-লাম। আমাদের এমত দুঃখ হইবে, তাহা যদি পূর্বে জানিতাম, তবে বোধ হয় ঐ টাকা খরচ করিতাম না। তথাপি এক প্রকার ভাল হইয়াছে, কারণ সেই অবধি আমি সর্বদা দুগ্ধ বিক্রয় করিয়া কিছু লাভ করিয়া আসিতেছি।
কুলমণি আরো বলিল, ছয় মাস গত হইলে ঈশ্বরের প্রসাদ হেতুক সুন্দরীর পিতা কিঞ্চিৎ সুস্থ হইয়া পুনর্বার কর্ম্মেতে গেলেন, কিন্তু তখন কবিরাজ মহাশয়কে বিদায় করিতে হইল। তিনি বলিলেন, ছয় মাস পর্য্যন্ত আসা যাওয়া করিয়াছি, সেই হেতুক চব্বিশ টাকার কম লইব না। ইহা শুনিয়া আমাদিগের বড় ভাবনা হইল, কারণ তাঁহাকে পাঁচটি টাকা দি, তৎকালে আমাদের এমত সঙ্গতি ছিল না। কিন্তু ঈশ্বর যখন আপন সেবকদিগকে নিৰূপায় দেখেন, তখন তিনি সর্বদা তাহাদিগকে রক্ষা করেন, এ কথা যে সত্য তাহা আমরা পরে ভালরূপে বুঝিতে পারিলাম।
আমাদিগের পাদরি সাহেবের ভগিনী সেই সময়ে আপন ভাইয়ের ঘরে কিছু দিনের নিমিত্তে আসিয়াছিলেন। তিনি অতিশয় ধার্মিকা; তাঁহার সাহেব কলিকাতায় ডাক্তরের কর্ম্ম করেন। ঐ বিবি আমার কন্যাকে স্কুলে দেখিয়া তাহাকে বড় ভাল বাসিতেন, তাহাতে তিনি আমাদের দুঃখের কথা শুনিয়া আমাকে ডাকাইয়া এই কথা কহিলেন; ফুলমণি, তুমি সুন্দরীকে আমার সহিত কলিকাতায় যাইতে দেও। আমি তাহাকে আয়ার কর্ম শিখাইব। বোধ করি সে ধার্মিকা মেয়া, এবং এমত ব্যক্তি আমার বাবাদিগের নিকটে থাকে, ইহা আমি বড় অভিলাষ করি। যদ্যপি সুন্দরী এখন কোন কৰ্ম্ম না জানে, তথাপি আমি তাহাকে খাদ্য বস্ত্রাদি ও প্রতিমাসে দুই টাকা বেতন দিতে স্বীকার করিতেছি; পরে কর্মে পারক হইলে আরো বৃদ্ধি করিয়া দিব। এই কথাতে যদি সম্মতা হও, তবে আমি এখনি সুন্দরীর এক বৎসরের বেতন অর্থাৎ চব্বিশ টাকা তোমার হাতে দিই; তুমি টাকা লইয়া কবিরাজকে দিলে তোমাদের সকল দুঃখের শেষ হইবে।
তদনন্তর ফুলমণি আমাকে বলিল, মেম সা-হেব, আমি ঘরে আসিয়া এই সকল কথা সুন্দরীর পিতাকে জানাইলাম, কিন্তু তিনি কন্যাকে ছাড়িয়া দিতে অনিচ্ছুক হইলে আমি পাঁচ সাত দিন পর্য্যন্ত কিছু স্থির করিতে না পারিয়া ডাক্তর সাহেবের বিবির নিকটে গেলাম না। আমাদের প্রতি বাসি সকলে কহিল, এমত কর্ম কখন করিও না। কেহ বলিল, ছি ছি! লোকে লজ্জা দিবে; কেহই বলিল, না না, মেয়া ভুষ্টা হইবে; কেহ বা বলিল, তোমরা অতিশয় টাকার লোভী; টাকার লাল-সায় কন্যাকে বিদেশে চাকরি করিতে পাঠাইতে চাও; টাকা ধার কর, আপন মেয়াকে কখন ছাড়িয়া দিও না।
কুলমণি বলিল, মেম সাহেব, প্রতিবাসিদের এইরূপ কথা শুনিয়া আমিও ভাবিতে লাগি-লাম, যে একবার মাত্র ধার করিলে কিছু ক্ষতি মাই, চেষ্টা করিলে টাকা শীঘ্র পরিশোধ করিতে পারিব। কিন্তু সুন্দরী বলিল, না মা! কোথা-হইতে পরিশোধ করিবা? কারণ কবিরাজ বলেন, যদ্যপি পিতা এখন উত্তম২ তেজস্কর দ্রব্যাদি না খান, তবে তাহার পূর্বমত বল হইবে না। এবং মা, তুমি দুঃখদায়ক কর্ম করিয়া অতিশয় শীর্ণা হইয়াছ। তোমরা এখন ভাল খাও ও ভাল পর, এবং আমাকে কলিকাতায় যাইতে দেও। লোকদের কথা শুনিও না, কারণ আমি ঈশ্বরকে ভয় করি; তিনি সকল আপদহইতে আমাকে রক্ষা করিবেন।
ফুলমণি আরও বলিল, সুন্দরীর যাওনের বিষয় স্থির হইবার পূর্বে একজন বৃদ্ধা স্ত্রীলোক অহুঙ্কার করত আমার নিকটে আসিয়া এই কথা কহিল; ভাল, ফুলমণি, গত বৎসরে তুমি আমার নখুর সহিত তোমার কন্যাকে বিবাহ দিতে সম্মত ছিলা না। এখন তোমাদের দুঃখ উপস্থিত হইয়াছে; তুমি আমাদের পায়ে ধরিয়া ঐ কর্ম যেন হয় এমত নিবেদন করিবা। ভাল, তাহাই হউক, আমি' সকল ক্ষমা করিলাম। সুন্দরীকে কলিকাতায় না পাঠাইয়া আমার পুত্রের সহিত বিবাহ দেও, দিলে তোমার জামাতা কবিরাজের টাকা গুলিন পরিশোধ করিবেন। আমি বলি-লাম, না গো, সে কখন হইবে না। আমি তোমার পূত্রকে শিশুকালাবধি চিনি বটে, এবং সে আমা-কে মা বলিয়া থাকে; কিন্তু দুই তিন বৎসরা--বধি আমি স্বচক্ষে দেখিতেছি সে বার২ গুঁড়ির দোকানে গিয়া মদ্য পান করে। অতএব সুখা-বস্থায় যে রূপ বলিয়াছিলাম, সেই ৰূপ এখনও বলিতেছি, যে মদ্যপায়ী ব্যক্তির সহিত আমার কন্যাকে কখন বিবাহ দিব না। এমত বিবাহ অপেক্ষা আয়াগিরি চাকরি করা সহস্রগুণে ভাল। এই কথা শুনিয়া ঐ বুড়ি মহা ক্রোধান্বিতা হইয়া আমাদের বিষয়ে নানা প্রকার হিংসার কথা কহিতে লাগিল। সে প্রতিবাসিদিগের নিকটে বলিল, যে সুন্দরীর গর্ভ হইয়াছে; অতএব তাহা গোপনে নষ্ট করিবার কারণ ফুলমণি তাহাকে কলিকাতায় পাঠাইতেছে। সুন্দরীর পিতা এবং আমি এই রূপ মিথ্যা অপবাদ শুনিয়া দুঃখিত হইলাম বটে, কিন্তু "যে জিহ্বা তোমার সহিত বিবাদ করে, তাহাকে তুমি বিচারে দোষী করিবা,” ঈশ্বরের এই অঙ্গীকার আমাদের প্রতি তখন সফল হইল; কারণ সুন্দরী যে দুষ্টা, তাহা কেহ বিশ্বাস না করিয়া প্রতিবাসি সকলে বুড়িকেই দোষ দিতে লাগিল।
তদনন্তর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, যে যুব পুরুষ তোমার কন্যাকে বিবাহ করিতে অভিলাষ করিয়াছিল, শেষে তাহার কি ঘটিল?
ফুলমণি বলিল, মেম সাহেব ঐ স্ত্রীলোক যে ব্যক্তির কথা এক্ষণে এই স্থানে কহিতেছিল, সেই বুড়ির পুত্র মধু আমার সুন্দরীকে বিবাহ করিতে চাহিয়াছিল। এক বৎসর পরে সে রাণীকে বিবাহ করিল; কিন্তু রাণী এই প্রকারে তাহার নিকটহইতে দুইবার পালায়ম করিয়াছে। রাণী আমার সুন্দরীর সঙ্গে এক স্কুলে পাঠ করিত, তাহাতে উভয়ের অত্যন্ত প্রণয় হইয়াছিল। এই কারণ সুন্দরী গেলে পরে রাণী আমার নিকটে কখন ২ আসিয়া কিছু কাল বসিয়া সকল দুঃখের কথা বলিত; কিন্তু প্রায় তিন মাস হইল সে আমাকে বলিয়াছিল, আমি যখন তোমার নিকট-হইতে ঘরে যাই তখন স্বামী কিম্বা শাশুড়ী বড় মারেন। এই কথা শুনিয়া আমি তাহাকে আসিতে বারণ করিলাম, কেননা পরিবারের মধ্যে যাহা-তে বিবাদ জন্মে, এমত কর্ম করা অনুচিত।
আমি বলিলাম, তুমি ভাল বুঝিয়াছিলা, ফুলমণি। এই মধু ও রাণীর বিষয়ে পশ্চাতে আরো কথা জিজ্ঞাসা করিব; এখন সুন্দরীর কি গতি হইল, তাহা বল।
ফুলমণি হাসিয়া কহিল, মেম সাহেব, আপন-কার বড় অনুগ্রহ যে আপনি আমার কন্যার বিষয় শুনিতে এমত ইচ্ছুক আছেন। তাহাকে ছাড়িয়া দিব কি না, এ বিষয় আমরা কোন প্রকারে মনে স্থির করিতে না পারিয়া আমি পাদরি সাহেবের নিকটে পরামর্শ লইতে গেলাম।
সে সময়ে তিনি বাজারে সুসমাচার প্রচার ও বহ্নি বিতরণ করিতে গিয়াছিলেন, কিন্তু মেম সাহেব আপনার কুঠরীতে বসিতে অনুমতি দিলে আমি সাহেবের আগমন পর্য্যন্ত অপেক্ষা করি-লাম। পরে তিনি বাটীতে আসিবা মাত্র আমি তাঁহাকে সুন্দরীর কথা কহিয়া নিবেদন করিলাম, হে মহাশয়, এ বিষয়ে আপনি কি পরামর্শ দেন? তাহাতে তিনি বলিলেন, বাঙ্গালিদের মধ্যে যুবতি মেয়া যে আপন পিতা মাতাকে ত্যাগ করিয়া দূর দেশে যায়, তাহা প্রায় ভাল বুঝি না। কারণ যুবতীরা অতিশয় চঞ্চলা এবং নির্বোধ হইয়া থাকে, ও দুষ্ট লোকেরা তাহাদিগকে যে পরা-মর্শ দেয় সেই পরামর্শ মতে চলে। কিন্তু সুন্দরীর প্রতি এই কথা অত্যন্ত অনুপযুক্ত। আমি দুই বৎসর পর্য্যন্ত তাহার ব্যবহার দেখি-তেছি, তাহাতে সম্পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছি যে সে ঈশ্বরকে ভয় করিয়া আপনার শক্তির উপরে নির্ভর না দিয়া বার ২ যীশু খ্রীষ্টের নিকটে বল ও শিক্ষা যাজ্ঞা করে; এই জন্যে বলি তাহাকে যাইতে দেও, তাহার প্রতি কেহই কিছু ক্ষতি করিতে পারিবে না। পাদরি সাহেব আরও বলিলেন, দেখ সুন্দরীর মা, তোমরা দুরবস্থায় আছ, এবং তোমাদের রক্ষার্থে পরমেশ্বর এই উপায় দর্শাইয়াছেন। তুমি কন্যার নিমিত্তে চাকরি অন্বেষণ কর নাই, এবং আমিও আপনার ভগি-নীকে এবিষয়ে কিছু বলি নাই। অতএব ঈশ্বর আপনি যখন উপযুক্ত দ্বার খুলিয়া দেন, তখন সে দ্বারে প্রবেশ করা তাঁহার ভক্তদের অবশ্য কর্তব্য।
স্কুলমণি বলিল, মেম সাহেব, পাদরি সাহেবের এই কথা শুনিয়া আমরা সুন্দরীকে কলিকাতায় পাঠাইতে স্থির করিলাম। পর দিবসে ডাক্তর সাহেবের মেম অঙ্গীকার অনুসারে সুন্দরীর এক বৎসরের বেতন অগ্রে দিলেন, তদ্দারা আমরা কবিরাজকে বিদায় করিয়া আট দিন পর্য্যন্ত বড় সুখে কালযাপন করিলাম। কিন্তু সুন্দরী কলি-কাতায় গেলে পর আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম, তাহাতে সুন্দরীর পিতা আমাকে বারং বলিতেন, ফুলমণি কান্দিও না, তুমি ঈশ্বরের অভিমত ক্রিয়া করিলা, ইহাতেই তোমার সান্ত্বনা হউক।
যাওনের আট দশ মাস পরে সুন্দরী আপন মেমের সঙ্গে এক বার ঘরে আসিয়াছিল, তাহাতে দেখিলাম সে সর্ব প্রকারে ভাল আছে। তাহার পিতাও এক বার কলিকাতায় তাহাকে দেখিতে গিয়াছিলেন, এবং পৌষ মাসে ডাক্তর সাহেবের মেমের এই স্থানে পুনর্বার আসিবার কথা আছে। হায় মেম সাহেব! যদ্যপি আপনি সুন্দরীকে দেখেন, তবে অবশ। তাহাকে ভাল বাসিবেন।
ঐ ফুল গাচটি যে নষ্ট হইল, তজ্জন্যে এত খেদ কেন করিলাম, তাহাও বলি। সুন্দরী যখন কলিকাতাহইতে ফিরিয়া আসিয়াছিল, তখন সেই চারাটি হাতে করিয়া আনিয়া আ-মাকে বলিল, এই লও মা। মেম সাহেবের মালী এই চারাটি আমাকে দিয়াছে; সে এখন ছোট চারা বটে, কিন্তু তুমি যদি ইহাকে ভাল করিয়া রাখ, তবে ইহাতে ফুল ও পত্রাদি ধরিবে;
তাহা হইলে তুমি যীশু খ্রীষ্টের এই দয়ালু কথা স্মরণ করিও, "অদ্য বর্তমান ও কল্য চুলাতে নিক্ষিপ্ত হইবে এমন যে ক্ষেত্রের তৃণ, তাহাকে যদি ঈশ্বর এতাদৃশ বিভূষিত করেন, তবে হে অল্পপ্রত্যয়িরা, তোমাদিগকে কি বস্ত্র দিবেন না?” কুলমণি বলিল, এই জন্যে মেম সাহেব, আমি ঐ গাচটিকে বড় প্রিয় জ্ঞান করিতাম, কারণ সে আমার কন্যার নিশানস্বৰূপ ছিল; এবং দুঃখের সময়ে তাহা দেখিয়া আমার অনেক বার সান্ত্বনা হইয়াছে, কেননা আমি ভালৰূপে জানি যে বৃক্ষ ও পুত্রাদিহইতে ঈশ্বরের লোকেরা তাঁহার সা-ক্ষাতে বহুমূল্য হয়।
পাঠকবর্গেরা উক্ত কথা পাঠ করত অবগত হইবে, যে আমি এই ধার্মিকা স্ত্রীর চরিত্র সকল শুনিয়া অতিশয় আহলাদিত হইলাম, এবং সময় থাকিলে আমাদের অধিক আলাপ হইত; কিন্তু তখন বেলা গিয়াছিল, তাহাতে চাপ্রাসি আ-মার আরামের নিমিত্তে ভাবিত হইয়া আসিয়া বলিল; মেম সাহেব আপনকার বিলম্ব দেখিয়া আমি কুঠিতে শীঘ্র গিয়া গাড়ি সঙ্গে করিয়া আনিয়াছি, কারণ আপনি অন্ধকারে হাঁটিয়া যাইতে পারিবেন না, এবং এখন ঘোড়া যাইবার নিমিত্তে বড় ব্যস্ত হইতেছে, আর স্থির হয় না। ইহা শুনিয়া ফুলমণির নিকটে কিছু খেদ করিয়া বিদায় হইলাম। আমি যে দুই ঘণ্টা তাহার বাটীতে ছিলাম, তাহা অতিশয় আমোদে যাপন করিলাম; তাহাতে আমি পুনর্বার শীঘ্র আসিব, এই কথা বলিয়া গাড়িতে চড়িলাম।
পথে যাইতে২ মনের মধ্যে অনেক চিন্তা উপ-স্থিত হইতে লাগিল। ফুলমণি বিরক্ত প্রতিবাসি-দের প্রতি কিরূপ কোমল আচরণ করিয়াছিল, তাহা স্মরণ করত আমি ভাবিলাম, হায়! এই দরিদ্রা স্ত্রী অপেক্ষা আমার অধিক জ্ঞান আছে বটে, তথাপি আমি সর্বদা তাহার ন্যায় প্রেম ও সহিষ্ণুতা প্রকাশ করিয়া থাকি কি না, তাহা কহিতে পারি না। আর যখন ঈশ্বরের প্রতি ফুল-মণির দৃঢ় বিশ্বাস ও ভরসা অরণ করিলাম, তখন আমার নিজ অবিশ্বাস ও অনর্থক ভাবনা সকল অতিশয় নিষ্প্রয়োজন ও দোষযুক্ত বোধ হইল, তাহাতে আমি লজ্জিতা হইয়া এই প্রার্থনা করিতে লাগিলাম, "হে পুভো, প্রত্যয় করি, আ-মার অপ্রত্যয়ের প্রতিকার করুন!” এতদ্ভিন্ন আর একটি চিন্তা মনে উপস্থিত হইল, যথা; আমি খ্রীষ্টিয়ান পল্লীতে অল্পকাল ছিলাম বটে, তথাপি ইহার মধ্যে স্পষ্টরূপে বুঝিলাম যে সকল ঘর ফুলমণির ঘরের মত নয়, এবং সকল স্ত্রীলোক তাহার ন্যায় সদ্ব্যবহারিণী নহে। ইহাতে আমি ঈশ্বরের স্থানে অতিশয় বিনয় পূর্বক এই প্রার্থনা করিলাম, হে স্বর্গস্থ পিতঃ! আমাকে ধর্মাত্মাতে পূর্ণ করিয়া আমার মনে পাপি লোকদের প্রতি দয়া জন্মইয়া দেও, তাহাতে এই পল্লীর মধ্যে যত দিন পর্য্যন্ত একটি অধার্মিক পরিবার বাস করিবে, তত দিন পর্য্যন্ত তোমার বিষয়ে যেন শিক্ষা দিতে ক্ষান্তা না হই।
যরে উপস্থিত হইয়া আমি আপন মুসলমানী আয়াকে ডাকিয়া খ্রীষ্টিয়ানদের মধ্যে যাহাহ দেখিয়াছিলাম, তাহা তাহাকে বিস্তারিত ৰূপে কহিলাম। তাহাতে আয়া সন্তুষ্টা হইয়া কহিল, আপনি যখন পুনর্বার সেই স্থানে যাইবেন, তখন আমাকে অনুগ্রহ করিয়া লইয়া যাইবেন। আমি তাহাতে স্বীকতা হইয়া আপন শয়নাগারে পুবেশ করিলাম। কিঞ্চিৎকাল পরে অতিশয় ঝড় ও তুফান আরম্ভ হইল। তৎকালে আমার স্বামী পল্লীগ্রামে তাম্বুতে আছেন, ইহা জানিয়া আমি শোকাকুল ও ভাবিতা হইতে লাগিলাম, কিন্তু ঈশ্বরীয় যে বাক্য সুন্দরী আপন মাতাকে অরণ করিতে বলিয়াছিল, তাহা আমার মনে পড়িলে আমি তদ্দ্বারা সান্ত্বনা পাইয়া স্বচ্ছন্দে শয়ন করিলাম।
দ্বিতীয় অধ্যায়
পূর্ব অধ্যায়ের লিখিত ঘটনার দশ বার দিন পরে আমি পুনর্বার ফুলমণির গৃহে যাইতে বাসনা করিলাম। সে দিবস শনিবার, অতএব মনে ভাবিলাম, অদ্য যদি যাই, তবে বোধ হয় আমি কুলমণির ছেল্যাদের দেখা পাইব; কারণ কুলমণি আমাকে বলিয়াছিল যে শনিবারে ছেল্যারা বেলা থাকিতে বাটীতে আইসে। ইহা স্মরণ করিয়া আমি আয়াকে ও চাপ্রাসিকে সঙ্গে করিয়া চলিলাম। চাপ্রাসির হাতে একটি টবে অতি সুন্দর লালবর্ণ বিলাতি কুলগাচ ছিল; তাহা চিন গোলাপ চারার পরিবর্তে ফুলমণিকে দিতে মানস করিলাম, কেননা সে কলসকলকে কেমন ভাল বাসে এবং তাহাদ্বারা কিরূপ উত্তম২ উপ-দেশ প্রাপ্তা হয়, ইহা দেখিয়া আমি বড় সন্তুষ্টা হইয়াছিলাম।
ইহা আশ্চর্য্যের বিষয় বটে, যে কোন২ খ্রীষ্টি-য়ান লোক পৃথিবীর সৌন্দর্য্য দেখিয়াও তম্বারা সৃষ্টিকর্তার বিষয়ে কিছু শিক্ষা করে না, এবং তাঁহার হস্তকৃত কার্য্যের সহিত পারমার্থিক বিষ-য়ের কিৰূপ তুলনা হয়, তাহাও বুঝিতে পারে না। এই কথা দেশস্থ স্ত্রীলোকদের প্রতি বিশেষরূপে খাটিতে পারে, যেহেতুক তাহাদের মধ্যে ঈশ্বরের কর্মের বিষয়ে যাহারা ভালৰূপে মনো-নিবেশ করে এমত লোক অত্যল্প পাওয়া যায়। বস্তুতঃ আমি কুলমণি বিনা এরূপ সৎবিবেচিকা এতদ্দেশীয়া স্ত্রীলোকদের মধ্যে আর কাহাকেও দেখি নাই। সে যাহা হউক, কুলমণির এইরূপ স্বভাব দেখিয়া বুঝিলাম যে তাহার সহিত আ-মার উত্তম প্রণয় হইবে, কারণ আমি যে সকল বিষয়ে মনোনিবেশ করিয়া থাকি, সে সকলেতে তাহারও মনঃসংযোগ হইয়া থাকে।
অনেক বৎসর অবধি আমি মনের মধ্যে একটি রীতি স্থাপন করিয়াছি, যথা; যে সময়ে আমি ক্ষেত্রেতে কিম্বা নদীতীরে অথবা বাগানে একাকিনী ভ্রমণ করি, সেই সময়ে কোন দৃষ্ট বস্তু অর্থাৎ বন্যযাস কি ফুল কিম্বা প্রস্তর ইত্যাদি ইহার মধ্যে কোন একটাকে মনোনীত করিয়া, সে কি প্রকার কার্য্যে লাগে, এবং সে কেমন সুন্দর, কিম্বা তাহার কি ২ গুণ, এই সকলেতে মনোনিবেশ করিয়া তদ্দ্বারা ঈশ্বরের শক্তি ও কখন ২ জ্ঞান ও দয়ার বিষয়ে সুশিক্ষিতা হই। বা সাংসারিক বস্তুর বিষয় ধ্যান করিতে ২ পারমার্থিক বিষয়ে জ্ঞান প্রাপ্তা হই; ইহার উদা-হরণ বলি। আমি যখন বাগানের মধ্যে মালীকে বৃক্ষের ডাল ছাঁটিয়া পরিষ্কার করিতে দেখি, তখন ধৰ্ম্ম পুস্তকে লিখিত এই কথার ভাব ভালৰূপে বুঝিতে পারি, যথা; "পরমেশ্বর যাহাকে প্রেম করেন তাহাকেই শাস্তি প্রদান করেন, এবং যে প্রত্যেক পুত্রকে গ্রাহ্য করেন তাহাকেই প্রহার করেন।” ইব্রীয় ১২১৬। কিম্বা "যে সকল শাখাতে ফল ধরে না তাহা পিতা ছেদন করিয়া ফেলেন, এবং ফলবতী শাখা সকলেতে যেন আরো ফল ধরে এই জন্যে পরি-স্কার করেন।” যোহন ১৫০২।
কখন২ বা সূৰ্য্যকে অন্ত হইতে দেখিয়া এই বোধ করি, যে সূর্য্যের সহিত সত্য খ্রীষ্টিয়ান লোকের মৃত্যুর তুলনা দেওয়া যায়; ফলতঃ যেমন নির্মূল দিবসে সূর্য্য সমস্ত দিন অতিশয় তেজঃ প্রকাশ করিলে অন্ত হওনের সময়ে তাহাতে পায় কেহই মনোযোগ করে না; তেমনি কোন খ্রীষ্টিয়ান লোকেরা যাবৎ জীবন ঈশ্বরের সেবাতে ও মনুষ্যদের হিতার্থে কাল ক্ষেপণ করিয়া মৃত্যুর সময়ে বড় একটা সাহস ও জয় প্রকাশ করিতে না পারিয়া কেবল সুস্থিররূপে আপন ২ আত্মা প্রভুর হস্তে সমর্পণ করে। তাহারা "সান্ত্বনাতে কাল ক্ষেপে, সান্ত্বনাতে মরে, "
সুতরাং নির্মূল দিনের সূর্যাস্তের ন্যায় অনেকেই তাহাদের মরণেতে বড় মনোযোগ করে না। আর সূর্য্য কখন২ দিনের মধ্যে অনেকবার মেঘ-দ্বারা আচ্ছাদিত হইলেও সন্ধ্যার সময়ে মেঘহইতে বাহির হইয়া অতিশয় উজ্জ্বল ৰূপে অন্তগত হয়, তদ্রূপেই কোন২ খ্রীষ্টিয়ানেরা অনেকবার পরী-ক্ষাতে পতিত হয়, এবং ধর্ম্মেতে বড় একটা সান্ত্বনা না পাইয়া মনের দুঃখ পযুক্ত চিন্তাতে কাল যাপন করে; কিন্তু নিদান সময়ে তাহাদের মেঘৰূপ দুঃখ সকল উচ্ছিন্ন হইলে তাহারা অতিশয় সাহস ও আহলাদযুক্ত হইয়া দেহ ত্যাগ করে। পুনশ্চ বর্ষাকালে যেমন সূর্য্য সমস্ত দিবস মেঘদ্বারা ঢাকা থাকে, এবং মেঘাচ্ছন্ন হইয়া অন্তগতও হয়; তেমনি কতকগুলিন খ্রীষ্টিয়ান লোক আছে, তাহারা ঈশ্বরের গুপ্ত সন্তান হইয়াও স্বভাবিক ভীৰু পুযুক্ত কিম্বা আর কোন কারণ বশতঃ জীবনা-বস্থায় আপন ধর্ম বড় প্রকাশ করে না বটে, কিন্তু সর্বান্তর্যামি প্রভু তাহাদের মনের অভিপ্রায় জানেন ও তাহাদের নাম জীবন পুস্তকে লিখিয়া রাখেন। কলতঃ সূর্য্য যে ৰূপে অন্ত হউক না কেন, সে যেমন পুনর্বার অবশ্য উদিত হয়, সেইরূপে উক্ত প্রকার খ্রীষ্টাশ্রিত লোকসকলের যে পুনৰুত্থান হইবে, ইহাতে সন্দেহ নাই।
ফুলমণির গৃহে গমন কালে নদীর তীর দিয়া যাইতে হইল, তাহাতে আমি সেই নদীর বিষয় উক্ত ৰূপে ধ্যান করিতে২ চলিলাম। মনোমধ্যে এই প্রকার ভাবিলাম; যেমন গঙ্গা অত্যুচ্চ হিমা-লয় পর্বতহইতে নামিয়া আসিতেছে, তেমনি ধর্মাত্মা স্বর্গহইতে নামিয়া মনুষ্যদের মনে অব-স্থিতি করেন। নদীর উনুই যেমন কখন শুষ্ক হয় না, সেই মত ঐ আত্মা মানুষের অন্তঃকরণে উনুই স্বৰূপ হইয়া অনন্ত পরমায়ু পর্য্যন্ত উথলিয়া উঠেন। নদীর জলদ্বারা শরীর পরিষ্কার হয় বটে, কিন্তু তাহা অন্তঃকরণেতে কিছুমাত্র সংলগ্ন হয় না, অতএব তাহাতে স্নান করিলে মনুষ্যদের পাপরূপ মলিনত্ব ধৌত হয় না; কিন্তু অন্তর্যামি পবিত্র আত্মা সর্ব প্রকার পাপ মনুষ্যদের অন্তঃ করণহইতে পরিষ্কৃত করেন। পুনশ্চ নদীর জল-দ্বারা যেমন ভমি উর্বরা হয়, তেমনি ধর্মাত্মাদ্বারা খ্রীষ্টিয়ান লোকদের ধর্মক্ষেত্র উর্বরা হইয়া সৎ-কর্মরূপ ফল উৎপন্ন করে। আরো যাহার ইচ্ছা হয় সে যেমন আসিয়া নদীর জল স্বচ্ছন্দে পাম করিতে পারে, তদ্রূপে যে জন তৃষার্ত হয় এবং যে কেহ ইচ্ছা করে সে আসিয়া বিনামূল্যে অমৃত জল গ্রহণ করুক। কোটিং মনুষ্যের ও পশ্বাদির জীবন গঙ্গাজলদ্বারা যেমন রক্ষা পায়, তেমনি পাপেতে মৃতপ্রায় যে আমরা, আমরা ধর্মাত্মা-দ্বারা পরমায়ু প্রাপ্ত হই। গঙ্গায় শ্রোত যেমন বাধা সকল উল্লত্বন করিয়া বেগবান্ হয়, তেমনি মনুষ্যদের অন্তঃকরণে যে মহা বাঘা (অর্থাৎ পাপের প্রতি অনুরাগ) তাহা ধর্মাত্মা দমন করিয়া মনকে ঈশ্বরের বশীভূত করান। অফ-শেষে, যেমন নদীর শ্রোত কিছুতে বাধিত না হইয়া মহাসাগরে গিয়া মিলিত হয়, তেমনি ধর্মাত্মা মনুষ্যদের অন্তঃকরণে ধর্ম সিদ্ধি করিয় অনন্ত পরমায়ুরূপ সুখসাগরে তাহাদিগকে পৌঁহু-ছিয়া দেন।
উক্ত বিষয় আন্দোলন করত চলিতেং আমার পথশ্রম কিছুই বোধ হইল না, তাহাতে আমি প্রায় অজ্ঞাতসারে ফুলমণির গৃহে উপস্থিত হইলাম। পৌঁছিবামাত্র দুইটি ছেল্যা দৌড়িয়া আসিয়া আমাকে দ্বার খুলিয়া দিল। পরে তাহারা সেলাম করিয়া গৃহের মধ্যে শীঘ্র গিয়া আপন মাতাকে ডাকিতে লাগিল। ফুলমণি পূর্বে যে-ৰূপ আমাকে চৌকি আসিয়া দিয়াছিল, সেই-রূপে তাহার কন্যাও চৌকি আনিয়া দিয়া আ-মার নিকটে দাঁড়াইল। বোধ হইল তৎকালে ঐ মেয়ার বয়ক্রম সাত বৎসর মাত্র। তাহার মুখ গোল আর অতিশয় প্রফুল্ল ও হাই ছিল, এবং তাহার সুন্দর লম্বা কেশ উত্তমরূপে বাঁধা ছিল। আমি তাহার সুশীল ব্যবহার দেখিয়া বড় সন্তুষ্টা হইলাম; কারণ সে অন্য গ্রামস্থ বাঙ্গালি বালিকাদের ন্যায় পলায়ন না করিয়া আমার আয়াকে একটি পিঁড়া আনিয়া দিয়া শিষ্ট রূপে আমাদের সহিত আলাপ করিতে লাগিল। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার নাম কি? তাহাতে সে বলিল, আমার নাম সভবতী, এবং আমি সর্বদা সত্য কথা কহিতে চেষ্টা করি। ইহা শুনিয়া আমি বলিলাম, সত্যবতী অতিশয় সুন্দর নাম বটে, কিন্তু তোমার নামের সহিত যেন তোমার কথা মিলে, কেবল এই জন্যে কি তুমি সত্য কথা কহিয়া থাক? সে হাসিতে২ বলিল, না না, মেম সাহেব, এমত নয়। ঈশ্বর আমাদিগকে সত্য কথা কহিতে আজ্ঞা দিয়াছেন, এই জন্যে আমি সত্য কথা কহিয়া থাকি। তিনি বলিয়াছেন, " তাবৎ মিথ্যাবাদিরা অগ্নি ও গন্ধকের প্রজ্জ্বলিত হ্রদে নিক্ষিপ্ত হইবে।" প্রকাশিত ভবিষ্যদ্বাক্য। ২১।৮।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ধর্ম পুস্তকের ঐ কথা-টি তোমাকে কে শিখাইল? সত্যবতী উত্তর করি-ল, পিতা শিখাইয়াছেন। রাত্রিকালে আমাদের আহার হইলে তিনি নিত্য২ আমাদিগকে ধর্ম-পুস্তকের দুই একটি পদ শিখাইয়া স্নষ্টরূপে বুঝা-ইয়া দেন। বোধ হয়, সত্যতার বিষয়ে যত পদ আছে, সে সকল আমি মুখস্থ বলিতে পারি; এবং ঐ সকলের মধ্যে এই পদটি বড় ভাল বাসি, "আমিই পথ ও সত্যতা ও জীবন"। যীশু খ্রীষ্ট ইহা বলিলেন; এবং তাহার অর্থ পিতা আমাকে গত রবিবারে বুঝাইয়া দিয়াছেন। মেম সা-হেব, আমরা যদি খ্রীষ্টকে ছাড়িয়া অন্য পথে চলি, তবে স্বর্গে না পৌছিয়া নরকে পড়িব।
ঐ ছোট বালিকা এই কথা বলাতে তাহার ভাই ঘরের ভিতরহইতে বাহিরে আসিয়া কহিল, মেম সাহেব, মা ঘর লেপন করিতেছেন, তাহা সমাপন করিয়া এখনই আসিবেন, কেবল একটি কুঠারী লেপন করিতে বাকী আছে। আমি বলিলাম, তোমার মাতা সকল কর্ম্ম সাঙ্গ করিয়া আইলে উত্তম হয়; কিন্তু তোমার নাম কি? তাহা আমাকে বল।
বালক উত্তর করিল, আমার নাম সাধু। সাধু আপন ভগিনীহইতে দুই তিন বৎসরের বড়, এবং তাহার মুখাবলোকন করিয়া অনুমান হইল সে বুদ্ধিমান্ বালক বটে।
তখন সত্যবতী বলিতে লাগিল, মেম সাহেব, আমি যেরূপে সত্যতার বিষয়ে ধর্ম্ম পুস্তকের সকল প্রমাণ অভ্যাস করিয়াছি, সেইরূপে দাদা সাধুতার বিষয়ে সকল কথা শিক্ষিত হইয়াছেন। পাদরি সাহেবের মেম আমাদিগকে অদ্য বলিলেন, সাধুতা ও সত্যতা সর্বদা ভাই ও ভগিনীস্বরূপ বিখ্যাত হয়, তাহাদিগকে কোন মতে পৃথক করা যায় না। আহা, আমরা দুই জনে অত্যুত্তম নাম পাইয়াছি। ইহা বলিয়া সে উঠানের মধ্যে লম্ফ দিয়া বেড়াইতে লাগিল।
ইহার পূর্ব্বে আমি অনেক বাঙ্গালির ছেল্যাদিগকে দেখিয়াছিলাম বটে, কিন্তু এমত সুমতি ও মিষ্টভাষী কাহাকেও দেখি নাই। তাহাতে আমার চক্ষু জলেতে পরিপূর্ণ হইল, এবং “হে পিতঃ, তুমি বালক ও দুগ্ধপোষ্য শিশুদের মুখদ্বারা আপন স্তব প্রকাশ করিয়াছ, এই জন্যে তোমার ধন্যবাদ করিতেছি,” এই শাস্ত্রীয় কথা আমার মনে তৎক্ষণাৎ উদয় হইল। কিন্তু সাধু ও সত্যবতী আমার অশ্রুজল না দেখিয়া যে পর্য্যন্ত তাহাদের মাতা না আইসে সেই পর্য্যন্ত আমি যাহাতে সন্তুষ্টা থাকি, কেবল এই চেষ্টা করিতে লাগিল।
সাধু আমাকে বলিল, মেম সাহেব, ঐ দুষ্টা করুণা যে দিনে দিদির গাচটি নষ্ট করিল, বোধ করি সেই দিনে আপনি আসিয়াছিলেন। মাতা আপনকার বিষয়ে আমাদিগের নিকটে অনেক কথা বলিয়াছেন, এবং আপনিও আমার দিদির সমুদায় বৃত্তান্ত শুনিয়া থাকিবেন।
আমি বলিলাম, হাঁ, আমি তাহা শুনিয়া অতিশয় সন্তুষ্টা হইয়াছিলাম, এই জন্যে তাহার গাচটির পরিবর্ত্তে আর একটি বিলাতীয় ফুলের চারা তোমার মাকে দিবার নিমিত্তে আনিয়াছি। এই কথা বলিয়া আমি চাপ্রাসিকে ভিতরে ডাকিয়া তাহার হাতহইতে ফুলের চারা লইয়া তাহাদিগকে দেখাইলাম, তাহাতে দুই জনে বড় সন্তুষ্ট হইয়া ফুলের অতিশয় প্রশংসা করিল।
পরে সাধু বলিল, আইস সত্যবতি, আমরা দিদির শুষ্ক গাচটি ফেলিয়া দিয়া তাহার স্থানে এই টবটি রাখি, তাহা হইলে ইহা কোথাহইতে আইল তাহা সবিশেষ না জানিয়া মাতা বড় আশ্চর্য্যান্বিতা হইবেন।
সত্যবতী উত্তর করিল, না না, সাধু, বিবি সাহেব যে চারা আনিয়াছেন তাহা অন্য টবের নিকটে রাখ; কিন্তু দিদির চারাটি কখন ফেলিয়া দেওয়া হইবেক না, কারণ মা তাহাকে বাঁচাইবার নিমিত্তে বড় চেষ্টা করিতেছেন, এবং আজি আমাদের পিতাকে বলিলেন, যদ্যপি এইটি শুষ্ক হইয়া থাকে, তথাপি আমি তাহাকে চিরকাল রাখিব, কেননা ইহার শুষ্ক শাখাদ্বারা আমার মনের চেতনা হইবে।
সাধু জিজ্ঞাসা করিল, সে কি প্রকারে হইবে, মা কি তাহা বলিয়াছিলেন?
সত্যবতী কহিল, হাঁ, মাতা বলিলেন, ঐ শুষ্ক গাচটিকে দেখিয়া পাপ করিতে আমার মনে ভয় জন্মিবে, পাছে আমি শুষ্ক শাখাস্বরূপ হইয়া অনির্ব্বাণ অগ্নিতে দগ্ধ হই। ইহা শুনিয়া সাধু অতি গভীর হইয়া বলিল, তবে সত্যবতি, দিদির চারাটি থাকুক; এই ভয়ানক উপদেশ আমাদেরও মনে রাখা কর্ত্তব্য, কারণ তুমি এবং আমি অনেকবার দোষ করিয়া থাকি।
অতঃপর সত্যবতী উঠিয়া আয়াকে ডাকিয়া রন্ধনঘরে লইয়া গেল। পরে আমি সাধুকে বলিলাম, গতবারে এমত সন্ধ্যার সময়ে আমি আসিয়াছিলাম, তাহাতে দেখিলাম যে তোমার মাতার সকল কর্ম্ম সারা হইয়াছিল। অদ্য সে কি নিমিত্তে এত ব্যস্তা আছে?
সাধু উত্তর করিল, মেম সাহেব, আজি শনিবার, এই নিমিত্তে মাতা ব্যস্তা আছেন। সপ্তাহের শেষ দিনে তাঁহাকে সর্ব্বদাই অনেক কর্ম্ম করিতে হয়, কারণ রবিবারে প্রায় কোন কর্ম্মই করেন না। আজি আমরা দুই প্রহরের সময়ে স্কুলহইতে ফিরিয়া আসিয়াছিলাম; ইহারি মধ্যে মাতা কি২ কর্ম্ম করিয়াছেন, তাহা আমি বলি। প্রথমে তিনি সত্যবতীকে পুষ্করিণীতে লইয়া বেসনদ্বারা মাথা ঘসিয়া দিলেন; পরে গৃহে আসিবার সময়ে আমাদের ধৌত বস্ত্র আনিবার জন্যে ধোপার নিকটে গেলেন। অনন্তর গৃহে আসিয়া মাতা দেখিলেন, পিতার চাদর ও আমার জামা ছিঁড়িয়া গিয়াছে, অতএব পরদিনে গীর্জায় যাইতে হইবে, এই নিমিত্তে তিনি সেই কাপড়গুলিকে তৎক্ষণাৎ সেলাই করিলেন। তাহা হইলে পর মাতা সত্যবতীর মাথায় তৈল দিয়া চুল সকল উত্তমরূপে বাঁধিয়া দিলেন। পরে উঠান ঝাঁটি দিয়া গৃহ লেপন করিতে আরম্ভ করিলেন, সে কর্ম্ম এখনও শেষ হয় নাই। পিতা কখন২ মাতাকে বলেন, শনিবারে অনেক কর্ম্ম হয়, এই জন্যে আর কোন দিনে গৃহ লেপন করাই ভাল; কিন্তু মাতা শনিবারে তাহা করিতে চাহেন, কেননা রবিবারে গীর্জার পরে কতকগুলিন পুরুষ এখানে আসিয়া দাবায় বসিয়া পাদরি সাহেবের উপদেশ কথার ভাব পরস্পর বিবেচনা করে, ও দুই একটি গান গায়, পরে জলপানাদি করিয়া বিদায় হয়। ঐ লোকেরা যেন সকলি পরিষ্কার ও পরিপাটি দেখিতে পায়, এই অভিপ্রায়ে মাতা শনিবারে তাবৎ ঘর লেপন করেন; কেননা তিনি বলিয়া থাকেন, ভাল গৃহিণী হওয়া খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকদের অবশ্য কর্ত্তব্য।
এমন সময়ে ফুলমণি আপনি উপস্থিতা হইল, তাহাতে সাধু সত্যবতীর নিকটে রন্ধনশালায় গেল। ফুলমণির শাড়ি পূর্ব্বাপেক্ষা কিছু মলিন ছিল, এবং বোধ হইল সে তখন বড় শ্রান্তা হইয়াছে, তথাপি সে আমাকে সেলাম করিয়া হৃষ্টচিত্তে বলিল; মেম সাহেব, আজি যদি শনিবার না হইত, তবে আমি সকল কর্ম্ম ছাড়িয়া আপনকার নিকটে আসিতাম; কিন্তু আপনি জানেন যে শনিবারে কর্ম্ম সমাপ্ত না করিলেই নয়।
আমি বলিলাম, হাঁ ফুলমণি, এ অতিশয় ভাল রীতি বটে, এই রীতি পালন করিলে রবিবারে ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে বিশ্রাম করা যায়। এখন সত্য করিয়া বল, তোমার সমস্ত কার্য্য শেষ হইয়াছে কি না? যদি না হইয়া থাকে, তবে আমি অন্য দিন আসিয়া তোমার সহিত কথোপকথন করিব। এখন তুমি যাইয়া কর্ম্ম কর, এবং তোমার সন্তানদিগকে আমার নিকটে পুনর্ব্বার পাঠাইয়া দেও। আমি তাহাদের কথা শুনিয়া অতিশয় সন্তুষ্টা হইয়াছি।
ফুলমণি বলিল, আপনি যদি অনুমতি দিলেন, তবে তাহাই করি; কারণ কল্যের নিমিত্তে এখন ব্যঞ্জন রন্ধন হয় নাই।
আমি জিজ্ঞাসিলাম, তুমি কল্যের জন্যে কি ব্যঞ্জন পর্য্যন্ত আজি রাঁধিয়া রাখিবা?
ফুলমণি বলিল, হাঁ মেম সাহেব, যে কর্ম্ম শনিবারে করা যায়, তাহা ফেলিয়া রাখিব কেন? আমরা প্রত্যেক শনিবারে কিছু মাংস বা মৎস্য কিনিয়া রাখি, এবং এখন শীতকাল প্রযুক্ত তাহা এক দিন রন্ধন করিলে পর দিবস পর্য্যন্ত ভাল থাকে। গ্রীষ্মকালে তাহা করা যায় না; অতএব সে সময়ে কেবল শাক ডালাদি শনিবারে কিনিয়া রাখিতে হয়। আর কি করিব? রবিবারে রাঁধিয়া দিই, কিন্তু সে দিনে বাজার হাট আমরা কোন রূপে করি না।
ইহা বলিয়া ফুলমণি রন্ধন গৃহে যাইতেছিল, এমন সময়ে তাহার দৃষ্টি আমার বিলাতীয় ফুলচারাটির উপরে পড়িল; তাহাতে সে আমার প্রতি ফিরিয়া বলিল, সেলাম মেম সাহেব, বোধ করি আপনি এই সুন্দর ফুলগাচটি আমাকে আনিয়া দিয়াছেন। আহা! সুলেমান এত ঐশ্বর্য্যবান্ হইলেও ইহার ন্যায় বিভূষিত ছিলেন না। ইহা বলিয়া সে যাইয়া আয়াকে ও ছেল্যাদিগকে আমার নিকটে পাঠাইয়া দিল।
তাহারা আসিবা মাত্র আয়া বলিতে লাগিল, মেম সাহেব, এই ছেল্যারা আমাকে খ্রীষ্টিয়ান করিতে চেষ্টা করিতেছিল। তাহাতে আমি ছেল্যাদের প্রতি ফিরিয়া হাসিয়া বলিলাম, তোমরা আমার আয়াকে কি করিলা? বোধ করি ইহাকে তোমাদের কিঞ্চিৎ সুব্যঞ্জন জোর করিয়া খাওয়াইতে চাহিয়াছিলা?
আয়া বলিল, না না, মেম সাহেব, ইহারা সেরূপ ব্যবহার করে নাই; বরং একটি নূতন হুকা আনিয়া তাহাতে তামাক সাজিয়া আমাকে খাইতে দিল, আর খ্রীষ্টিয়ানদের শাস্ত্রহইতে অত্যুত্তম কথা বলিয়া তাহা আমাকে স্পষ্টরূপে বুঝাইয়া দিয়াছে।
তখন আয়া সত্যবতীর প্রতি ফিরিয়া বলিল, সত্যবতি, তুমি যে কথা আমার সাক্ষাতে বলিলা, তাহা আমার মেম সাহেবকে বল দেখি, তিনি একবার শুনুন।
তাহাতে সত্যবতী কহিল, মেম সাহেব, আয়া এই কথাটি শুনিয়া বড় সন্তুষ্টা হইল, যথা, “মিত্রদের নিমিত্তে আপনার প্রাণ দান পর্য্যন্ত যে প্রেম তদপেক্ষা আর বড় প্রেম কাহারো নাই;” আর “যে২ আজ্ঞা আমি দিতেছি তাহা যদি পালন কর, তবে তোমরাই আমার মিত্রগণ।”
যীশু খ্রীষ্ট কি প্রকারে পাপি লোকদের প্রায়শ্চিত্ত করিলেন, আয়া তাহা আমার নিকটে অনেকবার শুনিয়াছিল, তথাপি তাহাতে বড় একটা মনোযোগ করে নাই; কিন্তু এখন ঐ কথা শিশুদের মুখে শুনিয়া সে চিন্তিত ও গম্ভীর হইয়া বসিল, তাহাতে বোধ হইল যে খ্রীষ্টের উক্ত বচন তাহার মনে দৃঢ়রূপে লাগিয়াছিল। আমি দেখিলাম তাহার চক্ষু জলেতে ছল্২ করিতেছে, কিন্তু সে আপনার কোন কথা বলিতে না পারিয়া আমাকে কহিল, মেম সাহেব, আপনি এই ছেল্যাদের সহিত ধর্ম্ম বিষয়ে কথোপকথন করুন।
সপ্তাহের শেষ দিনে এই ধার্ম্মিক পরিবার যেরূপ ব্যবহার করিত, তাহা জ্ঞাত হইয়া আমি বড় সন্তুষ্টা হইয়াছিলাম, অতএব তাহারা কি প্রকারে রবিবার পালন করে, ইহাও শুনিতে বড় ইচ্ছুক হইলাম। এই জন্যে আমি সাধুকে বলিলাম, সাধু, বিশ্রামদিনে প্রাতঃকালাবধি সন্ধ্যা পর্য্যন্ত তোমরা কি করিয়া থাক, তাহা আমাকে বল।
সাধু উত্তর করিল, মেম সাহেব, যদি প্রথম অবধি শুনিতে চাহেন, তবে অগ্রে শনিবারের রাত্রির কথা বলিতে হয়; কেননা পিতা কহিয়া থাকেন, শনিবার রাত্রিতে আমাদের বিশ্রাম দিবসের আরম্ভ হয়। শনিবারে সন্ধ্যাকালে মাতার তাবৎ কর্ম্ম সাঙ্গ হইলে পর, আমরা সকলে বসিয়া কএকটি গান গাই। পরে পিতা ঈশ্বরের স্থানে এইরূপ প্রার্থনা করেন, হে পরমেশ্বর, তুমি আপন বাক্য ফলবান্ কর, ও লোকেরা কল্য যে২ উপদেশ কথা শুনিবে, তাহা তাহাদের মনে দৃঢ়রূপে রোপিত করিয়া দেও। এবং বিশেষরূপে আমাদের পাদরি সাহেবের প্রতি প্রসন্ন হও, ও আমাদের মণ্ডলীর প্রতি আশীর্ব্বাদ কর।
মাতা রবিবারে অতি প্রত্যূষে ভাত রাঁধিয়া দেন, পরে আমাদের খাওয়া হইলে পর পিতা পুনর্ব্বার প্রার্থনা করেন। তখন আমরা সকলে পরিষ্কার কাপড় পরিয়া দ্বারে চাবি দিয়া গীর্জাতে যাই। গীর্জা সাঙ্গ হইলে পর, যেমন পূর্ব্বে বলিয়াছিলাম, কএক জন পুরুষ হেথায় উপদেশের বিষয়ে কথোপকথন করিতে আইসে। এমত সময়ে সত্যবতী এবং আমি ধর্ম্মপুস্তকের একটি পদ আর একটি গান অভ্যাস করি। সকল লোক গৃহে গেলে পরে, পিতা আমাদের পড়া শুনেন, ও ধর্ম্মপুস্তকের কথা বড় স্পষ্টরূপে বুঝাইয়া দেন; অথবা যূষফ বা দানিয়েল কিম্বা শিমুয়েল ইত্যাদির ইতিহাস বলেন। এই জন্যে আমরা রবিবারকে অন্য সকল দিবসহইতে অতিশয় প্রিয় জ্ঞান করি।
তখন আমি এই কথা শুনিয়া মনের মধ্যে ভাবিলাম, হায়! বাঙ্গালাদেশে যদ্যপি এই পরিবারের মত সকল খ্রীষ্টিয়ান লোক ধার্ম্মিক হইত, তবে দেব পূজকদের মধ্যে আমাদের ধর্ম্ম অবশ্য সুগ্রাহ্য হইতে পারিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই, যে অনেক ভাক্ত খ্রীষ্টিয়ান লোকেরা হিন্দু ও মুসলমানদের ন্যায় মন্দ আচার ব্যবহার করিয়া খ্রীষ্টের নামে কলঙ্ক দেয়।
পরে আমি সত্যবতীর প্রতি ফিরিয়া বলিলাম, ভাল সত্যবতী, পড়া সাঙ্গ হইলে তোমরা রবিবারে আর কি২ কর, তাহা তুমি আমাকে বল।
সে উত্তর করিল, পাঁচ ঘণ্টার সময়ে পিতা ও ভ্রাতা পুনর্ব্বার গীর্জায় যান, কিন্তু মাতা গৃহে থাকিয়া অন্ন পাক করেন। পরে আমি আপন ছোট ভাই প্রিয়নাথকে লইয়া বেড়াই; সে আমাকে বড় ভালবাসে, এবং আমাকে দেখিয়া করতালি দেয়। পিতা গীর্জাহইতে সাত ঘণ্টার সময়ে আইসেন, পরে ভোজনাদি সাঙ্গ হইলে আমরা আরবার গান গাই, কিম্বা দাদা যাত্রিকের যাত্রাপুস্তক পড়েন, আমরা সকলে বসিয়া শুনি। শেষে প্রার্থনা করিয়া শয়ন করিতে যাই।
ইহা শুনিয়া আমি বলিলাম, ভাল, তোমাদের পিতা তোমাদিগকে ধর্ম্মের বিষয়ে কিরূপে শিক্ষা দেন, আমি তাহা জানিতে বড় ইচ্ছুক আছি; অতএব এই স্থানে যদি কোন রবিবারে তাহা শুনিতে আইসি, তবে কি তিনি অসন্তুষ্ট হইবেন?
সাধু বলিল, না মেম সাহেব, পিতা তাহাতে বড় আহ্লাদিত হইবেন; কিন্তু বোধ হয়, আপনার সাক্ষাতে আমাদিগকে পড়াইবেন না। আপনি যেন আমাদিগকে শিক্ষা দেন, তিনি এমত প্রার্থনা করিবেন, আমি তাহা নিশ্চয় জানি।
সত্যবতী বলিল, ও দাদা! তাহা হইলে বড় উত্তম হয়। পরে সে আমার প্রতি চাহিয়া কহিল, আপনি বড় ভাল বিবি; আমি আপনার নিকটে একবার পড়া দিতে চাহি, কিন্তু তাহা কি প্রকারে হইবে? আপনি তো বাঙ্গালা পড়িতে পারেন না।
তাহাতে আমি হাসিয়া জিজ্ঞাসিলাম, হা সত্যবতী, এমত কথা তোমাকে কে বলিল? যদি তোমা অপেক্ষা আমি ভাল পড়িতে পারি, তবে কি হয়?
সত্যবতী এই কথাতে কিঞ্চিৎ লজ্জিতা হইয়া উত্তর দিল, আমি মনে করিয়াছিলাম যে কেবল পাদরিদের বিবিরাই বাঙ্গালা পড়া শিক্ষা করেন, কিন্তু আপনি তো পাদরির বিবি নহেন।
আমি বলিলাম, একথা সত্য বটে, কিন্তু যদ্যপি পাদরির মেম নহি, তথাপি আমি বাঙ্গালিদিগকে বড় দয়া করি, এবং যেন তাহাদিগকে শিক্ষা দিতে পারি এই জন্যে অতিশ্রমপূর্ব্বক বাঙ্গালি ভাষা শিক্ষা করিয়াছি। অতএব তুমি যেমন ইচ্ছা করিলা, তেমনি আমি এক দিন আসিয়া তোমার পাঠ শুনিব। তখন আমি কেমন পণ্ডিত, তাহা তুমি জানিতে পারিবা। কিন্তু বড় বিলম্ব হইল, এখন আমাকে গৃহে যাইতে হইবে; ইহা বলিয়া আমি শিশুদের হাতে একটি২ সিকি দিলাম, তাহাতে তাহারা বড় সন্তুষ্ট হইয়া গ্রামের সকল কুকুর তাড়াইয়া দিতে২ প্রান্তভাগ পর্য্যন্ত আমাকে রাখিয়া গেল।
সেই রাত্রিতে আমি শয়নকালে এমত প্রার্থনা করিলাম; ওহে পরমেশ্বর! প্রভুর দিনেতে আমি আত্মাতে আবিষ্ট হইয়া যেন উঠি, আমার প্রতি এই অনুগ্রহ কর। এবং যত দিন পর্য্যন্ত স্বর্গের অক্ষয় সুখ ভোগ করিতে না পাই, তত দিন পর্য্যন্ত এই সংসারে বিশ্রাম দিবস উত্তমরূপে পালন করিতে আমাকে শক্তি দেও।
তৃতীয় অধ্যায়
পর দিবস প্রত্যূষে আয়া আসিয়া আমাকে এই সমাচার দিল; মেম সাহেব, খ্রীষ্টিয়ানদের পল্লী হইতে এক জন স্ত্রীলোক আসিয়া বলিতেছে, মেমের নিকটে আমার একটি নিবেদন আছে। কিন্তু মেম সাহেব যে খ্রীষ্টিয়ান লোকদিগকে কল্য দেখিয়াছিলেন, এ ব্যক্তি তাহাদের মত নয়। এতো বড় ময়লা ছেঁড়া কাপড় পরিয়া আসিয়াছে, এই জন্যে তাহাকে ভিতরে না অনিয়া বারাণ্ডায় বসিতে বলিয়াছি। আমি আয়াকে কহিলাম, ভাল করিলা, আমি তথায় গিয়া তাহার সহিত কথা কহিব। পরে বারাণ্ডায় উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, যে স্ত্রীলোকের সঙ্গে ফুলমণির গৃহে প্রথমবার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, সেই বসিয়া আছে।করুণা আমাকে অন্বেষণ করিতেছে ইহা দেখিয়া আমি প্রথমে আশ্চর্য্য জ্ঞান করিলাম, কিন্তু শেষে শুনিলাম যে সাধু ও সত্যবতী আহ্লাদ প্রযুক্ত আমার দত্ত দুই সিকি পাড়ার মধ্যে সকল লোককে দেখাইয়াছিল, তাহাতে করুণা মনে করিল, আমি যদি মেম সাহেবের নিকটে গিয়া দুঃখ জানাই, তবে অবশ্য কিছু পাইব। এমত মনে ভাবিয়া সে আমাকে দেখিবামাত্র বড় কাঁদিয়া কহিতে লাগিল, মেম সাহেব, আপনি দুঃখি লোকদের মা বাপ, আপনি আমাদের আশ্রয়, আপনি ব্যতিরেকে জগতে আমাদের আর কেহ নাই। দেখুন আপনি কল্য ধনি লোকের ছেল্যাদের প্রতি দয়া করিলেন; আমি দীন দুঃখি লোক অতএব আমার প্রতিও কিছু মনোযোগ করিতে হইবে।
করুণার এই সকল দুঃখের কথা শুনিয়া আমিও দুঃখিতা হইলাম; কিন্তু ফুলমণির সহিত পূর্ব্বে তাহার যে কথা হইয়াছিল, তাহা স্মরণ করিয়া অনুমান করিলাম, করুণা অবশ্য অলসা স্ত্রী, এবং আপন দোষ প্রযুক্ত সে এরূপ দুর্দশাতে পতিত হইয়াছে। আরও ভাবিলাম, যদি আমি এখন বিবেচনা না করিয়া এবং বিশেষ না জানিয়া এই খ্রীষ্টিয়ান লোকদের টাকা দিতে আরম্ভ করি, তবে তাহাদের উপকার না হইয়া বরং ক্ষতি হইবে; কারণ তদ্দ্বারা তাহাদের মধ্যে হিংসা ও লোভ অবশ্য জন্মিতে পারিবে।
ইহা বুঝিয়া আমি করুণাকে বলিলাম, দেখ করুণা, তুমি যে এই স্থানে রবিবারে এমত মলিন কাপড় পরিয়া আসিয়াছ, ইহাতে আমি বড় অসন্তুষ্টা হইলাম, কারণ এখন গীর্জা যাইবার জন্যে প্রস্তুত হওয়া তোমার উচিত ছিল। আরও বলি, প্রতিবাসিদের নিকটে তোমার আচার ব্যবহারের বিষয়ে তত্ত্ব না করিলে আমি তোমাকে কিছু ভিক্ষা দিতে পারিব না।
করুণা এই কথা শুনিয়া আর একবার কাঁদিয়া বলিতে লাগিল; ও মেম সাহেব, আমি বড় দুঃখি লোক, আমার স্বামী আছে বটে, কিন্তু সে দুষ্ট ও মাতাল। যদ্যপি সে ছুতার মিস্ত্রির কর্ম্মেতে বড় নিপুণ, এবং কর্ম্ম করিলে প্রতিদিন স্বচ্ছন্দে চারি আনা পয়সা উপায় করিতে পারে, তথাপি সে এমত অলস যে আমাকে কখন কিছু আনিয়া দেয় না। আর দেখ, মেম সাহেব, আপনি যদি ময়লা কাপড়ের বিষয়ে দোষ দেন, তবে বলিতে হয়, এই বস্ত্র ব্যতিরেকে আমার কেবল একখান মোটা শাড়ি আছে, সেখানি পয়সা না থাকাতে প্রায় এক মাস পর্য্যন্ত ধোপার ঘরে পড়িয়া আছে।
তখন আমি এই কথা শুনিয়া বলিলাম, করুণা, তুমি যদি একটি পয়সার অভাব প্রযুক্ত পরিষ্কার কাপড় পরিতে পাও না, তবে আমি সে পয়সাটি তোমাকে দিই। তুমি ধোপার নিকটে গিয়া ধৌত শাড়ি পরিয়া শীঘ্র গীর্জায় যাও। কিন্তু করুণার মুখ দেখিয়া বোধ করিলাম, তাহার গীর্জায় যাইবার ইচ্ছা ছিল না। সে পয়সাটি হাতে করিয়া বলিতে লাগিল, ও বিবি সাহেব, দয়া করিয়া আমাকে আর কিছু দেও। ঘরেতে আমার একটি সন্তান বড় পীড়িত আছে, এবং তাহাকে কোন খাদ্যদ্রব্য আনিয়া দি, এমত আমার কিছু সঙ্গতি নাই।
পরে আমি বলিলাম, এ বড় দুঃখের বিষয় বটে। এ কথা আমাকে পূর্ব্বে জানাইলা না কেন? তখন আমি একটি রুটী ও কিছু মিসরী ও সাগুদানা তাহার হাতে দিয়া কহিলাম, এখন শীঘ্র গৃহে যাইয়া এই সকল তোমার ছেল্যাকে খাইতে দেও; এবং কল্য সন্ধ্যাকালে আমি আপনি পাড়ায় গিয়া কি প্রকারে তোমার উপকার করিতে পারি, তাহা বিবেচনা করিব।
ইহা শুনিয়া করুণা অসন্তুষ্ট চিত্তে চলিয়া গেল; তাহাতে আমি বোধ করিলাম রুটী ও মিসরীর পরিবর্ত্তে যদি তাহাকে কিছু পয়সা দিতাম, তবে সে অধিক আহ্লাদিতা হইত। কিন্তু বিশ্রামদিবসে যেন তাহাকে কোন দ্রব্য ক্রয় করিতে না হয়, এই জন্যে আমি তাহাকে পয়সা না দিয়া উক্ত দ্রব্য সকল দিলাম।
পর দিবসে আমি প্রতিজ্ঞানুসারে খ্রীষ্টিয়ান গ্রামে উপস্থিতা হইলাম, এবং কিঞ্চিৎ কাল অনুসন্ধান করিয়া করুণার বাটীর উদ্দেশ পাইলাম। হায়২! ফুলমণির গৃহ এবং করুাণার গৃহ এ দুইয়ের কত বিশেষ দেখিলাম। করুণার উঠানের মধ্যে একটি ছোট রান্না ঘর ছিল বটে, কিন্তু তাহার চাল সমস্ত ভাঙ্গিয়া পড়াতে উনুন ও রন্ধন করিবার দ্রব্য সকল বড় গৃহের দাবায় রাখিয়াছিল। আমার আগমনের পূর্ব্বে করুণা অন্ন পাক করিতেছিল, তাহাতে ধূঁয়া প্রযুক্ত আমি গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারিয়া দেখিলাম সে গৃহও ভগ্নপ্রায় হইয়াছে। তাহার উঠান্টি বড় অপরিষ্কার ছিল, তথাপি আমাকে সেইখানে দাঁড়াইয়া থাকিতে হইল; কেননা করুণা বলিল, মেম সাহেব, আমার যে মোড়াটি ছিল, তাহা আজি ছেল্যারা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে।
যদ্যপি করুণা এমত দুঃখিতা ছিল, যে প্রায় আপনার পরিবারের আহারাদি যোগাইতে পারিত না, তথাপি তাহাদের ঘরে একটি নেড়ি কুকুর পোষা ছিল। সে আমাকে দেখিয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিল, তাহাতে কিছু কাল পর্য্যন্ত কুকুরের শব্দ বিনা আর কিছু শুনা গেল না। শেষে করুণা তাহাকে বিস্তর ধম্কাইয়া চুপ করাইলে পর আমি বলিলাম; করুণা, তুমি আজি আমার অপেক্ষাতে ছিলা, ইহাতে বোধ করিয়াছিলাম যে তুমি আপন ঘরটিকে কিছু পরিষ্কার করিয়া রাখিবা। আরো জিজ্ঞাসিলাম, তোমার ধৌত শাড়ি কোথায়? তুমি যে ময়লা কাপড় পরিয়া আমার গৃহে গিয়াছিলে, এখন সেই কাপড় তোমার গায়ে দেখিতেছি।
করুণা উত্তর করিল, মেম সাহেব, আপনি যে পয়সাটি দিয়াছিলেন, তাহাতে পান তামাকু কিনিয়া আনিলাম। কাপড়ের দুই এক দিন বিলম্ব হইলে ক্ষতি নাই; কিন্তু আমরা তামাক্ না খাইলে মারা পড়ি।
আমি কহিলাম, তোমাদের তামাক্ খাওয়াটা বড় মন্দ; কিন্তু সে এক প্রকার ক্ষুদ্র বিষয়। তুমি যে বিশ্রামবারে ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করিয়া বাজারে গিয়াছিলা, ইহা শুনিয়া আমি বড় দুঃখিতা হইলাম।
করুণা বলিল, মেম সাহেব, আমরা দুঃখি লোক, পেটে খাইতে পাই না; তাহাতে ধর্ম্মকর্ম্ম কি প্রকারে করিব? এবং আমি যে একালা রবিবার দিনে হাট বাজার করি, তাহা তো নয়; এমত আর দশ জন খ্রীষ্টিয়ান লোককে দেখাইয়া দিতে পারি।
আমি বলিলাম, হইতে পারে; তথাপি দশ জন যাহা করে তাহাই করা উচিত নহে। তুমি যদি ঐ দশ জনের মতে না চলিয়া তোমার প্রতিবাসিনী ফুলমণির মতে চলিতা, তবে ভাল হইত।
করুণা বলিল, ও মেম সাহেব, ফুলমণিতে ও আমাতে অনেক বিশেষ আছে, তাহার মত মানুষ পাওয়া ভার। এবং আর একটি কথা আছে; তাহারা ধনি লোক, তাহাদের কাপড়ের ও টাকা কড়ির অভাব নাই, তাহাতে তাহারা স্বচ্ছন্দে শনিবারে সকল দ্রব্য কিনিয়া রাখিয়া রবিবারে পরিষ্কার কাপড় পরিয়া গীর্জায় যাইতে পারে।
আমি কহিলাম, দেখ করুণা, এখন তুমি দুইবার আমার সাক্ষাতে ফুলমণিকে ধনি লোক বলিলা। তাহার স্বামী কেবল সাত টাকা মাহিনা পাইয়া থাকে; তবে তাহারা কি প্রকারে ধনী হইল? কিন্তু সে পরিবার কেমন করিয়া এমত সুখে কাল কাটায়, তাহা আমি সুন্দররূপে জ্ঞাতা আছি; অর্থাৎ সে ফুলমণির পরিশ্রম ও পরিমিত ব্যায়ের দ্বারা হয়, বিশেষতঃ স্পষ্টরূপে বোধ হইতেছে যে ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ তাহার উপরে বর্ত্তিয়াছে। ঈশ্বর আপন আজ্ঞা পালনকারি ইস্রায়েল লোকের প্রতি যে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, সেই অঙ্গীকার ফুলমণির প্রতি সফল হইয়াছে; যথা “তোমরা চুপড়িতে ও রুটীর পাত্রে আশীর্ব্বাদ পাইবা।” দ্বিতীয় বিবরণ ২৮।৫। ফুলমণি ঈশ্বরের আজ্ঞা সকল পালন করিয়া তাঁহার বাকেতে অতি যত্নপূর্ব্বক মনোযোগ করে, এই জন্যে সে আশীর্ব্বাদ পায়। যীশু খ্রীষ্ট সত্য বলিয়াছেন, যথা “প্রথমে ঈশ্বরের রাজ্য ও ধর্ম্মের বিষয়ে সচেষ্ট হও, তাহা হইলে আর সকল দ্রব্য তোমাদিগকে দত্ত হইবে।” মথি ৬।৩৩।
করুণা কহিল, হাঁ মেম সাহেব, এমত হইতে পারে বটে, কিন্তু আমার দশাপেক্ষা ফুলমণির দশা সর্ব্বপ্রকারে ভাল। দেখুন, তাহার স্বামী কেমন ধার্ম্মিক লোক, কিন্তু আমার স্বামী দুষ্ট ও বড় মাতাল! ও মেম, সে আমাকে যে দুঃখ দেয়, তাহা যদি আপনি দেখিতেন, তবে আমার প্রতি আপনকার মনে কিছু দয়া হইত।
ইহা শুনিয়া আমি করুণার প্রতি বড় দুঃখিতা হইয়া বলিলাম, দেখ করুণা, তোমার স্বামী যদি তোমাকে দুই একটি কঠিন বাক্য কহে, তবে কোন প্রকারে তাহা সহ্য করিতে হইবে; কেননা বিবাহিত স্বামীহইতে তোমাকে কেহ পৃথক করিয়া দিতে পারিবে না। কিন্তু সে যাহা হউক, তোমার পীড়িত সন্তান কেমন আছে? তাহা আমাকে বল।
এই কথাতে করুণা কিছু ভয় পাইল, পরে সে কহিল, মেম সাহেব, আজি সে কিঞ্চিৎ ভাল আছে; এজন্যে আমি তাহাকে অনেকবার বারণ করিলেও সে বাহিরে খেলা করিতে গিয়াছে। মেম সাহেব, সে বড় চঞ্চল বালক, কাহারো কথা মানে না।
আমি বলিলাম, কল্য সে অতিশয় পীড়িত ছিল, আজি খেলা করিতে বাহিরে গিয়াছে, এই কথাতে আমার বড় আশ্চর্য্য বোধ হইতেছে। হায় করুণা! বোধ হয় তুমি এই বিষয়ে আমার নিকটে সম্পূর্ণরূপে সত্য কথা কহ নাই।
করুণা লজ্জিতা হইয়া উত্তর করিল, মেম সাহেব, গত মাসে তাহার কেমন শক্ত ব্যামোহ হইয়াছিল, তাহা সকলেই জানে; কিন্তু এখন ঈশ্বরের অনুগ্রহেতে সে কিঞ্চিৎ ভাল আছে বটে।
করুণা এই কথা কহিতেছে, এমত সময়ে একটি ছোট বালক গৃহের ভিতরে দৌড়িয়া আইল। তাহার বর্ণ অতিশয় কাল, এবং ধূলা ও কাদাতে খেলা করিয়া আসিয়াছিল, এই জন্যে তাহাকে আরও মলিন বোধ হইল। সে প্রায় উলঙ্গ, কেবল তাহার কোমরে এক খানি ছেঁড়া কানি বাঁধা ছিল। ঐ ছেল্যাকে দেখিয়া তাহার মা তাহাকে হঠাৎ বলিল, নবীন এখানে আসিয়া মেম সাহেবকে সেলাম কর। এই মেম সাহেব অতিশয় দয়ালু; ইনি কল্য তোমাকে রুটী ও মিসরী পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু নবীন আপন মাতাকে উত্তর করিল, আমি মেম সাহেবকে কেন সেলাম করিব? তুমি তো তাঁহার রুটী ও মিসরী আমাকে খাইতে দিলা না।
তাহাতে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এই কেমন কথা! তবে সে রুটী কি হইল? নবীন তাড়াতাড়ি করিয়া কহিল, মেম সাহেব, আমার নিকটে শুন, আমি তোমাকে বলি। বকুল নামে এক জন স্ত্রী এই পাড়াতে থাকে, তাহার মেয়ার ব্যামোহ হইয়াছে, এই জন্যে সে দুই পয়সা দিয়া মায়ের নিকটে ঐ রুটী কিনিয়া লইল; এবং মা সেই পয়সাতে তখনই তামাক্ কিনিয়া আনিল। ও মেম সাহেব, তুমি যদি তাহার তামাক্ খাওয়া দেখ, তবে আশ্চর্য্য জ্ঞান করিবা। সমস্ত দিন তাহার আর কোন কর্ম্ম নাই, এবং রাত্রির মধ্যে সে আমাকে এক শত বার জাগাইয়া বলে, তামাক্ সাজ্২, এই কারণে পিতার নিকটে কত বার মার খাইয়াছে, তবু তাহার জ্ঞান হয় না।
বালকের এই সকল কথাতে তাহার মাতা বড় রাগান্বিতা হইয়া তাহার গালে শক্তরূপে একটা চড় মারিয়া বলিল, নবীন, তুই বড় মিথ্যা কহিস্। কিন্তু আমি ভালরূপে মনে২ জানিলাম, যে নবীন সত্য কথা বলিল, করুণা কেবল আপন দোষ লুকাইবার নিমিত্তে আমার সাক্ষাতে তাহাকে শাস্তি দিল।
মায়ের এবং সন্তানের পরস্পর এমত অনুচিত ব্যবহার দেখিয়া আমি প্রায় নিরাশ হইয়া বোধ করিলাম, এই ব্যক্তিরা বুঝি কখন ধর্ম্ম পথে চলিবে না; কিন্তু তখন পরমেশ্বরের এই বাক্য আমার স্মরণে হইল, “আমি লোকদের প্রস্তরময় অন্তঃকরণ দূর করিয়া তাহাদিগকে নম্র অন্তঃকরণ দিব, তাহাতে তাহারা আমার লোক হইবে।” যিহিষ্কেল ১১।১৯। এই দয়ালু অঙ্গীকারদ্বারা কিঞ্চিৎ আশ্বাস পাইয়া স্থির করিলাম যে আমি করুণাকে এখন কোন প্রকারে ত্যাগ করিব না, বরং উপদেশ ও প্রার্থনাদ্বারা তাহাকে ধর্ম্মের পথ অবলম্বন করাইতে সাধ্য পর্য্যন্ত যত্ন করিব।
এমত মনে করিয়া আমি প্রথমে তাহাকে জিজ্ঞাসিলাম, করুণা, তুমি কোন কর্ম্ম করিতে পার কি না? সে উত্তর করিল, মেম সাহেব, আমরা গৃহস্থ লোক, কি কর্ম্ম করিব? আমি পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসিলাম, তুমি কি বস্ত্রাদি সিলাই করিতে পার? করুণা কহিল, হাঁ, মোটা সিলাই কিছু২ করিতে পারি।
আমি কহিলাম, যদি এমত হয় তবে এখনি তোমাকে কর্ম্ম দিতে পারি। শনিবারে আমি ৭২ খানা ঝাড়ন কিনিয়াছি, দরজীকে তাহা দিলে সে সিলাই করিতে প্রত্যেকে এক পয়সা করিয়া লইবে; কিন্তু তুমি যদি তাহা সিলাই কর, তবে আমি তোমাকে প্রত্যেক ঝাড়নেতে দুই পয়সা করিয়া দিব, সর্ব্বশুদ্ধ ২৷৷৹ নয় সিকা হইবে, তাহা লইয়া তুমি দুইখান উত্তম শাড়ি কিনিতে পারিবা।
ইহা শুনিয়া করুণা কহিল, আপনি ধনবান্ লোক, দীনহিনকে একটা টাকা অমনি ফেলিয়া দিলে আপনকার কিছু ক্ষতি হইবে না। আমি যে সিলাই করিয়া পয়সা রোজগার করিব, এমত আমার অবকাশ নাই, এখন যদি ঘরের কর্ম্ম সকল সামলাইতে পারি না, তবে সিলাই করিতে গেলে খাওয়া দাওয়া একেবারে ত্যাগ করিতে হইবে।
তাহাতে আমি বলিলাম, ভাল করুণা, যেমন তোমার ইচ্ছা হয় তেমনি কর; কিন্তু ধর্ম্মপুস্তকে লেখা আছে, “যে কেহ্ কার্য্য করিবে না সে ভোজন না করুক।” থিষলনীকীয় মণ্ডলীর প্রতি পত্র ৩।১০। এই জন্যে আমি যে তোমাকে ভিক্ষা দিব এমত ভরসা করিও না; সেলাম, এখন আমি যাই।
এই কথাতে করুণার মুখ বড় ম্লান হইয়া গেল, ইহা দেখিয়া আমি পুনর্ব্বার বলিলাম, করুণা, ঝাড়ন গুলিন যদি চাও তবে আমি বেহারার হাতে পাঠাইয়া দিব। তথাপি সে অলসা স্ত্রী উত্তর করিল, না না, তাহা করিতে পারিব না; ঈশ্বর যেমন আমাদিগকে বরাবর এক মুটা ভাত দিয়া আসিতেছেন তেমনি দিবেন, তোমার সিলাই না করিলে আমরা কিছু মারা পড়িব না।
আমি এই কথা শুনিয়া কহিলাম, আমি তোমার সাহায্য করিতে চাহিয়াছিলাম বটে, কিন্তু তুমি যদি এমন কথা কহ, তবে আমি আর কি করিতে পারি? পরে আমি নবীনের প্রতি ফিরিয়া বলিলাম, আমার এই স্থানে আসা অদ্য বিফল হইল, কিন্তু এখন বেলা আছে, এই জন্যে মধুর বাটীতে যাইতে ইচ্ছা করি; অতএব তুমি যদি আলস্য না করিয়া আমার সঙ্গে গিয়া পথ দেখাইয়া দিতে পার, তবে আমি তোমাকে চারিটি পয়সা দিব।
নবীন এই কথাতে বড় সন্তুষ্ট হইয়া আমার অগ্রে২ লম্ফ দিয়া গমন করিতে লাগিল। কিঞ্চিৎ পরে আমরা একটা বড় উচ্চ খোলার ঘরের নিকটে পৌঁছিলে নবীন বলিল, মেম সাহেব, এই বাটী মধুর। তাহাতে আমি তাহাকে বিদায় করিলে, সে পয়সা পাইয়া আনন্দ প্রযুক্ত দৌড়িয়া বেড়াইতে লাগিল; আমি তাহা দেখিয়া বোধ করিলাম, এই বালক যে কল্য পীড়িত ছিল ইহা নিতান্তই মিথ্যা।
পরে আমি উক্ত গৃহের উঠানের নিকটে দাঁড়াইয়া এক জন স্ত্রী লোকের ক্রন্দন এবং কোন পীড়িত ব্যক্তির বড় কোঁকানি শব্দ শুনিতে পাইলাম। যদ্যপিও তাহাদের সহিত আমার পূর্ব্বে পরিচয় ছিল না, তথাপি আমি নিঃশব্দে বহির্দ্বার খুলিয়া ভিতরে গেলাম, কারণ আমি জানিতাম, যে বাঙ্গালা দেশস্থ লোকদের পীড়া হইলে যদি বাহিরের কোন মানুষ আসিয়া তাহাদের নিকটে বৈসে, ও তাহাদের দুঃখে দুঃখিত হয়, তবে তাহারা বড় সন্তুষ্ট হয়। বিলাতে এমত নয় বটে, বরং সেখানে যদি কোন অপরিচিত ব্যক্তি হঠাৎ গিয়া রোগগ্রস্থ মানুষের নিকটে উপস্থিত হয়, তবে সেই পীড়িত ব্যক্তির বন্ধু বান্ধবেরা তাহাকে অশিষ্ট লোক জ্ঞান করে।
সে যাহা হউক, আমি ভিতরে গিয়া দেখিলাম, উঠান ও দাবা লোকেতে প্রায় পরিপূর্ণ আছে। আমাকে দেখিয়া কেহই আশ্চর্য্য জ্ঞান করিল না, কারণ আমি পাড়াতে যাতায়াত করিতাম, তাহা সকলে জ্ঞাত ছিল।
পরে যে বৃদ্ধা স্ত্রীর ক্রন্দনের শব্দ আমি শুনিয়াছিলাম, সে উপস্থিত হইয়া বলিল, মেম সাহেব, বোধ করি আপনি আমার ছেল্যার পীড়ার বিষয় শুনিয়া আসিয়া থাকিবেন? আমি কহিলাম, না, তাহা শুনি নাই, কেবল তোমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছি। কিন্তু তোমার পুত্ত্র কোথায়? আমি যদি কোন প্রকারে তাহার উপকার করিতে পারি, তবে অবশ্য করিব।
এই কথাতে প্রতিবাসি লোক সকল আমার জন্যে পথ ছাড়িয়া দিল, এবং বুড়ি আপন পুত্ত্রের খাটের নিকটে এক খানা চৌকি আনিয়া বলিল, মেম সাহেব, আপনি ইহাতে বসুন। হায়২! যে মাতাল ও দুষ্ট যুবপুরুষের বিষয় আমি ফুলমণির নিকটে শুনিয়াছিলাম, সেই মধুকে এখন মৃতপ্রায় দেখিতে পাইলাম। সেই দিবস প্রত্যূষে তাহার ভয়ানক উলাউঠা রোগ হইয়াছিল, আমি তাহাকে দেখিবা মাত্র জানিতে পারিলাম, তাহার বাঁচিবার কোন ভরসা নাই। পরে আমি বুড়িকে জিজ্ঞাসিলাম, তোমরা উহারে কি ঔষধ দিয়াছ? সে উত্তর করিল, মেম সাহেব, অনেক প্রকার ঔষধ দিয়াছি, যে যাহা বলিয়াছিল তাহা সকলই দিয়াছি। আমি বলিলাম, এ বড় অনুচিত কর্ম্ম করিয়াছ, কারণ এক ঔষধ অন্য ঔষধের গুণ নষ্ট করে, তাহা কি তুমি জান না?
কবিরাজ বুড়ির নিকটে চারি টাকা লইয়া মধুকে এক পান ঔষধ দিয়া দাবাতে তামাক্ খাইতেছিল, সে আমার কথা শুনিয়া ভিতরে আসিয়া বলিতে লাগিল, মেম সাহেব, আপনি যথার্থ কহিলেন। আমি ইহাদিগকে পূর্ব্বেই বলিয়াছিলাম, তিন চারি প্রকার ঔষধ একেবারে খাওয়াইও না, কিন্তু ইহারা আমার কথা মানিল না। মেম সাহেব, বাঙ্গালি স্ত্রীলোকদিগের জ্ঞান নাই, আপনারা যেমন বিবেচনা করেন, তেমন তাহারা পারে না। দেখুন, রোগী যদি মারা পড়ে, তবে ইহাদেরি দোষ হইবে, আমার কোন দোষ নাই। যদি আর কোন ঔষধ উহাকে না দিত, তবে অবশ্য আমার ঔষধে ভাল হইত, কারণ এই ঔষধদ্বারা পীড়িত মানুষ সর্ব্বদাই সুস্থ হয়। অল্পদিন হইল এক ব্যক্তি আপন স্ত্রীকে দেখাইবার জন্যে আমাকে ডাকিয়া লইয়া গিয়াছিল, আমি তাহার গৃহে গিয়া দেখিলাম, সে রোগির ধাতু নাই, এবং কথা কহিতে পারে না, এমত ব্যক্তিকেও আমি সুস্থ করিলাম।
আমি কহিলাম, না না, কবিরাজ মহাশয়, এমত কথা বলিও না, তুমি তাহাকে সুস্থ কর নাই, কিন্তু পরমেশ্বর তোমার ঔষধে আশীর্ব্বাদ দেওয়াতে তদ্দ্বারা সে আরোগ্য হইয়াছিল।
কবিরাজ উত্তর করিল, হাঁ মেম সাহেব, তাহাই বটে; পরমেশ্বরের অনুগ্রহ ব্যতিরেকে আমরা কি করিতে পারি?
এই কথাতে আমি মধুর হস্ত ধরিয়া বলিলাম, ওগো! তুমি কি এ ব্যক্তির কথা শুনিতেছ? ইনি হিন্দুলোক হইয়াও বলেন, পরমেশ্বরের কৃপা ব্যতিরেকে আমরা কি করিতে পারি? অতএব আমি ভরসা করি, যে এই ভয়ানক সময়ে পরমেশ্বর তোমার সহিত থাকিয়া তোমাকে সান্ত্বনা করিতেছেন।
মধু উত্তর করিল, না না, ঈশ্বর আমার সহিত নাই। হায়২! তিনি যদি আমার সহিত থাকিতেন তবে আমার সকল ভয় দূর হইত; কিন্তু তিনি এখানে নাই। বোধ হয় যেন শয়তান আমার কর্ণের নিকটে বসিয়া ফুস২ করিয়া বলিতেছে, এখন তোকে সকল দুষ্ট ক্রিয়ার ফল ভোগ করিতে হইবে।
এই কথা শুনিয়া প্রতিবাসি লোকেরা বড় ভয় পাইল, এবং দুই তিন জনে বলিল, জাঁতি কিম্বা ছুরি কোনো একখান লোহার দ্রব্য শীঘ্র করিয়া উহার মাথার নিকটে রাখিয়া দেও।
কিন্তু মধু আপন চক্ষু খুলিয়া বলিল, হায়২ বন্ধুরা! তোমরা খ্রীষ্টিয়ান হইয়াও কি এই সকল মিথ্যা গল্প মান? লৌহদ্বারা আমার কোন উপকার হইবে না। পরে সে আপন বক্ষঃস্থলে করাঘাত করত বলিতে লাগিল, শয়তান এখানে আছে, এখানে আছে, সে আমার মনের মধ্যেই আছে। হায়২ দুর্ভাগ্য মনুষ্য যে আমি! আমি যদি ভূতরাজকে সেবা না করিয়া পরমেশ্বরের সেবা করিতাম, তবে এখন আহ্লাদ পূর্ব্বক মরিতে পারিতাম।
মধু মনের অতিশয় যন্ত্রণা প্রযুক্ত উক্ত কথা উচ্চৈঃস্বরে কহিয়াছিল, তাহাতে তাহার যে যৎকিঞ্চিৎ বল ছিল, তাহা হ্রাস হইলে সে বালিশের উপরে মাথা রাখিয়া বার২ জল চাহিতে লাগিল; কিন্তু তাহার বন্ধুরা বলিল, না না, জল দিলে ব্যামোহ বাড়িবে। এ কথা যথার্থ নহে, ইহা আমি ভালরূপে জ্ঞাতা ছিলাম, তথাপি আমাকে যেন পশ্চাতে কেহ দোষ না দেয় এই জন্যে কবিরাজের প্রতি ফিরিয়া জিজ্ঞাসিলাম, ইহাকে কিঞ্চিৎ জল দিলে কি কোন ক্ষতি হইবে? তাহাতে কবিরাজ আমাকে ধীরে২ বলিল, এ কোন প্রকারে বাঁচিবে না, অতএব যাহা খাইতে চাহে তাহা দেও।
এই কথা শুনিয়া আমি এক বাটি জল মধুর মুখের কাছে ধরিলাম, তাহাতে সে তাবৎ জল খাইয়া কিঞ্চিৎ আরাম বোধ হইল, পরে অতি ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, রাণি কোথায়? গোলমাল প্রযুক্ত আমিও রাণির বিষয় নিতান্ত বিস্মৃতা হইয়াছিলাম, কিন্তু মধুর কথা শুনিয়া আমি তাহার মাতাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হাঁ গো, তোমার বউ কোথায়? সে যে এখানে নাই, ইহা বড় আশ্চর্য্য। এমন সময়ে আপন স্বামির নিকটে থাকা তাহার কর্ত্তব্য ছিল বটে।
বুড়ি উত্তর করিল, বউ এখানে ছিল, কিন্তু অল্পক্ষণ হইল সে ফুলমণিকে ডাকিতে গিয়াছে; কারণ সে বলিল, ফুলমণি যদি আসিয়া আমার স্বামির সহিত কিছু ধর্ম্মের কথা কহে তবে তাহার মঙ্গল অবশ্য হইতে পারিবে। বুড়ি এই কথা বলিবা মাত্র ফুলমণি ও রাণি উভয়ে আসিয়া উপস্থিত হইল।
ফুলমণি একেবারে মধুর খাটের নিকটে গিয়া কাঁদিতে লাগিল। পূর্ব্বে তাহাদের পরস্পর যে কিছু বিচ্ছেদ ছিল, তখন তাহার চিহ্ণ মাত্র দৃশ্য হইল না; বরং ফুলমণি আপন হাত তাহার মাথার নীচে দিয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ তুলিয়া বলিতে লাগিল, হায়২ মধু! তুমি যখন শিশুকালে আমাকে মা বলিয়া আমার গৃহে মিঠাই খাইতে আসিতা, তখন আমি কতবার তোমাকে ক্রোড়ে করিয়া বেড়াইয়াছিলাম। হায়২ বাছা! এখন তোমার কি অবস্থা হইল। ও মধু, তুমি সম্পূর্ণরূপে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের উপরে বিশ্বাস রাখ। তুমি পাপরূপ সাগরে ডুবিতেছ বটে, কিন্তু যীশু তোমাকে রক্ষা করিবার নিমিত্তে আপন হস্ত বিস্তার করিতেছেন। ও মধু, তুমি যীশুর হাত ধর, তিনি তোমাকে তুলিয়া লইবেন। হে বাছা, তুমি তাঁহার নিকটে একটি ক্ষুদ্র প্রার্থনা কর।
এই সকল কথা শুনিয়া মধু আপনার মনের যাতনা আর সহ্য করিতে পারিল না, তাহাতে সে অতিশয় ব্যাকুল হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিল, হায়২ ফুলমণি মা! আমার পরিত্রাণের দিবস বহিয়া গিয়াছে। শয়তান কাল সর্পের মত আমাকে দংশন করিয়াছে, তাহাতে আমার মরণ অতি নিকট, ইহা আমি বিলক্ষণ জানিতেছি। ওগো ফুলমণি মা, ধর্ম্মপুস্তকে কি শয়তানকে বৃহ্ৎ সর্প বলা যায় না?
তাহাতে ফুলমণি বলিল, হাঁ, শয়তানকে পুরাতন ও বৃহৎ সর্প বলা যায় বটে, কেননা সে সর্পরূপে আমাদের আদি মাতার ভ্রান্তি জন্মাইয়া তাহার বংশ সকল নষ্ট করিতে চেষ্টা করে। কিন্তু ওহে মধু, তাহাতে তুমি নৈরাশ হইও না,
পিত্তলের সর্পের কথা স্মরণ করিয়া প্রভু যীশুর আশ্রয় লও। তিনি আপনি কহিয়াছেন, “মুসা যেরূপ প্রান্তরে সর্পকে ঊর্দ্ধ্বে উঠাইল, মনুষ্য পুত্ত্রকেও তদ্রূপ উত্থাপিত হইতে হইবে; তাহাতে যে কেহ তাঁহাতে বিশ্বাস করিবে, সে বিনষ্ট না হইয়া অনন্ত পরমায়ুঃ পাইবে।”
মধু বলিল, যীশু আমার প্রার্থনা শুনিবেন না, এবং আমিও তাঁহার কাছে প্রার্থনা করিতে পারি না; কিন্তু আমি রাণির নিকটে ক্ষমা চাহিব। হে প্রিয়ে রাণি, আমি তোমার বিরুদ্ধে অনেক বার বড় দোষ করিয়াছি, কিন্তু এখন আমি মরিতেছি, আমাকে ক্ষমা করিতে হইবে। আমার ঘর ও ভূমি ইত্যাদি যে কিছু আছে সে সকলি তোমার, কিন্তু আমার মাতা যত দিন বাঁচিবেন, তত দিন তুমি তাঁহাকে খাইতে পরিতে দিও। তিনি তোমার প্রতি কখন২ অন্যায় ব্যবহার করিলেও তুমি তাঁহাকে ত্যাগ করিও না, তিনি তোমার স্বামির মাতা হন, ইহা স্মরণে রাখিও।
পরে মধু ফুলমণির প্রতি ফিরিয়া বলিল, মা! আমি রাণিকে তোমার হাতে সমর্পণ করিলাম। তুমি যেমন সত্য খ্রীষ্টিয়ান তেমনি তাহাকেও সত্য খ্রীষ্টিয়ান করিও, এবং তুমি যেমন অদ্য আপন শত্রুদের প্রতি প্রেম প্রকাশ করিয়াছ, তেমনি তাহাকেও আপন শত্রুর প্রতি প্রেম করিতে শিক্ষা দিও।
আর কিঞ্চিৎ কাল পরে মধু পুনর্ব্বার বলিতে লাগিল, ও মা ফুলমণি! রাণি প্রসব হইলে পর তুমি অনুগ্রহ করিয়া তাহার প্রতি ভাল চেষ্টা করিও; আর আমার ছেল্যাটি কিছু বড় হইলে যাহাতে সে ধর্ম্মের বিষয়ে শিক্ষা পায়, তজ্জন্যে তাহাকে পাদরি সাহেবের মেমের স্কুলে দিও।
এই কথা বলিয়া তাহার বড় জল পিপাসা হইল, তাহাতে সে কাঁদিতে২ কহিতে লাগিল, হায়২! আমি যদি এখন এই জল তৃষ্ণা সহ্য করিতে না পারি, তবে নরকের জ্বালা অনন্তকাল পর্য্যন্ত কি প্রকারে সহিতে পারিব? আমি আপন সাংসারিক বিষয় সকল নির্ধার্য্য করিলাম, কিন্তু ধিক২! পারমার্থিক বিষয়ে কি করিব? হায়! আমাকে নরকে যাইতে হইবে।
মধুর স্ত্রী এই কথা শুনিয়া তাহার বক্ষঃস্থলে পড়িয়া অতিশয় উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া বলিল, আপনি কি জন্যে নরকে যাইবেন? না না, ঈশ্বর তোমাকে নরকে ফেলিয়া দিবেন না। ফুলমণি মাতা যাহা বলে তাহাই কর, যীশুর হস্ত শক্তরূপে ধর, তিনি তোমাকে অবশ্য রক্ষা করিবেন। কিন্তু মধু আপন মাথা লাড়িয়া বলিল, না রাণি, না, যীশু আমাকে গ্রাহ্য করিবেন না, আমার পরিত্রাণের দিবস বহিয়া গিয়াছে। হায়! আমি কি করিব? ইহা বলিয়া সে অচৈতন্য হইল, এবং কিঞ্চিৎ কাল পরে তাহার অপ্রস্তুত আত্মাকে পৃথিবীর বিচারকর্ত্তার বিচারস্থানে দাঁড়াইতে হইল।
হায়! আমি যখন আপন বাটীহইতে সে দিবসে বাহির হইয়াছিলাম, তখন এমত ভয়ানক ও দুঃখজনক ঘটনা দেখিতে পাইব, তাহা আমি কিছুমাত্র বোধ করি নাই, ফলতঃ তদ্দ্বারা আমার মন অত্যন্ত শোকাকুল হইল।
রাণি ও তাহার শাশুড়ী মধুর মৃত দেহে পড়িয়া বাঙ্গালি স্ত্রীলোকদের যেমত রীতি আছে তদ্রূপ উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিয়া আপনারদের মস্তকে আঘাত করিতে লাগিল, এবং যে২ উত্তম গুণ বাস্তবিক মধুর কখন ছিল না, এমত গুণের বর্ণনা করত তাহার প্রসংশা করিতে লাগিল। ফুলমণি দাবাতে বসিয়া আঁচল দিয়া আপন মুখ আচ্ছাদন করিয়া কাঁদিতে ছিল। এমত সময়ে এক জন পুরুষ উঠানের মধ্যে উপস্থিত হইল; তাহার মস্তকে দুই একটি পক্ব কেশ দেখা গেল, এবং তাহার মুখ অতিশয় দয়াশীল বোধ হইল। পূর্ব্বে আমি তাহাকে দেখি নাই, তথাচ দেখিবা মাত্র তাহার প্রতি আমার মনে সম্ভ্রম জন্মিল। ঐ পুরুষ ফুলমণির নিকটে গিয়া তাহার সহিত মৃদুস্বরে কথা কহিতে লাগিল, এবং ইহাও দেখিলাম, সে আপন বস্ত্রদ্বারা তাহার চক্ষের জল মুচাইয়া ফেলিল। ইহাতে আমার বোধ হইল এ ব্যক্তি ফুলমণির স্বামী হইবে।
প্রতিবাসি লোকেরা গৃহের মধ্যে পরস্পর কথা কহিয়া বড় কোলাহল করিতেছিল, এই জন্যে সেই পুরুষ তাহাদিগকে শিষ্টরূপে বলিল, হে ভাই ভগিনীরা, এখন তোমরা এখানহইতে প্রস্থান করিলে ভাল হয়, কারণ তোমরা মধুকে আর কোন প্রকারে উপকার করিতে পারিবা না। এই কথা শুনিয়া লোকেরা বাহিরে যাইতে লাগিল।
তাহাদের যাওন কালে আমি নানা জনের নানা প্রকার কথা শুনিতে পাইলাম। এক জন বলিল, মধু কেবল মদ্যপানদ্বারা নষ্ট হইল; আর এক জন কহিল, এমত নয়, তাহার ব্যামোহ হইলে পর সে এক ভাঁড় দধি কিনিয়া খাইয়াছিল, তাহাতেই তাহার মৃত্যু হইল। পরে এক জন বুড়ি কহিল, তোরা কি জানিস্? কবিরাজ রোগ তো দমন করিয়াছিল, কিন্তু মেম সাহেব সেথায় থাকাতে ঝাড় ফোঁক কিছু করা গেল না, এই জন্যে ভূত তাহাকে চাপিয়া মারিল।
আমি এই সকল কথা শুনিয়া মনের মধ্যে ভাবিলাম, হায়২! এই লোকেরা কত অনর্থক চিন্তা করে। কিন্তু তাহাদের মৃত বন্ধুর মনস্তাপ শুনিয়াও পরলোকে তাহার কি গতি হইবে? এ বিষয়ে কেহই ভাবিত হইল না।
যে পুরুষ এমত সুশীলরূপে লোক সকলকে বিদায় করিয়াছিল, তাহার বিষয়ে শুনিলাম, সে ফুলমণির স্বামী বটে। কিছুকাল পরে সে মধুর দুই জন পিস্তুত ভাইকে লইয়া তাহার কবর দেওনার্থে সকল প্রস্তুত করিতে লাগিল। তখন আমি বিবেচনা করিয়া দেখিলাম, যে মধুর মায়ের টাকা কড়ির কোন অভাব নাই, অতএব আর কোনরূপে তাহাদের উপকার করিতে না পারিয়া, আমি পুনর্ব্বার আসিব, এই কথা বলিয়া বিদায় হইলাম।
আমি আপন গৃহে পৌঁছিয়া উক্ত ঘটনা সকল মনে আন্দোলন করত মৃত্যুর এবং পরলোকের বিষয়ে এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলাম; যথা, আমার সাক্ষাতে এক জন বলবান্ যুব পুরুষ যৌবনাবস্থায় প্রাণ ত্যাগ করিয়াছে, ফলতঃ সে পাপগ্রস্ত হইয়াও ঈশ্বরের নিকটে ক্ষমা না চাহিয়া পরলোকে গমন করিয়াছে; তাহাতে আমি ভাবিলাম, হায়! তাহার আত্মার সর্ব্বনাশ হইয়া থাকিবে।
কোন ব্যক্তির আত্মার সর্ব্বনাশ হওয়া কেমন ভয়ানক ও গুরুতর বিষয়, তাহা বলা অসাধ্য; কিন্তু ধিক২! মনুষ্যেরা ঈশ্বরের নিয়ম জানিয়াও মনে করে, যদ্যপি আমরা পাপ করি, তথাপি তিনি দয়ালু হইয়া পরলোকে আমাদিগকে অবশ্য ভাল স্থান দিবেন। পরমেশ্বর দয়ার সাগর বটেন, এই জন্যে তিনি আপনার পুত্ত্রকে রক্ষা না করিয়া আমাদের সকলের জন্যে তাঁহাকে প্রদান করিলেন; কিন্তু যে ব্যক্তি তাঁহার অসীম অনুগ্রহ তুচ্ছ করিয়া ইহকালে আপন মন্দাভিলাষ পূর্ণ করে, এমত ব্যক্তির প্রতি ঈশ্বর কোন প্রকারে পরকালে দয়া প্রকাশ করিবেন না। এই বিষয়ে তিনি আপনি স্পষ্টরূপে এই নিয়ম করিয়াছেন, যথা “পাপি লোকেরা ও ঈশ্বর বিস্মৃত সর্ব্ব দেশীয় লোকেরা নরকে নিক্ষিপ্ত হইবেক।” দায়ূদের ৯ গীত ১৭। আর “যে কেহ পুত্ত্রকে না মানে, সে পরমায়ুর দর্শন পায় না, কিন্তু ঈশ্বরের ক্রোধপাত্র হইয়া থাকে।” যোহন ৩।৩৬। পরমেশ্বর পাপকে ঘৃণা করেন, এই জন্যে মনুষ্যদের পাপহইতে উদ্ধার হইবার উপায় করিয়াছেন, কিন্তু যে মনুষ্য তাঁহার প্রেমিক নিমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করে, সেই তাঁহার ক্রোধের পাত্র হয়।
হায়! যে ব্যক্তি ঈশ্বরের এবং তাঁহার অভিষিক্ত পুত্ত্রের ক্রোধপাত্র হয়, সে পরকালে কেমন দুর্দশান্বিত হইবে; তথাচ খ্রীষ্টিয়ান নামধারী অনেক লোক আছে, যাহারা এই ভারি বিষয়ে কিছু মাত্র মনোযোগ করে না। সুস্থ লোকদের চিকিৎসা করার প্রয়োজন নাই, কিন্তু অসুস্থ লোকদের প্রয়োজন আছে; তথাপি সহস্র২ মনুষ্য পাপরোগগ্রস্ত হইয়াও আপনাদিগকে সুস্থ বোধ করে, এবং যে মহাচিকিৎসক তাহাদিগকে ঐ রোগহইতে মুক্ত করিতে পারেন, তাহারা তাহার নিকটে যাইতে অসম্মত হয়।
কোন২ লোক কেবল আলস্য প্রযুক্ত এমত করে। তাহারা বলে, আমরা পৃথিবীতে অনেক দিন বাঁচিব, অতএব সম্প্রতি মন ফিরাইবার আবশ্যক নাই। তাহারা ফীলিক্সের ন্যায় স্থির করে, আমরা অবকাশ পাইলে ধর্ম্মের বিষয়ে মনোযোগ করিব; কিন্তু অবকাশের সময় উপস্থিত হইবার পূর্ব্বে তাহাদের মৃত্যু উপস্থিত হয়। আহা! এই রূপ বিলম্ব করা কেমন নির্বোধের কর্ম্ম।
সাংসারিক বিষয়ে এমত অজ্ঞানতা কেহই প্রকাশ করে না। বৈশাখ মাস উপস্থিত হইলে, চাষারা ভূমিতে চাষ করে, ও বীজ বপন করে; এবং যে জন বীজ বপন না করিয়া ঐ শুভ সময় বহিয়া যাইতে দেয়, এমত নির্বোধ ব্যক্তি এই জগতের মধ্যে প্রায় দৃষ্ট হয় না। কিন্তু পরিত্রাণের দিবস যে বহিয়া যায়, তাহাতে মনুষ্যেরা কিছু মাত্র ভয় না করিয়া অমনোযোগ প্রযুক্ত আপন২ অমূল্য আত্মাকে নষ্ট করে।
আরও এমত কোন লোক আছে, যাহারা উক্ত মধুর ন্যায় ঈশ্বরের মঙ্গল সমাচার উত্তমরূপে জানীয়াও তাহা গ্রাহ্য করে না। পাপ যে বড় মন্দ ইহা তাহারা সুজ্ঞাত আছে, তথাপি তাহারা পাপ করে। তাহারা জানে যে খ্রীষ্টের নিকটে গেলে আমরা ক্ষমা পাইব, তথাপি তাহারা খ্রীষ্টের নিকটে যায় না। তাহাদের সম্মুখে নরক আছে, তাহার প্রতি তাহারা চক্ষুঃ মুদিয়া থাকে, এরূপে তাহারা শেষে আচম্বিতে আপনাদের সর্ব্বনাশ ঘটায়। যীশু খ্রীষ্টের মঙ্গল সম্বাদ তুচ্ছ করণাপেক্ষা আর ভারি দোষ নাই, কিন্তু হায়! কত জন এই রূপ পাপ প্রতিদিন করিয়া থাকে। “যে ব্যক্তি প্রভুর আজ্ঞা না জানিয়া প্রহারের যোগ্য কর্ম্ম করে, সে অল্প প্রহার পাইবে; কিন্তু যে দাস প্রভুর আজ্ঞা জ্ঞাত হইয়াও প্রস্তুত থাকে না, এবং তাঁহার আজ্ঞানুসারে কর্ম্ম করে না, সে অনেক প্রহার পাইবে। কেননা যাহাকে বাহুল্যরূপে দত্ত হইয়াছে, তাহার নিকটহইতে বাহুল্যরূপে লইতে হইবে।” লুক ১২।৪৭, ৪৮। আহা! যদি লোকেরা জ্ঞানবান্ হইয়া এই সকল কথা বুঝিত, ও আপনাদের শেষ দশা বিবেচনা করিত, তবে তাহাদের ইহকালে ও পরকালে পরম লাভ হইত।
চতুর্থ অধ্যায়
মধুর কবর দেওনের দুই দিবস পরে আমি আপন প্রতিজ্ঞানুসারে পুনর্ব্বার তাহার মাতার গৃহে উপস্থিতা হইলাম। এই বার আমি ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদদ্বারা ঐ দুর্ভাগ্য লোকেরদের কিঞ্চিৎ উপকার করিতে পারিয়া বড় সন্তুষ্টা হইলাম। বিশেষতঃ সেথায় গিয়া আমি দেখিতে পাইলাম, যে রাণি প্রসব বেদনায় অতিশয় ব্যাকুল হইতেছে। তাহার শাশুড়ী আমাকে দেখিয়া বলিল, বউ এক দিন এক রাত্রি পর্য্যন্ত এই রূপ অত্যন্ত যাতনা ভোগ করিতেছে, তথাপি যে খালাস হয় এমত কোন লক্ষণ দেখিতে পাই না।রাণির স্বামির মৃত্যুর সময়ে যে রূপ গোলমাল হইয়াছিল, এখনও স্ত্রীলোকেরা সেই রূপ গোলমাল পুনর্ব্বার করিতেছে; বিশেষতঃ দশ বারো জন মেয়্যা আসিয়া রাণির চারিদিগে দাঁড়াইতেছিল। যদি এক জন কথা কহে, তবে অন্য জন আর একটা কথা কহে; এক জন তাহাকে বসিয়া থাকিতে কহে, আর এক জন বলে, না না, তুমি হাঁটিয়া বেড়াও; এবং তৃতীয় জন কোন অজ্ঞান বুড়ির ঔষধ আনিয়া তাহাকে খাওইয়া দেয়। এই সকল বৃথা উপায়দ্বারা ছেল্যা শীঘ্র না জন্মিয়া বরং অনেক বিলম্ব হইতে লাগিল, তাহাতে রাণির যন্ত্রণা অতিশয় বৃদ্ধি হইল।
এতদ্ব্যতিরেকে আমি আর এক বিষয়ে বড় দুঃখিতা হইলাম, অর্থাৎ যদ্যপি এই সকল লোকেরা নামে খ্রীষ্টিয়ান তথাপি ইহাদের মধ্যে এক অমূলক ধর্ম্ম দেখিতে পাইলাম। অমূলক ধর্ম্ম ইহাকে বলা যায়, যথা; কোন কর্ম্ম করিবার সময়ে যদি কেহ হাঁচে, তবে লোকেরা সে কর্ম্মে প্রবর্ত্ত হয় না; যদি যাত্রা কালীন টিক্টিকীর রব শুনিতে পায়, তবে সে দিবস যাত্রা করে না; প্রত্যূষে উঠিয়া বানরের মুখ দেখে না, ও তাহার নাম উচ্চারণ করে না; চন্দ্রগ্রহণ কালীন কোন দ্রব্যাদি কাটে না; রোগ হইলে গলায় একটি মন্ত্রযুক্ত মাদুলি বাঁধে, ইত্যাদি। এইরূপ অনর্থক ব্যবহার কেবল মধুর পরিবারের মধ্যে দেখিলাম তাহা নহে, অনেক খ্রীষ্টিয়ানদের মধ্যে এই প্রকার ব্যবহার চলিত আছে। হে ধর্ম্মাত্মা! এমত অজ্ঞান লোকদের মনের চক্ষুঃ প্রসন্ন কর, যেন তাহারা উক্ত অমূলক ও হাস্যজনক আদেশ সকলকে শয়তানের বিধি বোধ করিয়া একেবারে ত্যাগ করে।
রাণি দুই তিন মাস পূর্ব্বে আপন শাশুড়ীর সাক্ষাতে এমত কথা বলিয়াছিল, যে গত রাত্রিতে একটা পেচা কিম্বা তূতল পক্ষী ডাকিতে২ আমার মাথার উপর দিয়া উড়িয়া গেল। এই কথা এখন তাহার শাশুড়ীর মনে পড়াতে সে বলিতে লাগিল, যদি এমত হয়, তবে সে পক্ষী ফিরিয়া না আইলে পোয়াতি প্রসব হইতে পারিবে না। এ কথাতে অন্য সকল স্ত্রীলোকেরা স্বীকার করিল, কেবল এক জন বুড়ি ইহাতে সম্মতা না হইয়া বলিল, আমার বোধ হয় পেচাতে কোন ক্ষতি হয় না, কেননা এক বার আমি পাঁচ সাত জন স্ত্রীলোকের সহিত উঠানে বসিয়াছিলাম, এমত সময়ে একটা পেচা আমাদের মাথার উপর দিয়া উড়িয়া গেল; তখন আমার ছোট ভগিনীর প্রায় নয় মাস গর্ভ ছিল, এই জন্যে তাহার নিমিত্তে আমরা সকলে বড় ভাবিতা হইয়াছিলাম, কিন্তু তাহার কোন প্রকার ক্ষতি না হইয়া অল্পদিন পরে সে এক ঘণ্টা মাত্র দুঃখ পাইয়া এক পুত্ত্র সন্তান প্রসব করিল।
ইহা শুনিয়া আর এক জন স্ত্রীলোক বলিল, ও কথা আমি কখন বিশ্বাস করিব না। সকল লোকেরা জানে যে ঐ পক্ষী ফিরিয়া না আইলে পোয়াতি প্রসব হয় না; হয় তো সে ফিরিয়া আসিয়াছিল, কিন্তু তোমরা তাহাতে মনোযোগ করিলা না।
প্রথম বক্তা উত্তর করিল, না গো, না, কখন ফিরিয়া আইসে নাই; আমাদের কি চক্ষু ছিল না? এবং দিনের বেলা দুই প্রহরের সময়ে ছেল্যা হইল, তখন কি পেচা থাকে? কিন্তু রাণির কি হইয়াছে, তাহা আমি সুন্দর রূপে বলিতে পারি। অল্প দিন হইল সে পলাইয়া কালীপুরের কোন বুড়ির ঘরে ছিল, ঐ বুড়ি কোন মন্ত্রদ্বারা তাহাকে নিদ্রিতা করাইয়া তাহার গহনা সকল খুলিয়া লইয়াছিল; তাহার মন্ত্র না থাকিলে রাণি অবশ্য জাগিয়া উঠিত। অতএব আমার বোধ হয় সে ব্যক্তি ডাইনী, এবং রাণি যেন প্রসব হইতে না পারে, এই জন্যে সে তাহার প্রতি কোন কিছু করিয়া থাকিবে। পূর্ব্ব কথাহইতে এ কথা আশ্চর্য্য হওয়াতে সকল স্ত্রীলোকেরা একত্র হইয়া বলিতে লাগিল, হাঁ২, ইহা হইয়া থাকিবে বটে।
মধুর মাতা বার২ বলিতেছিল, হায়! আমার পুত্ত্রের ছেল্যাকে আমি কখন্ কোলে করিব? কিন্তু তাহার বউর কি গতি হয়, তাহাতে সে কিছু মাত্র ভাবিতা হইল না; শেষে প্রতিবাসিদের কথাদ্বারা সে বোধ করিল, যদ্যপি আমি বউর তত্ত্ব না করি, তবে ছেল্যা শুদ্ধ নষ্ট হইবে। এই জন্যে সে ডাইনীর বিষয় শুনিয়া কহিল, তবে আমি এক জন মানুষকে কালীপুরে পাঠাইয়া দিই, সে ঐ বুড়ির পায়ে পড়িয়া প্রার্থনা করুক, যেন আমার বউর গর্ভের বন্ধন মুক্ত করিয়া দেয়।
এই কথাতে রাণি কাতর হইয়া আমার প্রতি ফিরিয়া বলিল, ও মেম সাহেব, আপনি কি আমার এ বিষয়ের কোন ঔষধ জানেন না? কালীপুর এখানহইতে দুই দিবসের পথ; অতএব সেথাহইতে মানুষ ফিরিয়া না আসিতে২ আমি মারা পড়িব। ও মেম সাহেব, আপনি অনুগ্রহ করিয়া ইহাদিগকে বলুন, যেন ইহারা আমাকে আর জলপড়া ও তৈলপড়া না দেয়, কারণ তাহাতে আমার বমি হইতেছে, আর খাইতে পারিব না। এ কথা শুনিয়া এক জন স্ত্রীলোক বলিল, না গো, তোমাকে আর পড়াতৈলাদি দেওয়া যাইবে না, কেননা দেখিলাম তাহাতে কোন উপকার হইল না।
তখন আমি কহিলাম, এমত অনর্থক উপায়দ্বারা কাহারো কি কখন উপকার হইয়া থাকে? ইহা না করিয়া রাণিকে যদি কিছু খাইতে দেও, তবে বোধ করি ভাল হইতে পারে। এই কথাতে তাহার শাশুড়ী উত্তর করিল, ভাল২! তাহার খাওয়ার বিষয় পশ্চাৎ হইবে, প্রথমে আমাকে ছেল্যা দিউক। বুড়ির এমত বাক্য শুনিয়া আমি বড় রাগান্বিতা হইয়া বলিলাম, তুমি অতিশয় দুষ্টা ও নির্বোধ স্ত্রী, তোমার বউর মুখের প্রতি চাহিয়া দেখ, সে এখনি মূর্চ্ছা যাইবে, তাহা হইলে তুমি কোথাহইতে ছেল্যা পাইবা?
পরে আমি প্রতিবাসিদের প্রতি ফিরিয়া বলিলাম, তোমাদের মধ্যে যদি কেহ একটু মাছের ঝোল আনিয়া দিতে পার, তবে বড় উপকার হয়। এই কথাতে একটি যুবতী স্ত্রী ঝোল আনিতে আপন গৃহে দৌড়িয়া গেল; কিন্তু সকল বুড়িরা মাথা লাড়িয়া বলিতে লাগিল, এই প্রকার রীতি ইংরাজ বিবিদের পক্ষে ভাল হইতে পারে, কিন্তু বাঙ্গালিদের নিমিত্তে বাঙ্গালিদের রীতি ভাল। পোয়াতিকে ঝোল্টোল খাওয়াইলে সে অবশ্য মারা পড়িবে।
এমত সময়ে ঐ যুবতী স্ত্রীলোক ঝোল লইয়া ফিরিয়া আইল, তাহাতে আমি সে ঝোলের বাটি ধরিয়া রাণিকে পান করিতে দিলাম। রাণি ব্যগ্রতাপূর্ব্বক তাহা সকল খাইয়া বলিল, মেম সাহেব, ইহাতে আমার বিস্তর শক্তি হইল; এখন যদি উহারা কেবল আমাকে শুইতে দেয়, তবে বোধ করি আমি ভালরূপে ব্যথা খাইতে পারিব।
ঐ নির্বোধ স্ত্রীলোকেরা তাহাকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত হাঁটু গাড়িয়া রাখিয়াছিল, তাহাতে সে সুতরাং শ্রান্তা হইয়া একেবারে বলহীনা হইয়াছিল; ইহা দেখিয়া আমি ধাইকে বলিলাম, ওগো, ইহাকে কিঞ্চিৎ কাল শুইতে দিলে কি ক্ষতি আছে? বিলাতে তো সকল স্ত্রীলোকেরা শুইয়া প্রসব হয়। এই কথাতে ধাই কিছু অসন্তুষ্টা হইয়া বলিল, বিলাতীয় বিবিদের এবং বাঙ্গালি স্ত্রীলোকদের মধ্যে অনেক বিশেষ আছে; আপনি যদি ইংরাজি ধারামতে ইহাকে প্রসব করাইতে আসিয়াছেন, তবে তাহাই করুন; আমি তাহার ভাল মন্দ কিছুই জানি না। আমি উত্তর করিলাম, তাহাই হউক। এমত সময়ে কি করা কর্ত্তব্য, এ বিষয়ে আমি সুন্দররূপে সুশিক্ষিতা আছি, অতএব ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ দ্বারা ইহার কোন ক্ষতি হইবে না।
এই কথা বলিয়া আমি রাণিকে বাম পার্শ্বে শোয়াইয়া এক ঘণ্টার মধ্যে তিন চারি বার তাহাকে কিছু তপ্ত দুগ্ধ পান করিতে দিলাম। পরে দেখিলাম যে ধাই তাহার গর্ভের উপরে এক খানা কাপড় অতিশয় শক্তরপে বাঁধিয়া রাখিয়াছিল, ইহা দেখিবা মাত্র আমি সে বন্ধন খুলিয়া দিলাম, তাহাতে সকল স্ত্রীলোকেরা আমাকে বলিতে লাগিল, এমত করিলে ছেল্যা পুনর্ব্বার উপরে সরিয়া যাইবে। কিন্তু রাণি কহিল, না না, মেম সাহেব এ বিষয় ভাল জানেন, তিনি আপন ইচ্ছামত করুন।
এই রূপে কিছুকাল যাপন হইলে সকলেই জানিতে পারিল রাণির প্রসবের সময় নিকট হইয়াছে; তাহাতে ধাই কিঞ্চিৎ প্রশংসা পাইবার আশা করিয়া বলিল, ও মেম সাহেব, আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন, তবে আমি এই দণ্ডে পোয়াতিকে খালাস করিয়া দিতে পারি। কিন্তু আমি বলিলাম, না না, তুমি তিন বার এইরূপ ঘাঁটিয়া রাণিকে কেবল অধিক যন্ত্রণা দিয়াছ; থাকিতে দেও, ঈশ্বর আপনি ইহাকে উদ্ধার করিবেন। আমি ইহা বলিবা মাত্র রাণির একটি জীবৎ কন্যা জন্মিল, তাহাতে আমার বড় আশ্চর্য্য বোধ হইল, কারণ সকল স্ত্রীলোকেরা মিলিয়া রাণির যে রূপ অবস্থা করিয়াছিল, তাহা দেখিয়া আমি অনুমান করিয়াছিলাম, যে অবশ্য তাহার মৃত সন্তান জন্মিবে। বাঙ্গালি স্ত্রীলোকদের ছেল্যারা অনেকবার ধাইদের অজ্ঞানতা প্রযুক্ত গর্ভে নষ্ট হয়, তাহা আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি। কিন্তু সে যাহা হউক, ঈশ্বর রাণির প্রতি প্রসন্ন হইয়া তাহাকে জীবৎ সন্ততি দান করিলেন।
রাণি প্রসব হইলে পর সকলে আমাকে অতিশয় প্রশংসা করত আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিল, এবং রাণির শাশুড়ী আপন পুত্ত্রের ছোট কন্যাকে ক্রোড়ে করিয়া তাহার পিতাকে স্মরণ করত ক্রন্দন করিতে লাগিল। তথাচ সেও আমাকে বলিল, ও মেম সাহেব, আপনি আমাদের মা বাপ, আপনি আমাদের রক্ষাকর্ত্তা। কিন্তু আমি তাহাকে বলিলাম, এমত নয়, ঈশ্বর মহৎ অনুগ্রহ করিয়া তোমার বউকে যাতনাহইতে উদ্ধার করিয়া এই সন্ততি দান করিলেন, অতএব তাঁহারই নামের ধন্যবাদ কর।
পরে আমি মনের মধ্যে ভাবিলাম, অনেক স্ত্রীলোক এখানে উপস্থিতা আছে, যদি ইহাদের সাক্ষাতে উক্ত অমূলক ধর্ম্মের অর্থাৎ কুলক্ষণ ও সুলক্ষণ মান্য করণের বিষয়ে এখন কিছু উপদেশ দিই, তবে ভাল হইতে পারিবে; কারণ এই সকল ভ্রান্তিমূলক নির্বোধ কথা বিশেষরূপে স্ত্রীলোকদের মধ্যে চলিত আছে। তাহাতে আমি তাহাদিগকে বিনয়পূর্ব্বক বলিলাম; দেখ, তোমরা খ্রীষ্টিয়ান ধর্ম্ম গ্রহণ করিয়াছ, অতএব দেবপূজকেরা যাহা মান্য করে, তাহা তোমাদিগের মান্য করা কর্ত্তব্য নহে। বিশেষতঃ, এই সকল কুলক্ষণ ও সুলক্ষণাদি মান্য করাতে ঈশ্বরের অপমান হয়। তোমরা যদি স্বীকার কর, যে পরমেশ্বর সর্ব্বশক্তিমান্, ও তাঁহার হস্তে আমাদের প্রাণ আছে, তাহাতে তাঁহার অনুমতি ব্যতিরেকে কেহই নষ্ট হইতে পারে না; তবে একটি সামান্য পক্ষী গর্ভবতি স্ত্রীর মাথার উপর দিয়া উড়িয়া গেলে, তাহাতে তোমাদের এত ভয় জন্মে কেন? তোমরা বলিলা, পেচা ইহার উপর দিয়া উড়িয়া গিয়াছে, এই জন্যে পোয়াতি প্রসব হইতে না পারিয়া প্রসূতি ও ছেল্যা দুই জনেই মারা পড়িবে। তবে পেচা তোমাদের ঈশ্বর হইল, যেহেতু সে এক দিগে উড়িয়া গেলে মানুষের প্রাণ নষ্ট করে, এবং পুনর্ব্বার ফিরিয়া আইলে প্রাণ রক্ষাও করিতে পারে। আর তোমাদের মধ্যে কেহ২ বলিল, পোয়াতি কালীপুরের ডাইনীদ্বারা মারা পড়িবে। হায়২! পরমেশ্বর কি ঐ দুষ্টা ব্যক্তির হস্তে আপন প্রজাদের প্রাণ সমর্পণ করিয়াছেন? এমত কুচিন্তা দূরে থাকুক। পরমেশ্বর জাজ্বল্যমান ঈশ্বর, অতএব যে ব্যক্তি বলে ভূত কি প্রেত কি মনুষ্য কি পশু কি পক্ষী পরমেশ্বরের গৌরব ও পরাক্রম ও গুণবিশিষ্ট হয়, সেই ব্যক্তির ভারি শাস্তি হইবে। ঈশ্বর বিশেষরূপে খ্রীষ্টাশ্রিত লোকদের পিতা হন, অতএব যেমন সন্তানের কোন দুঃখ উপস্থিত হইলে সে যদি আপন দয়ালু পিতার নিকটে দুঃখ না জানাইয়া পরের নিকটে রক্ষা যাচ্ঞা করে, তবে পিতার অপমান ও দুঃখ অবশ্য জন্মিতে পারে, তেমনি তোমরা পরমেশ্বরকে সর্ব্বাপেক্ষা উত্তম পিতা জানিয়া তাঁহাকে ত্যাগ করিয়া যদি কোন সৃষ্ট বস্তুকে ভয় কিম্বা মান্য কর, তবে তোমাদের প্রতি ঈশ্বরের ক্রোধ প্রজ্বলিত হইবে, ইহাতে সন্দেহ নাই। আরও একটি কথা বলিতে হয়, যাহারা এই সকল লক্ষণাদি মানে তাহারা সহস্র২ বার ভ্রান্তিতে পতিত হয়। দেখ, অদ্য এই বিষয়ে তোমরা দুইটি প্রমাণ পাইলা। তোমাদের এক জন প্রতিবাসিনী বলিল, যে আমার ভগিনীর উপর দিয়া পেচা উড়িয়া গেলেও তাহার সন্তান স্বচ্ছন্দে জন্মিল। তদ্রূপ রাণিও মন্ত্রাদি ব্যতিরেকে খালাস হইয়াছে। ফলতঃ আমি আপনার বিষয়ে তোমাদের সাক্ষাতে একটি প্রমাণ দিতে পারি। আমি যখন প্রথমে গর্ভবতী হইয়াছিলাম, তখন অতিশয় গ্রীষ্মকাল, এ প্রযুক্ত রাত্রে প্রায় নিদ্রা যাইতে পারিতাম না, অতএব আমি খড়খড়িয়ার নিকটে একখান খাট পাতিয়া তাহার উপরে শয়ন করিতাম, তথাপি প্রায় সমস্ত রাত্রি জাগিয়া থাকিতাম। এমন সময়ে প্রত্যেক রাত্রিতে একটা পেচা আসিয়া খড়খড়িয়ার উপরে বসিত, তাহাতে যদি খড়খড়িয়া বদ্ধ থাকিত, তবে যত ক্ষণ পর্য্যন্ত আমি তাহা খুলিয়া না দিতাম তত ক্ষণ ঐ পক্ষী বাহিরে ছট্ফট্ করিত। কিন্তু এই রূপ হইলেও আমার কিম্বা আমার সন্ততির প্রতি কোন প্রকারে আপদ ঘটিল না। এই কথা যে সম্পূর্ণ রূপে সত্য, ইহা আমি সাহসপূর্ব্বক বলিতে পারি। অতএব যাহারা এই সকল জানিয়াও পেচাকে কিম্বা অন্য কোন কুলক্ষণকে ভয় করে, তাহারা অতিশয় নির্বোধ ও অজ্ঞান হয়। এই জন্যে আমি তোমাদিগকে বিনতি করিয়া বলি, তোমরা এমত নির্বোধ না হইয়া এই সকল ভ্রান্তি ত্যাগ করিয়া কেবল পরমেশ্বরের প্রতি ভয় ও বিশ্বাস রাখ।
আমি স্ত্রীলোকদিগকে এই রূপ উপদেশ দিয়া বিদায় হইলাম, কিন্তু যাইবার পূর্ব্বে ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলাম, সাবধান! আমি যেন পুনর্ব্বার এই স্থানে আইলে প্রসব গৃহে লোহা কিম্বা জুতা কিম্বা ঝাঁটা ইত্যাদি টাঙ্গান না দেখিতে পাই। আর ভূতের ভয় ত্যাগ করিয়া রাণিকে ও তাহার মেয়্যাটিকে অতিশয় যত্নপূর্ব্বক রাখিবা।
পরে আমি বাটী যাইবার সময়ে একটি ক্ষুদ্র পরিপাটি খড়ুয়া ঘরের নিকট দিয়া যাইতে২ স্পষ্টরূপে শুনিতে পাইলাম, যে এক জন ছেল্যা ধর্ম্মপুস্তকের মধ্যে যোহনের ছয় অধ্যায় পড়িতেছে। আমি ঈশ্বরের বাক্য সর্ব্বদা প্রিয় জ্ঞান করি, বিশেষতঃ ঐ ছোট ছেল্যার মৃদু রব আমার কর্ণে তখন এমত মিষ্ট বোধ হইল, যে আমি তৎক্ষণাৎ ঘরের দ্বার কিঞ্চিৎ খুলিয়া জিজ্ঞাসিলাম, ও গো, আমি কি ভিতরে যাইতে পারি? কোন ব্যক্তি ভিতরহইতে উত্তর করিল, আসুন! তাহাতে আমি গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া এক জন অতিবৃদ্ধা স্ত্রীলোককে দেখিলাম; তাহার চুল নিতান্ত পাকা, এবং তাহাকে বড় দুর্বল বোধ হইল। সে আমাকে দেখিবা মাত্র উঠিয়া দাঁড়াইল, পরে সেলাম করিয়া বলিল, মেম সাহেব, আমার নিকটে কি আপনকার কোন প্রয়োজন আছে?
আমি উত্তর করিলাম, না, এমত কোন প্রয়োজন নাই; কিন্তু বাহিরহইতে ধর্ম্মপুস্তকের কথা শুনিয়া আমি বোধ করিলাম, যদ্যপি এই গৃহে প্রবেশ করি তবে ঈশ্বর ভয়কারী কোন লোকদের সাক্ষাৎ পাইব, এবং আমার প্রিয়তম ত্রাণকর্ত্তার বিষয়ে অবশ্য কিছু কথোপকথন করিতে পারিব।
ইহা শুনিয়া ঐ বৃদ্ধা স্ত্রী কহিল, যদি এমত হয় তবে মেম সাহেব আপনি বসুন; কেননা ধর্ম্মপুস্তকে লেখা আছে, “আতিথ্য ব্যবহারেতে কেহ২ না জানিয়া দিব্য দূতগণকেও অতিথি করিয়াছে।” ইব্রীয় ১৩।৩।
এই দিনহীনা বাঙ্গালি স্ত্রীলোকের মুখে এরূপ উত্তম সভ্যতার কথা শুনিয়া আমি মনের মধ্যে ভাবিলাম, এমত শিষ্টাচার নিতান্তই খ্রীষ্টধর্ম্মের ফল; কেননা সে ধর্ম্মের এমত এক গুণ আছে, যে তদ্দ্বারা যে কোন দেশে হউক যাহারা তাহা সত্যরূপে অবলম্বন করে, তাহারা পূর্ব্বে অসভ্য ও অজ্ঞান হইলেও তৎপরে প্রেমী ও দয়ালু ও সদ্ভাবী হইয়া উঠে।
আমি গৃহে প্রবেশ করিবামাত্র উক্ত ছোট পাঠক ধর্ম্মপুস্তক রাখিয়া শীঘ্র পলায়ন করিল, তাহাতে আমি প্রথমে তাহাকে চিনিতে পারিলাম না বটে; কিন্তু সে যখন একখানি চৌকি হাতে করিয়া ফিরিয়া আইল, তখন দেখিলাম যে সে ফুলমণির কন্যা সত্যবতী। বুড়ির গৃহে চৌকি নাই, ইহা জানিয়া সে দৌড়িয়া আমার নিমিত্তে আপন বাটীহইতে পূর্ব্বোক্ত পুরাতন চৌকি আনিল।
তাহাতে আমি তাহাকে বলিলাম, সত্যবতি, তুমি যে এই বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের নিকটে ধর্ম্মপুস্তক পাঠ কর, সে বড় ভাল কর্ম্ম, আমি তাহাতে বড় সন্তুষ্টা আছি। কিন্তু সত্যবতী এই প্রশংসা শুনিয়াও কিছু মাত্র অহংকার না করিয়া কহিল, মেম সাহেব, প্যারী দিদি চক্ষে আর ভাল দেখিতে পায় না, এই জন্যে আমি কখন২ ইহার নিকটে ধর্ম্মপুস্তক পড়ি। খেলা অপেক্ষা আমি পড়া বড় ভাল বাসি।
তখন প্যারী কহিল, হাঁ মেম সাহেব, সত্যবতী বড় ভাল মেয়্যা; এ আমার অনেক কর্ম্ম করিয়া দেয়, এই সকলের জন্যে ঈশ্বর ইহাকে অবশ্য পুরস্কার দিবেন। মেম সাহেব, ইহার মাতা ইলীশেবার ন্যায় নির্দোষকাপে পরমেশ্বরের সমস্ত আজ্ঞা ও বিধি পালন করিয়া ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ধার্ম্মিকা আছে। সে আপন মেয়্যাকে এই সুশিক্ষা দিয়াছে, যে জন দরিদ্রের নিমিত্তে ভাবনা করে সেই ধন্য।
ধর্ম্মপুস্তকের বাক্যের বিষয়ে এই বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের জ্ঞান দেখিয়া আমি চমৎকৃতা হইলাম; কিন্তু পশ্চাৎ তাহার সহিত বার২ আলাপ করিয়া জানিতে পারিলাম, যে প্যারী সেই বাক্য আপন আহার স্বরূপ জ্ঞান করিয়া দিবা রাত্রি কেবল সে সকল বিষয় চিন্তা করিত।
হায়২! এতদ্দেশীয় খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকদের মধ্যে অনেকেই ধর্ম্মপুস্তক না পড়িয়া অবহেলা করে; এ বড় দুঃখের বিষয় বটে। তাহারা যদি ধর্ম্মশাস্ত্রের মনোরঞ্জক ইতিহাস পড়িত, তবে তাহাদের বিস্তর আমোদ ও ধর্ম্মজ্ঞান জন্মিত; এবং তাহারা যদি ঐ সকল ইতিহাস ভাল রূপে জানিত, তবে আপন সন্তানদিগকে ভূত ও রাক্ষসাদির বিষয়ে অনর্থক গল্প না বলিয়া ঐ সুন্দর হিতজনক বিবরণ বর্ণনা করিতে পারিত। আর তাহারা দায়ূদের গীত ও ভবিষ্যদ্বক্তৃগণের লিপিদ্বারা দুঃখের সময়েও সান্ত্বনা প্রাপ্তা হইত; বিশেষতঃ যীশু খ্রীষ্ট্রের চরিত্র ও প্রেরিতদের পত্র পড়িয়া অতি হিতজনক নিদর্শন ও শিক্ষা পাইত।
অতঃপর প্যারী আমাকে বলিল, মেম সাহেব, আপনি যখন গৃহে আসিয়া উপস্থিতা হইয়াছিলেন, তখন আমরা ধর্ম্মপুস্তকের যে পদটি পড়িতেছিলাম, তাহা ভালরূপে বুঝিতে পারি নাই; অতএব আপনি যদি অনুগ্রহ করিয়া তাহা আমাকে বুঝাইয়া দেন, তবে আমার বড় উপকার হয়। সে বাক্য এই, যথা “যে ব্যক্তি আমার মাংস ভোজন করে এবং আমার রক্ত পান করে, সে আমাতে বাস করে, এবং আমিও তাহাতে বাস করি।” যোহন ৬।৫৬। দেখ, মেম সাহেব, যিহুদীয়েরা যেমন বচসা করিয়া বলিল, এ ব্যক্তি ভোজনের জন্যে আপন মাংস আমাদিগকে কেমন করিয়া দিবে? আমি তেমনি বলি না; কেননা আমি জানি যে যীশু এ কথাই দৃষ্টান্তভাবে বলিলেন; তথাচ তাহার যথার্থ অর্থ কি, তাহা আমি ভালরূপে বুঝিতে পারি নাই।
এই কথা শুনিয়া আমি মনের মধ্যে ঈশ্বরের নিকটে এই প্রার্থনা করিলাম, হে ঈশ্বর! উক্ত বাক্য সাংসারিক ব্যক্তির বোধগম্য নয়, কিন্তু তোমার বৃদ্ধ দাসীকে যেন তাহা স্পষ্টরূপে বুঝাইয়া দিতে পারি, এমত জ্ঞান ও শক্তি আমাকে প্রদান কর। তাহার পর আমি বুড়িকে বলিলাম, দেখ, আত্মার মধ্যে যদি ধর্ম্মকে বাঁচাইয়া রাখিতে চাহি, তবে তাহাকে আহার দিতে হইবে, এবং যে আত্মার পুনর্জন্ম হইয়াছে, তাহার কেবল এক আহার মাত্র আছে, সেই আহার যীশু খ্রীষ্ট। ঈশ্বরের সন্তানদের এই রূপ খাদ্য না হইলেই নয়, তাহা পাইতে তাহাদের লালসা আছে, এবং যদি তাহারা তাহা খাইতে না পায়, তবে দুর্বল ও দুঃখিত হইয়া নিরাশ হয়। কিন্তু এমত দুর্ঘটনাহইতে উত্তীর্ণ হইবার নিমিত্তে যীশুর নিকটে গিয়া বিশ্বাসদ্বারা তাঁহাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা আবশ্যক। আত্মা শরীরের মত নয়, ফলতঃ শরীর মুখদন্তাদিদ্বারা ভোজন করে, কিন্তু আত্মা প্রার্থনা ও নম্রতা ও ধ্যান ও বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতা এবং প্রেমদ্বারা খ্রীষ্টকে গ্রহণ করিয়া তৃপ্ত হয়। যদি কোন মনুষ্য আসিয়া আমাদিগকে বলে, অমুক স্থানে অদ্য বড় একটি ভোজ প্রস্তুত হইয়াছে, এবং আমরা যদি গিয়া সেই ভোজ আহার না করিয়া কেবল তাহার প্রতি দৃষ্টি করি, তবে আমরা তাহাতে কোন রূপে তৃপ্ত হইব না। খাদ্য দ্রব্য ভোজন না করিলে ও তাহা পরিপাক না হইলে, তদ্দ্বারা শরীরের কিছু মাত্র পুষ্টি হয় না; সেই মত খ্রীষ্টকে ভক্তিপূর্ব্বক অন্তঃকরণের মধ্যে গ্রহণ এবং বিশ্বাসদ্বারা তাঁহার মাংস ও রক্তকে নিত্য২ ভোজন ও পান না করিলে আমাদের আত্মা ধর্মে বৃদ্ধি পাইতে কিম্বা স্থির থাকিতে পারে না।
এই সকল কথা শুনিয়া প্যারী বলিল, মেম সাহেব, এখন আমি যীশু খ্রীষ্টের ঐ বাক্যের অর্থ ভালরূপে বুঝিতে পারিয়াছি, এবং তদ্দ্বারা আমার মন বড় আহ্লাদিত হইতেছে; কারণ আমি নিশ্চয় জানিলাম, যে আমি কেবল বুদ্ধির সহিত খ্রীষ্টের উপর বিশ্বাস করিয়াছি তাহা নয়, কিন্তু তাঁহাকে অন্তঃকরণের মধ্যে গ্রহণ করিয়া তাঁহার বাক্যদ্বারা নিত্য২ প্রতিপালিত হইতেছি। প্যারী আরও বলিল, ও মেম সাহেব, আমি কখন২ সমস্ত দিন এই ক্ষুদ্র গৃহে একা বসিয়া থাকি; সে সময়ে আমার প্রিয় ত্রাণকর্ত্তা যদি আমার নিকটে না থাকিতেন, তবে আমার কেমন ভারি দুঃখ হইত। কিন্তু তিনি আমাকে কখন ত্যাগ করেন না, বরং আমি সর্ব্বদা তাঁহার সহিত আলাপ করিতে পারি; এই জন্যে সুদশা বা দুর্দশা হউক, আমি নিরন্তর মনের সুখ ও সান্ত্বনা ভোগ করি।
ইহা শুনিয়া আমি বলিলাম, প্যারি, যদি এমত হয়, তবে আমি অনেকবার তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিব, কারণ আমি নিশ্চয় জ্ঞাত হইলাম, যে খ্রীষ্টেতে আমরা দুই জনে ভগিনী স্বরূপ হইয়াছি, এবং দুই জনে মৃত্যুর পরে এক স্বর্গের অধিকারিণী হইব। পরে আমি তাহাকে জিজ্ঞাসিলাম, হে প্যারি, তোমার কি কোন কুটম্বাদি নাই? বোধ হয়, দরিদ্রতা প্রযুক্ত তুমি বড় ক্লেশ পাইয়া থাক।
তাহাতে সে উত্তর করিল, না মেম সাহেব, এমত নয়। আমার আত্মীয় কুটম্ব কেহ নাই বটে, কিন্তু কলিকাতায় এক জন সাহেব আছেন, তিনি আমাকে এই ক্ষুদ্র গৃহখানি বাঁধিয়া দিয়াছেন, এবং প্রতিমাসে তিন টাকা করিয়া পাঠাইয়া দেন। আমি তাহাকে শিশু কালে দুগ্ধ পান করাইয়াছিলাম। আমার নিজ গ্রাম এখানহইতে অনেক দূর, কিন্তু এই স্থানে কি রূপে আইলাম তাহা আপনি শুনুন।
এখন প্রায় বাওয়ান্ন বৎসর হইল আমি আপন দেশহইতে আসিয়া কলিকাতায় এক ইংরাজের বাটীতে ধাইর কর্ম্ম করিতে লাগিলাম। সে পরিবারের মধ্যে এক জন বড় ধার্ম্মিকা মিস বাবা ছিলেন। তিনি আমাকে খ্রীষ্ট ধর্ম্মের বিষয়ে অনেক সুশিক্ষা দিতেন, তাহাতে আমি ক্রমে২ বোধ করিলাম যে খ্রীষ্ট ধর্ম্ম সত্য বটে; তথাচ হিন্দু লোকদের সাক্ষাতে ইহা স্বীকার করিতে এবং জাতি ত্যাগ করিতে আমার বড় লজ্জা হইল। যে শিশু বাবাকে আমি দুগ্ধ দিতাম, সে দেড় বৎসরের হইলে আমার মেম সাহেব আমাকে বলিলেন, ও ধাই, আমার পুত্ত্র বড় হইয়াছে, অতএব আগত মাসে আমি তোমাকে বিদায় করিব।
আমাকে যাইতে হইবে, ইহা শুনিয়া আমি বড় দুখিতা হইলাম, কারণ আমার জনি বাবাকে আমি অতিশয় প্রেম করিতাম। সেই সময় অবধি আমি সমস্ত দিন তাহার নিকটে থাকিয়া তাহাকে নানা প্রকার খেলা করাইতাম ও ছবি দেখাইতাম, তাহাতে সে পূর্ব্বাপেক্ষাও আমার প্রিয় হইল। আর আমি ভাবিতে লাগিলাম, গৃহে গেলে আমাকে পুনর্ব্বার প্রতিমাপূজা করিতে হইবে; কিন্তু প্রতিমাপূজা নিতান্ত অনর্থক তাহা আমি জানিতে পারিয়াছিলাম, অতএব আমার ভয় হইল তাহা করিলে কি জানি ঈশ্বর আমাকে একেবারে নষ্ট করিবেন। এই সকল মনের মধ্যে বিচার করিয়া আমার বড় ভাবনা জন্মিতে লাগিল।
এমত সময়ে, এক দিবস আমার শিশুবাবার উলাউঠা রোগ হইল, তাহাতে তাহাকে অনেক প্রকার ঔষধাদি দেওয়া গেল, তথাপি রোগের প্রতিকার হইল না, এবং সন্ধ্যাকালে ডাক্তর সাহেব বলিলেন, ছেল্যার বাঁচিবার কিছু মাত্র ভরসা নাই। ও মেম সাহেব, এই কথা শুনিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ প্রায় হইল। সে সময়ে আমি হিন্দু দেবতাগণের নাম উচ্চারণ না করিয়া কেবল খ্রীষ্টিয়ানদের ঈশ্বরের নিকটে উচ্চৈঃস্বরে প্রার্থনা করিলাম, যেন তিনি আমার প্রিয়তম বাবাকে রক্ষা করেন।
পূর্ব্বোক্ত মিসি বাবা ইহা শুনিয়া আমাকে বলিলেন, ধাই, তুমি যদি কিছু তাড়নার জন্যে মানুষের সাক্ষাতে যীশু খ্রীষ্টের ধর্ম্ম স্বীকার করিতে ভয় কর, তবে এখন দুঃখের সময়ে ঈশ্বর যে তোমার প্রার্থনা শুনিবেন, ইহা কি প্রকারে ভরসা করিলা? এই কথা সেই সময়ে উপযুক্ত হওয়াতে ধর্ম্মাত্মার পরাক্রমদ্বারা আমার শোকাকুল মনে শক্তরূপে লাগিল, তাহাতে আমি সেই দণ্ডে হিন্দু আয়া এবং বেহারার সাক্ষাতে উচ্চৈঃস্বরে বলিলাম, হে আমার ঈশ্বর! আমি তোমাকে বিশ্বাস করিয়া খ্রীষ্টিয়ান হইলাম, অতএব এখন আমার প্রার্থনা শুন, কারণ তুমি আপন সন্তানদের প্রার্থনা শুনিতে অঙ্গীকার করিয়াছ। সেই সময় অবধি আমার বাবা সুস্থ হইতে লাগিল, এবং আমিও সেই অবধি আপনার অঙ্গীকার পালন করিলাম।
এই কথাতে ঐ বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের চক্ষু জলেতে পরিপূর্ণ হইলে সে আরও কহিল, হাঁ! মেম সাহেব, সে কাল অবধি আমি পঞ্চাশ বৎসর পর্য্যন্ত খ্রীষ্টের সেবা করিয়া আসিতেছি। তাঁহার নামের জন্যে আমি আপন পিতা ও মাতা ও স্বামী এবং তিন জন প্রিয়তম সন্তানকে ত্যাগ করিয়াছি; কিন্তু তাহাদের বিরহে অদ্যাবধি আমি কখন খেদ করি নাই, কেননা যীশু পরিবারহইতেও ভাল; তিনিই আমার সকল প্রয়োজনীয় দ্রব্য যোগাইয়াছেন।
পরে জনি বাবা সম্পূর্ণরপে সুস্থ হইলে আমি মেম সাহেবের নিকটে বলিলাম, আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার স্বামিকে ডাকাইয়া বলুন, তোমার স্ত্রী খ্রীষ্টধর্ম্ম অবলম্বন করিতে নিতান্ত মানস করিয়াছে। অনন্তর মেম সাহেব সেইরূপ করিলেন, কিন্তু আমার স্বামী তাহা শুনিয়া বিশ্বাস না করিয়া বলিল, আমার স্ত্রী কোথায়? এ কথা সত্য কি মিথ্যা, তাহা আমি তাহার নিজ মুখে শুনিব। তখন আমি বড় ভয় পাইয়া তাহার সম্মুখে গেলাম, কিন্তু কিঞ্চিৎ পরে ঈশ্বর আমাকে সাহস ও অনুগ্রহ প্রদান করিলেন, তাহাতে আমি স্পষ্টই কহিলাম, হাঁ গো, আমি বিবেচনা করিয়া দেখিয়াছি যে খ্রীষ্ট ধর্ম্ম সত্য, অতএব আমি সেই ধর্ম্ম গ্রহণ করিব।
হায়! এই কথা শুনিয়া তাঁহার অতিশয় রাগ হইল, তাহাতে তিনি বলিলেন, তোর ধর্ম্ম বিষয়ে কিছুই চেষ্টা নাই, কেবল তুই বিলাতি ভাতার করিতে চাস্! এই কথা বলিয়া তিনি আমাকে কত শাপ ও গালাগালি দিতে লাগিলেন, পরে আমার মুখে থুথু দিতে আমার সন্তানদিগকে বলিয়া দিলেন; কিন্তু তাহারা তাহাদের পিতা অপেক্ষা কিঞ্চিৎ নম্রমনা হইয়া আমার গলা ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল। এক জন বলিল, ও মা! খ্রীষ্টিয়ান হইও না, তোমার জাতি গেলে কেহ তোমার সঙ্গে বসিয়া খাইবে না। আর এক জন বলিল, মা, আজি তোমার জন্যে আয়ি বড় উত্তম পিঠা গড়িয়া রাখিবেন; কেননা তিনি কহিলেন, মেম সাহেব যখন তোমাদিগকে ডাকিয়া পাঠাইয়াছেন, তখন তিনি অবশ্য তোমাদের মাতাকে বিদায় দিবেন। ও মা, সে পিঠা তোমাকে খাইতে হইবে; আমাদের সঙ্গে চল মা! চল।
স্বামির সকল শক্ত কথা ও নিন্দা আমি স্বচ্ছন্দে সহ্য করিতে পারিয়াছিলাম, কিন্তু সন্তানদের এ রূপ প্রেমিক ব্যবহার দেখিয়া আমার মন অতি ব্যাকুল হইল। আমি এক বার মনে করিলাম, যদি ঘরে যাইয়া স্বামির সাক্ষাতে ঠাকুর পূজা করি, ও সন্তানদিগকে গোপনে খ্রীষ্টের বিষয়ে শিক্ষা দিই, তবে তাহারা বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে আমি সন্তান সুদ্ধ খ্রীষ্টিয়ান হইতে পারিব। কিন্তু ধর্ম্মাত্মা দয়ালু হইয়া শয়তানের এই কুমন্ত্রণা আমার মনহইতে দূর করিলেন, তাহাতে আমি সাহসপূর্ব্বক সন্তানদিগকে বলিলাম, আমি তোমাদের সহিত যাইতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু আমি ঠাকুর পূজা করিতে পারিব না। আমি খ্রীষ্টিয়ান হইব, তাহা হইলে বোধ হয় তোমাদের পিতা আমাকে কখন গৃহে লইয়া যাইবেন না।
আমার স্বামী এই কথা শুনিয়া আরও রাগান্বিত হইয়া বলিলেন, তোকে আর কে লইয়া যাইবে? তোর মৃত্যু হইলেই আমার প্রাণ জুড়ায়। পরে তিনি ছেল্যাদের হাত ধরিয়া তাহাদিগকে টানিয়া লইয়া গেলেন। মেয়্যাটি আমার নিকটে থাকিতে বড় ইচ্ছা করিয়া আমার গলা ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল, কিন্তু তাহার পিতা আমাকে ঠেলে ফেলিয়া আমার কোলহইতে তাহাকে কাড়িয়া লইলেন। সেই দিন অবধি আজি পর্য্যন্ত তাহাদের মধ্যে আমি কোন এক জনের দর্শন পাই নাই।
ও মেম সাহেব, আমি আর কি বলিব? দশ বারো দিন পর্য্যন্ত আমি প্রায় হতজ্ঞান হইয়া আহারাদি ত্যাগ করিয়াছিলাম, তাহাতে সে সময়ে যদি মেম সাহেবের পরিবার আমার প্রতি প্রেমিক ব্যবহার না করিতেন, তবে বোধ হয় আমি শয়তানের ফাঁদে পতিতা হইয়া আপন ছেল্যাদের নিকটে ফিরিয়া যাইতাম। কিন্তু আমার মেম সাহেব ও মিসি বাবা অনেক প্রবোধ দিয়া আমাকে সান্ত্বনা করিলেন, তাহাতে কিছু দিন পরে প্রভুর মহা অনুগ্রহদ্বারা আমার মন সুস্থির হইলে আমি খ্রীষ্টিয়ান মণ্ডলীতে গৃহীতা হইলাম।
পরে আমাদের মিসি বাবা এক জন পাদরি সাহেবকে বিবাহ করিলে আমি তাঁহার নিকটে প্রায় পঁচিশ বৎসর পর্য্যন্ত আয়ার কর্ম্ম করিলাম। তাহার পর আমি যে শিশুবাবাকে দুগ্ধ পান করাইয়াছিলাম, তিনি যুবা হইয়া বিলাতহইতে ফিরিয়া আসিয়া এক উচ্চ পদে নিযুক্ত হইলেন; তথাচ তিনি আপন ধাইকে ভুলিয়া গেলেন না, বরং তাঁহার বিবাহ হইলে তিনি আমাকে আপন গৃহে লইয়া গেলেন, এবং আমার সাক্ষাতে তাঁহার সাতটি সন্তান জন্মিল।
দুই বৎসর হইল তিনি আমাকে বলিলেন, ধাই, এখন তুমি অতিশয় বৃদ্ধা হইয়াছ, তোমাকে আর কর্ম্ম করিতে হইবে না। অতএব বোধ হয় তোমাকে কোন খ্রীষ্টিয়ান লোকদের নিকটে বসতি করিতে দিলে ভাল হয়, কেননা তোমার পীড়াদি হইলে তাহারা তোমার প্রতি প্রেমিক ব্যবহার করিয়া তোমার সেবা করিবে। আমি এই কথায় স্বীকৃতা হইলাম, তাহাতে আমার বাবা সাহেব আমাকে এস্থানে আনিয়া এই ঘরখানি বাঁধাইয়া দিলেন, এবং পাদরি সাহেবের নিকটে সবিশেষ জানাইয়া তাঁহার সমীপে আমাকে সমর্পণ করিয়া গেলেন।
পাদরি সাহেবের মেম আমার প্রতি বড় দয়া প্রকাশ করেন। বাবা সাহেব যে তিনটি টাকা আমার জন্যে পাঠাইয়া দেন, তাহা তিনি মাসে২ আপনি আমাকে দিতে আইসেন, এবং আমাকে অনেক প্রবোধ ও সান্ত্বনার কথা কহেন। আর ফুলমণি ও তাহার স্বামী ও ছেল্যারা আমার প্রতি যেরূপ প্রেমিক ব্যবহার করে, তাহা আমি প্রায় বর্ণনা করিতে পারি না। সত্যবতীর পিতা আমাকে মা বলে, ও ছেল্যারা আমাকে দিদি বলে; ইহা যে নামমাত্র তাহাও নয়, বরং তাহারা গর্ভজাত পুত্ত্র ও কন্যার ন্যায় আমার প্রতি স্নেহ করে।
আমার বাবা সাহেব বায়ু সেবনার্থে একবার পশ্চিম দেশে যাইতেছিলেন, তাহাতে তিনি আমাকে দেখিতে আইলেন, এবং এই ক্ষুদ্র ঘরে অনেক ক্ষণ বসিয়া আমার সহিত ধর্ম্মের বিষয়ে কথোপকথন করিলেন, ও বিদায় হইবার সময়ে তিনি প্রার্থনা করিয়া গেলেন।
এই সকল কথা শেষ হইলে প্যারী আরোও আমাকে বলিল, মেম সাহেব, আপনি যদি আজি যাইবার পূর্ব্বে একটি ক্ষুদ্র প্রার্থনা করেন, তবে আমি বড় আহ্লাদিতা হই। আমি এই কথাতে একেবারে সম্মতা হইলাম, তাহাতে আমরা দুই জনে ঈশ্বরের সম্মুখে হাঁটু পাতিয়া প্রার্থনা করিলাম। প্রার্থনার মধ্যে আমি এই নিবেদন করিলাম, হে প্রভো! ইহার পরে আমাদের দুই জনের পরস্পর যে আলাপ হইবে, তাহাতে তুমি আশীর্ব্বাদ দেও, যেন তদ্দ্বারা আমাদের উভয়ের ধর্ম্মবৃদ্ধি হয়।
প্রার্থনা হইলে পর প্যারী উক্ত কথা মনে করিয়া বলিল, হে মেম সাহেব, এ দরিদ্রা বুড়ির গৃহে কখন২ আসিয়া ইহার সহিত ধর্ম্মের বিষয়ে কথা কহিবেন, ও ইহাকে শাস্ত্র বুঝাইয়া দিবেন, আপনি যদি এমত মানস করিয়াছেন, তবে আমার কত বড় সৌভাগ্য! এমন হইলে আমি দায়ূদ রাজার ন্যায় বলিতে পারিব, “আমার আশীর্ব্বাদরূপ পানপাত্র উথলিয়া পড়িতেছে।” ২৩ গীত।
খ্রীষ্টের এই বৃদ্ধা সেবিকা আপনার মনোরঞ্জক ইতিহাস আমাকে যেরূপে কহিয়াছিল, সেইরূপে আমি লিখিয়াছি, এবং আমার এ বিষয়ে আর কিছু বলিবার কোন আবশ্যক নাই। আমি সে দিবসে তাহার নিকটে যে প্রকার প্রেমভাবে বিদায় হইলাম, তাহা পাঠকবর্গেরা স্বচ্ছন্দে অনুমান করিতে পারিবেন। বালুকাময় অরণ্যেতে তৃষিত ও পথশ্রান্ত পথিক জন যেমন জলস্রোত পাইয়া তৃপ্ত হয়, তদ্রূপ আমিও এই মিথ্যা দেবগণের অন্ধকারময় রাজ্যের মধ্যে এমত ধর্ম্মরূপ উজ্জ্বল দীপ্তি দেখিয়া অতিশয় আনন্দিতা হইলাম, এবং তৎক্ষণাৎ আমার মন তাহার প্রতি আসক্ত হইয়া প্রেমরজ্জুদ্বারা বদ্ধ হইল। আহা! আমরা যদি খ্রীষ্টীয় লোকদের প্রতি এই রূপ আকর্ষিত হই, এবং যে ব্যক্তিতে আমাদের স্বর্গস্থ পিতার সাদৃশ্য দেখিতে পাই তাহাকে যদি স্নেহ করি, তবে তদ্দ্বারা সুন্দররূপে জানা যায় যে আমরাও খ্রীষ্টের লোক বটি। কিন্তু যদি খ্রীষ্টের সেবকদের প্রতি আমাদের ক্রোধ, দ্বেষ ও হিংসা থাকে, তবে আমরা কোন প্রকারে ঈশ্বরের লোক নহি। সংসারের মধ্যে ভাই ভগিনীরা আপনাদিগকে এক পিতার সন্তান সন্ততি জানিয়া পরস্পর প্রেম করে, তদ্রূপ সত্য খ্রীষ্টিয়ানেরা এক ঈশ্বরকেই পিতা বলিয়া এক ত্রাণকর্ত্তাকেই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারূপ জ্ঞান করিয়া প্রেম করুক।
খ্রীষ্টিয়ান লোকদের পরস্পর যে বন্ধুতা জন্মে, সকল সাংসারিক প্রীতিহইতে সে বন্ধুতা শ্রেষ্ঠ, কেননা সেই প্রীতি কেবল ইহকালের জন্যে না হইয়া পরকালে স্বর্গেতে আরও দৃঢ় হইবে। বৃদ্ধা প্যারীর প্রতি আমার এই রূপ প্রেম জন্মিয়াছিল, এবং অল্প দিনের মধ্যে আমরা দুই জনে স্বর্গরাজ্যে একত্র বসিয়া আপন ত্রাণকর্ত্তার উদ্দেশে গান গাইব, ইহা নিশ্চয় বোধ করিয়া আমার মন অতিশয় আহ্লাদযুক্ত হইল।
পঞ্চম অধ্যায়
উক্ত ঘটনার কিছু কাল পরে আমি এক দিন করুণার বাটীতে পুনর্ব্বার যাইতে মানস করিলাম। ইহার মধ্যে তাহার বিষয়ে নিতান্ত বিস্মৃতা ছিলাম এমত নয়, বরং তাহার ভাঙ্গা ঘর ও মলিন বস্ত্রাদি প্রায় প্রতি দিবস আমার মনে পড়িলে আমি নিত্য২ দয়ার সিংহাসনের সম্মুখে তাহাকে স্মরণ করিয়া প্রার্থনা করিতাম, যেন ঈশ্বর তাহার মন ফিরাইয়া তাহাকে সুপথে আনেন। করুণার দুঃখ যাহাতে শেষ হয়, আমি এমত একটি উপায় চেষ্টা করিতেছিলাম, এই নিমিত্তে আমি তাহার নিকটে হঠাৎ না গিয়া কিঞ্চিৎ বিলম্ব করিলাম। তাহার ছোট পু্ত্ত্র নবীনের যে প্রকার আচার ব্যবহার দেখিয়াছিলাম, তদ্দ্বারা আমি বোধ করিলাম, যদি কেহ তাহাকে সুশিক্ষা দিয়া বাধ্য রাখে, তবে কি জানি সে চতুর ও উত্তম বালক হইয়া উঠিতে পারে। আমি লোকদের মুখে শুনিয়াছিলাম করুণার এক জন বড় সন্তানও আছে, অতএব মনে করিলাম, যদ্যপি এই দুই জন বালককে কোন কর্ম্ম দিয়া উদ্যোগী ও পরিশ্রমী করাইতে পারি, তবে তদ্দ্বারা তাহাদের কিছু লাভ হইতে পারে, এবং তাহাদের দুঃখিনি মাতারও উপকার সম্ভাবনা হয়। এই জন্যে আমি মনে স্থির করিলাম, করুণা ইহাতে স্বীকৃতা হইলে আমি তাহার দুই পুত্ত্রকে নিজ বাটীতে আনিয়া বেহারার এবং খানসামার কর্ম্ম শিক্ষা করিতে দিব।এমত অভিপ্রায়ে আমি এক দিবস করুণার গৃহে যাইয়া উপস্থিত হইলাম। হায়২! সেখানে কেমন খেদজনক ব্যাপার দৃশ্য হইল। করুণা আপন দ্বারের শিড়ীর উপরে বসিয়া অতিশয় ক্রন্দন করিতেছিল, এবং তাহার মস্তকের একটা বড় ক্ষতহইতে দুই গাল বহিয়া রক্ত পড়িতেছিল। সে আমাকে দেখিবা মাত্র বলিতে লাগিল, আ! মেম সাহেব, আজি আপনি ভাল সময়ে আসিয়াছেন। আমার এই দুর্দশা আপনি স্বচক্ষে দেখিলেন। বিবেচনা করুন আমি অতি দুর্ভগা, আমি কোথাহইতে সুন্দর ঘর ও পরিষ্কার বস্ত্র পাইতে পারি? ও মেম সাহেব, যদি ঘরের মধ্যে মিষ্ট বাক্য বলে, তবে দুই দিন অনাহারে থাকিলেও থাকা যায়; কিন্তু এই রূপ নিত্য ঝকড়া মারামারি ইত্যাদি আমি আর সহ্য করিতে পারি না। হায়! আমার মৃত্যু হইলে ভাল হয়।
আমি উঠানের মধ্যে এক গামলা শীতল জল দেখিতে পাইয়া তৎক্ষণাৎ তাহাতে আপন রূমাল ডুবাইয়া করুণার মাথার ক্ষতস্থানে দিলাম, এবং পুনঃ২ এই রূপ করিলে ক্রমে২ রক্ত স্রোত নিবারণ হইল। পরে আমি প্রেমভাবে তাহাকে জিজ্ঞাসিলাম, করুণা, তুমি কি প্রকারে এমত ক্ষত বিক্ষতা হইলা?
করুণা উত্তর করিল, মেম সাহেব বলি, শুনুন। আজি আমি তাবৎ দিন কিছু খাইতে না পাইয়া তিনটা বেলার সময়ে ফুলমণির নিকটে দুইটি পয়সা চাহিয়া আনিলাম; পরে তদ্দ্বারা কতক গুলিন ছোট২ মাছ কিনিয়া রাত্রিতে ইহা রান্ধিব এমত মনে করিয়া সেই মাছ কুটিয়া ধুইয়া রাখিতেছি, এমত সময়ে আমার স্বামী আর দুই জন পুরুষকে সঙ্গে লইয়া ঘরে আইল। তাহারা সকলে কিঞ্চিৎ মত্ত ছিল, তাহাতে আমার স্বামী বড় রাগান্বিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, ও গো, ভাত তৈয়ারি আছে কি না? আমি উত্তর দিলাম, চারিটার সময়ে কি ভাত হয়? মাতাল হইয়া কি বলিতেছ, তুমি তাহা জান না; আর তুমি কে, যে তুমি ভাত চাহিতে আসিয়াছ? খরচের নিমিত্তে তুমি কি পয়সা দিয়াছিলা? সে এই কথা শুনিয়া কোটা মাছের চুপ্ড়িকে মাছ সুদ্ধ লাথি মারিয়া নর্দমাতে ফেলিয়া কহিল, তুই এমত কথা বলিস? আমি যদি পয়সা না দিই, তবে এই মাছ কি প্রকারে আপনার জন্যে যোগাইয়া রাখিয়াছিলি? আমাকে এই রূপে ভর্ৎসনা করিয়া সে আপন মাতওয়ালা সঙ্গিদের প্রতি ফিরিয়া কহিল, চল ভাই, আজি আমাদের পয়সার অভাব নাই; অতএব এ বেটী যদ্যপি খাইতে না দিল, ভাবনা কি? অন্য স্ত্রীলোকদের সহিত আমাদের পরিচয় আছে কি না? এই কথা কহিয়া সে আমাকে অত্যন্ত মারিল, পরে তাহারা সকলে চলিয়া গেল।
আমি ইহা শুনিয়া জিজ্ঞাসিলাম, করুণা, তোমার স্বামী মাছ ফেলিয়া দিলে তুমি কি তাহাকে কিছু কহিলা না? করুণা উত্তর করিল, হাঁ মেম সাহেব, কহিব না কেন? আমি তাহাকে যথেষ্ট গালি দিলাম। এমত কর্ম্ম ও এমত কথা কি সহ্য করা যায়? যে দিনে তাহার কাছে কিছু টাকা কড়ি না থাকে, সে দিনে আমি যাহা দিই তাহা সে চুপ্ করিয়া খায়; কিন্তু যখনি চারি পাঁচ আনা উপায় করে, তখনই আমার এই প্রকার দশা হয়। কল্য প্রাতে তাহার নিকটে একটিও পয়সা থাকিবে না, রাত্রের মধ্যেই মদ্যপান ও বেশ্যাগমনাদি দ্বারা সকলি ব্যয় করিবে।
পরে আমি বলিলাম, দেখ করুণা, তোমার স্বামী মাতওয়ালা ছিল, অতএব কি করিল, কি বলিল, সে সময়ে তাহার কিছু জ্ঞান ছিল না; এমত কালে তাহার প্রতি অনুযোগ করা কেবল অনর্থক, এবং গালি দেওয়া সর্ব্বদা মন্দ, তদ্দ্বারা কখনও ভাল ফল হয় না। তুমি যদি তাহাকে গালি দিয়া তাহার রাগ বৃদ্ধি না করিতা, তবে, তোমাকে এত মার খাইতে হইত না।
করুণা কহিল, মেম সাহেব, ফুলমণিও আমাকে এ কথা বলিয়া থাকে, তাহাতে আমি কখন২ মনে স্থির করি, যে আমি স্বামির প্রতি মিষ্ট বাক্য বলিলে তদ্দ্বারা সে নম্র হয় কি না, তাহা দেখিব; কিন্তু সে যখন বড় মাতওয়ালা হইয়া ঘরে আইসে, তখন মিষ্ট বাক্য সকল আমার মনে আর পড়ে না, কেবল রাগের কথা মনে উঠে। লোকেরা এই সকল বিবেচনা না করিয়া কেবল আমাকেই দোষ দেয়, এবং আমার স্বামিকে উত্তম পুরুষ বোধ করে, ইহাতে আমার মনে বড় দুঃখ হয়। আজি কেবল দুই দিন হইল ফুলমণি আমাকে বলিল, ও গো করুণা! তোমার স্বামির স্বভাব কোমল ও প্রেমিক, অতএব তুমি যদি তাহাকে কিঞ্চিৎ আদর করিতা, তবে সে অবশ্যই তোমাকে ভাল বাসিত। ফুলমণি কি দেখিয়া এমত কথা বলিল, তাহা আমি বুঝিতে পারি নাই, কেননা আমার প্রতি স্বামী কোনো দিন কোমল ব্যবহার করে নাই। আর ফুলমণি আমার দুঃখের বিষয় কি জানে? তাহার স্বামির অতিশয় সৎস্বভাব, আপনার স্ত্রী যাহা চাহে তাহাই আনিয়া দেয়; কিন্তু ফুলমণি যদি আমার মত আপদগ্রস্তা হইত, তবে সে অন্য প্রকার কথা কহিত।
তাহাতে আমি কহিলাম; করুণা! তোমার স্বামী যে দুষ্ট ব্যক্তি তাহা স্পষ্ট দৃশ্য হইতেছে; তথাপি তোমাকে এই রূপ স্থির বিবেচনা করিতে হয়, যে সে তোমার বিবাহিত স্বামী, অতএব তাহাহইতে তুমি কোন প্রকারেই পৃথক হইতে পারিবা না; ইহা নিশ্চয় জানিয়া সে যাহাতে ক্রমে২ ভাল হয়, এমত একটি উপায় চেষ্টা করা তোমার কর্ত্তব্য। কিন্তু করুণা, যাহারা আমাদের প্রতি কদাচার করে তাহাদের প্রতি প্রেম করা অতিশয় দুষ্কর, ইহা আমি জানি। যিনি শত্রুদের হস্তে আপন প্রাণ সমর্পণ করিলেন, তাঁহার স্বভাব অর্থাৎ খ্রীষ্টের স্বভাব প্রাপ্ত না হইলে আমরা কখন এমত প্রেম প্রকাশ করিতে পারিব না। হায় করুণা! তুমি যদি সত্য খ্রীষ্টিয়ান হইতা, তবে আমার মনে কিঞ্চিৎ ভরসা জন্মিত, যে তোমার স্বামী দুষ্টতা ত্যাগ করিয়া ক্রমে২ ভাল হইবে; কেননা এই সকল ঈশ্বরীয় বচন অবশ্য সত্য, যথা “কোমল উত্তর ক্রোধ সম্বরণ করায়,” হিতোপদেশ ১৫।১। “ধার্ম্মিক ব্যক্তির একান্ত প্রার্থনা অতি সফল হয়,” যাকুবের পত্র ৫।১৬। “স্বামী অবিশ্বাসী হইলেও বিশ্বাসিনী স্ত্রীর দ্বারা শুচি হয়,” ১ করিন্থীয় ৭।১৪। দেখ, তুমি যদি নিতান্ত খ্রীষ্টের লোক হইতা, তবে তুমি উত্তম ক্রিয়াতে আপন স্বামির কুক্রিয়াকে পরাজয় করিতা; এবং তুমি অবশ্যই তাহার জন্যে প্রার্থনা করিতা, তাহাতে ঈশ্বর তোমার প্রার্থনাতে প্রসন্ন হইয়া তাহার মন ফিরাইয়া দিতে পারিতেন; কিম্বা এমত সুঘটনা যদিও না হইত, তবে কি জানি তোমার অনুরোধে ঈশ্বর তাহাকে এই সকল মহৎ দোষহইতে ক্ষান্ত করাইতেন।
এই কথাতে করুণা কাঁদিতে২ বলিতে লাগিল, না না, মেম সাহেব, সে যে দোষহইতে ক্ষান্ত হইবে আমার এমত কিছু মাত্র বোধ হয় না। তাহার কথা দূরে থাকুক, কিন্তু সত্য খ্রীষ্টিয়ান হইতে আমার একান্ত ইচ্ছা আছে, কেননা ইহকালে আমি যত দুঃখ পাইতেছি তাহা কেবল ঈশ্বর জানেন; অতএব যদি পরকালে সুখ পাইবার ভরসা থাকিত, তবে আমি কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা পাইয়া স্থির থাকিতাম। কিন্তু খ্রীষ্টের সেবা অতিশয় কঠিন, তাঁহার সকল আজ্ঞা যে আমি পালন করিতে পারিব, এমত আমার ক্ষমতা নাই।
আমি বলিলাম, হায়২ করুণা! খ্রীষ্টের সেবা যে কঠিন তাহা তুমি কি বুঝিয়া কহিলা? ধর্ম্মপুস্তকে এই লেখা আছে, “প্রভু যীশু খ্রীষ্টেতে বিশ্বাস কর, তাহাতেই তুমি ত্রাণ পাইবা।” এবং তিনি আপনি কহিয়াছেন, “আমার যোঁয়ালি অনায়স ও আমার ভার লঘু।”
করুণা উত্তর করিল, মেম সাহেব, একথা তো সত্য বটে; বিশ্বাস করা অতি সহজ, আমি কি বিশ্বাস করি না? কিন্তু খ্রীষ্টের যে আজ্ঞা পালন তাহা আমাহইতে হয় না।
তাহাতে আমি বলিলাম, হায় করুণা! তুমি ঐহিক ব্যক্তির ন্যায় কথা কহিতেছ। আমার এই প্রার্থনা, যেন সত্যময় আত্মা খ্রীষ্টের বিষয়ে কথা লইয়া তোমাকে বুঝাইয়া দেন। তুমি বলিতেছ, আমি বিশ্বাস করি; কিন্তু কি বিশ্বাস কর? তুমি যে পাপী ও দীনহীন ও নরকযোগ্য হইলেও খ্রীষ্ট যীশু আপন অমূল্য রক্তদ্বারা তোমাকে ক্রয় করিয়া বাঁচাইয়াছেন, এই সকল যদি বিশ্বাস করিতা তবে বিশ্বাসের সহিত তোমার প্রেমও জন্মিত; এবং খ্রীষ্টের প্রতি প্রেম জন্মিলে তাঁহার আজ্ঞা যে কঠিন নয় তাহা তোমার বোধ হইত। হে করুণা! আমার ভয় হয় যে তোমার বিশ্বাস প্রকৃত বিশ্বাস নহে। বিশ্বাস দুই প্রকার আছে, তাহার দৃষ্টান্ত বলি। কোন গ্রামে এক জনের ভয়ানক রোগ হইয়াছিল, কিন্তু তাহার সে রোগ বোধ হইত না; তাহাতে বন্ধু বান্ধবেরা তাহার ম্লান বদন দেখিয়া তাহাকে কহিল, ওগো, আমাদের এই গ্রামে এক জন প্রসিদ্ধ কবিরাজ আছেন, তাহা তুমি জ্ঞাত আছ; অতএব তুমি শীঘ্র তাহার নিকটে গিয়া ঔষধ খাও, না খাইলে তুমি শীঘ্র মারা পড়িব। ইহা শুনিয়া ঐ রোগী হাসিয়া উত্তর করিল, কবিরাজ যে আছেন, তাহা আমি জানি, এবং তিনি যে উত্তম কবিরাজ তাহাও বিশ্বাস করি; কিন্তু আমার কোন পীড়া হয় নাই, আমি তাঁহার নিকটে কেন যাইব? দেখ করুণা! সে গ্রামে কবিরাজ থাকিলেও আর ঐ নির্বোধ মনুষ্য ইহা বিশ্বাস করিলেও তাহার পক্ষে কবিরাজ না থাকার মত হইল, সুতরাং সে অল্প দিনের মধ্যে ঐ রোগদ্বারা নষ্ট হইল। সে গ্রামে আর এক জন পীড়িত ব্যক্তি অন্য কবিরাজদের নানা প্রকার ঔষধাদি খাইলেও দিনে২ ক্ষীণ হইতেছে, এবং অত্যন্ত ক্লেশ পাইয়া মৃতপ্রায় হইয়াছে, এমত সময়ে এক জন আসিয়া তাহাকে উক্ত প্রসিদ্ধ কবিরাজের গুণ সকল জ্ঞাত করিলে ঐ রোগগ্রস্ত ব্যক্তি বড় আহ্লাদপূর্ব্বক এই সমাচারে বিশ্বাস করিয়া তৎক্ষণাৎ কবিরাজকে ডাকাইয়া পাঠাইল; এবং তিনি তাহাকে ঔষধাদি দিয়া তাহার পীড়া শান্তি করিলে, সে পীড়িত ব্যক্তি কবিরাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিয়া যত্নপূর্ব্বক তাঁহাকে যাবৎ জীবন প্রেম করিল।
দেখ করুণা, সেই গ্রামে ভাল কবিরাজ আছেন, উক্ত দুই পীড়িত লোকের এমত বিশ্বাস ছিল, কিন্তু প্রথম রোগির কোন প্রকারে প্রেম জন্মিল না, কারণ সে তাহার নিকটে না যাওয়াতে কোন প্রতিকার পাইল না; তাহাতে ঐ ব্যক্তির বিশ্বাস নিতান্ত নিষ্ফল হইল। কিন্তু অন্য রোগির বিশ্বাস তদ্রূপ নহে, বরং সে আপন বিশ্বাস প্রযুক্ত কবিরাজকে ডাকাইয়া রক্ষা পাইল; পরে আপন রক্ষাকর্ত্তার প্রতি তাহার এমত প্রেম জন্মিল যে তিনি যাহা আজ্ঞা করিতেন সে তাহাতেই আহ্লাদপূর্ব্বক সম্মত হইত, ইহা কেবল নয়, অন্য লোকের নিকটেও সে কবিরাজের গুণকীর্ত্তন করিত। কবিরাজের প্রতি এই দ্বিতীয় জনের যদ্রূপ বিশ্বাস ছিল, খ্রীষ্টের উপরে আমাদের তদ্রূপ বিশ্বাস না হইলে আমরা কোন রূপে ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারিব না। ও গো করুণা! তুমি ও আমি এবং পৃথিবীস্থ সকল লোকই পাপরূপ পীড়াতে পীড়িত আছে; অতএব আমার এই পরামর্শ শুন, তুমি পবিত্র আত্মার নিকটে প্রার্থনা কর যেন তিনি তোমাকে আপন পীড়ার বোধ জন্মাইয়া দেন। পীড়ার বোধ হইলে তুমি অবশ্য মহৎ চিকিৎসকের নিকটে গিয়া ত্রাণ যাচ্ঞা করিবা, এবং তিনি যখন তোমাকে পাপরূপ যন্ত্রণাহইতে রক্ষা করিবেন, তখন তাঁহার আজ্ঞা পালন করিবার কারণ তিনি তোমাকে অনুগ্রহ ও বল ও কৃতজ্ঞতা প্রদান করিবেন।
করুণা অধোবদন হইয়া এই সকল কথাতে কিছু উত্তর করিল না। পরমেশ্বর তাহার প্রতি দয়া করিবার মানস করিয়াছিলেন, অতএব সে যেন নির্ম্মল রূপার ন্যায় পরিষ্কৃতা হয়, এই হেতুক প্রথমে দুঃখরূপ অগ্নিতে তাহার পরীক্ষা করণ আবশ্যক হইল।
যখন আমাদের পরস্পর আলাপ হইতেছিল, তখন আমরা গৃহের মধ্যে কেবল দুই জন ছিলাম, কিন্তু কথা সাঙ্গ হইলে করুণার পুত্ত্রেরা দৌড়িয়া আসিয়া উপস্থিত হইল। নবীন আমাকে দেখিয়া সেলাম করিল। তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মাচানহইতে একটা খালি বোতল লইয়া শীঘ্র পলায়ন করিতেছিল, এমত সময়ে তাহার মাতা তাহার হাত ধরিয়া বলিল, ও বংশী! তোমার কাছে যদি কিছু পয়সা থাকে তবে আমাকে দেও, আমি তাহাতে তোমাদের খাদ্য সামগ্রী কিনি, কেননা আমাদের আজি কিছুই খাইবার নাই; এবং যাহা কর বাছা, তোমার বাপের মত কোন রূপে মদ কিনিয়া খাইও না।
ঐ দুষ্ট বালক উত্তর করিল, তোমার তো বড় ভাল কথা শুনিতে পাই; বুঝি তোমাকে দিবার জন্যে আমি সন্গরসন খেলা করিয়া দুই আনা লাভ করিলাম? আমি তো এখন মদ খাইব, পরে আমার ভাত না হইলে কিছু ক্ষতি নাই; তুমি আপনার জন্যে চেষ্টা কর। ইহা বলিয়া বংশী আপন মায়ের হাত ছাড়াইয়া পলায়ন করিল। তাহার বয়স পোনের কিম্বা ষোল বৎসরের অধিক ছিল না, তথাচ সে কেমন দুষ্ট ও লম্পট বালক, ইহা তাহার মুখ ও আচার ব্যবহার দ্বারা অতি স্পষ্ট বোধ হইল।
নবীন আপন ভ্রাতার এই রূপ কর্ম্ম দেখিয়া তাহার পশ্চাৎ যাইতেছিল, কিন্তু আমি তাহাকে ডাকিয়া বলিলাম, নবীন, তোমার ভাই অতিশয় দুষ্ট বালক। দেখ, তাহার কথা শুনিয়া তোমার মাতা কেমন কাঁদিতেছে; অতএব তুমিও যদি তাহার মত ব্যবহার কর, তবে তোমার মায়ের কি দশা হইবে?
নবীন বলিল, যদি আমার পয়সা থাকিত, তবে আমি মাকে দিতাম। মধুর ঘর দেখাইবার কারণ তুমি যে এক বার আমাকে চারিটি পয়সা দিয়াছিলা, তাহার মধ্যে আমি তাহাকে দুইটি দিয়াছি। এখন আমার কাছে একটীও পয়সা নাই, কেননা সন্গরসন খেলা করিতে গেলে আমার কেবল হারি হয়, কখন জিত হয় না।
ইহা শুনিয়া আমি বলিলাম, এ কথাতে আমি বড় সন্তুষ্টা হইয়াছি, কেননা ইহাতে তুমি এই জানিতে পারিবা যে জুয়া খেলা অপেক্ষা টাকা উপার্জন করিবার অন্যান্য ভাল উপায় আছে।
নবীন কহিল, মেম সাহেব, আমি কি কর্ম্ম করিয়া টাকা লাভ করিব? কখন২ সাহেবদের বাজার মাথায় করিয়া তাঁহাদের ঘরে পৌঁছিয়া দিই; কিন্তু তাহাতে কিছু লাভ নাই, কেননা খানসামারা আমাকে তিন পয়সা দিতে স্বীকার করিয়াও শেষে একটি পয়সা দিয়া আমাকে তাড়াইয়া দেয়।
পরে আমি জিজ্ঞাসিলাম, ভাল নবীন, তোমাকে আর মুটিয়ার কর্ম্ম করিতে না বলিয়া যদি কেহ ছোট খানসামার পদে নিযুক্ত করে, ও তোমাকে একটি পাগ্ড়ি ও চাপ্কান্ ও পাজামা দেয়, তবে কি তুমি সন্তুষ্ট হও?
ইহা শুনিয়া নবীনের মুখ প্রফুল্ল হইল, এবং সে হাস্য করিতে২ বলিল, হাঁ, আমি তাহাতে অবশ্য বড় সন্তুষ্ট হই। মেম সাহেব, তুমি যদি আমাকে খানসামার কর্ম্ম দেও, তবে আমি এখনি তোমার সঙ্গে যাই। তাহাতে তাহার মাতাও কহিল, হাঁ মেম সাহেব, আপনি যদি এই কর্ম্মটি অনুগ্রহ করিয়া দেন, তবে আমাদের বড় উপকার হয়।
নবীনের হিতার্থে আমি যে মানস করিয়াছিলাম, তাহা যে এমত সহজে সফল হইল, ইহা দেখিয়া আমি বড় আহ্লাদিতা হইলাম; তাহাতে তখনি বলিলাম, ভাল! নবীন আমার বাটীতে আইসুক, আমি উহাকে খাওয়া পরা দিয়া খানসামার কর্ম্ম শিক্ষা করাইব; এবং সে যদি ভাল রূপে চলে, ও জুয়া খেলা একেবারে ত্যাগ করে, তবে তিন মাস পরে আমি উহাকে প্রত্যেক মাসে এক টাকা করিয়া দিব।
নবীন উক্ত কথাতে আহ্লাদপূর্ব্বক স্বীকৃত হইয়া কহিল, এক টাকা প্রতি মাসে পাইলে আমি আর কেন জুয়া খেলিব? তাহাতে আমি করুণাকে বলিলাম, তবে করুণা, কল্য তোমার পুত্ত্রকে আমার নিকটে আনিও। এবং বংশী যদি কর্ম্ম করিতে চাহিয়া আমার আজ্ঞানুসারে চলিতে স্বীকৃত হয়, তবে আমি তাহাকেও তিন মাসের নিমিত্তে পরীক্ষা করিতে প্রস্তুতা আছি; কিন্তু তাহার ব্যবহার দেখিয়া ভয় হয়, পাছে সে আমাকে বড় দুঃখ দেয়।
তাহাতে করুণা নিশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, হায় মেম সাহেব! বংশী কখনই কর্ম্ম করিবে না। সে স্বাভাবিক দুষ্ট বালক, কেননা যত দিন আমার শাশুড়ি জীবিতা ছিলেন, তত দিন বংশীর বাপ তাঁহাকে ভালরূপে খাওয়া পরা দিতেন, কিন্তু আমার ছেল্যা আমার প্রতি কিছু মাত্র প্রেম করে না। তাহাকে একেবারে দূর করিয়া দিলে তাহার উপযুক্ত শাস্তি হইত বটে; কিন্তু সে তো আমার গর্ভজাত সন্তান, অতএব আমি এমত শাস্তি তাহাকে কি প্রকারে দিই?
আমি কহিলাম, করুণা, এই সকল শুনিয়া তোমার নিমিত্তে বড় দুঃখিতা আছি, কিন্তু ইহা তোমার নিজ দোষ প্রযুক্ত ঘটিয়াছে। আমি প্রথমবার যখন তোমার গৃহে আইলাম, তখন আমার বিলক্ষণরূপে স্মরণ হয় যে নবীন সত্য কথা কহিল, সেই প্রযুক্ত তুমি তাহাকে চড় মারিয়া মিথ্যাবাদী বলিলা। পিতা মাতা যদি এমত কর্ম্ম করে, তবে সন্তানেরা কি প্রকারে ভাল হইয়া উঠিতে পারে?
এই কথাতে করুণা দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ পূর্ব্বক কহিল, হাঁ! কি জানি আমারি দোষ হইয়া থাকিবে। কিন্তু ঐ বংশী আমার জ্যেষ্ঠ পুত্ত্র, এবং পাঁচ বৎসর পর্য্যন্ত আমার আর ছেল্যা হইল না, অতএব আমি স্নেহপ্রযুক্ত তাহাকে কখন শাসন করিতে পারিতাম না, এই নিমিত্তে সে এমত অবাধ্য বালক হইয়াছে।
আমি বলিলাম, করুণা, আমরা যখনি ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করি, তখনি আমাদের দুর্দশা ঘটে। ঈশ্বর কহিয়াছেন, “বালককে শাসন করিতে নিবৃত্ত হইও না; তুমি দণ্ডদ্বারা তাহাকে প্রহার কর, তাহাতে তুমি তাহার প্রাণকে নরক হইতে রক্ষা করিবা।” হিতোপদেশ ২৩।১৩,১৪। কিন্তু তুমি অন্য প্রকার বুঝিয়া তাঁহার আদেশানুসারে চল নাই, তাহাতে যাহাকে তুমি প্রিয়পাত্র জ্ঞান করিয়া আদরের পুত্ত্র করিয়াছ, সে পুত্ত্র এখন তোমার বিরুদ্ধে উঠিয়া তোমাকে তুচ্ছ করে, এবং দুষ্টতাতে এমত প্রবল হইয়াছে যে তাহাকে দেখিলে ভয় হয়। অতএব তুমি আর তাহাকে দমন করিতে পারিবা না; তথাচ আমার সাহেবকে আমি তাহার বিষয় জ্ঞাত করিব, তিনি যদি তাহার মঙ্গলার্থে কিছু করিতে পারেন তবে অবশ্য করিবেন।
বিদায় হইবার কাল উপস্থিত হইলে আমি বিবেচনা করিতে লাগিলাম, অদ্য করুণাকে কিছু টাকা দিলে ভাল হইবে কি না; এমত সময়ে সে আপনি ভয়পূর্ব্বক জিজ্ঞাসিল, মেম সাহেব, আপনি যে ঝাড়ন গুলিন আমাকে একবার সিলাই করিতে দিতে চাহিয়াছিলেন, সে সকল কি এখন আপনার নিকটে আছে? আমি কহিলাম, না, অনেক দিন হইল তাহা সিলাই করা গিয়াছে; কিন্তু তুমি সে বিষয় জিজ্ঞাসা কর কেন? করুণা বলিল, এখন যদি সে ঝাড়ন আপনার নিকটে থাকিত, তবে আমি লইয়া সিলাই করিতাম; কেননা আমার স্বামী এবং পুত্ত্র আমার উপকার করিবে না, তাহা স্পষ্ট দেখিতেছি, অতএব আপনি কর্ম্ম না করিলে সকলে মারা পড়িব।
করুণার এই প্রকার নূতন কথা শুনিয়া আমি বড় আহ্লাদিতা হইলাম, এবং তদ্দ্বারা পূর্ব্বাপেক্ষা সুন্দররূপে জানিতে পারিলাম, যে অবিবেচনা পূর্ব্বক টাকা দান করিলে দরিদ্রের পক্ষে অতিশয় ক্ষতি জন্মে। ইহার দৃষ্টান্ত এই, আমি যখন প্রথমবার করুণার দুঃখ দেখিয়াছিলাম, তখনই যদি তাহাকে টাকা কি পয়সা দিতাম, তবে এখন সে আমার নিকটে কর্ম্ম যাচ্ঞা না করিয়া পুনর্ব্বার তদ্রূপ ভিক্ষাই চাহিত। দরিদ্রেরা যাহাতে কোন কর্ম্ম করিয়া আপনাদের সাহায্য করিতে পারে, এমত শিক্ষা তাহাদিগকে দিলে তাহাদের পক্ষে সর্ব্বাপেক্ষা উত্তম সাহায্য হয়।
ইহা জানিয়া আমি করুণাকে আশ্বাস দিতে চাহিয়া বলিলাম, ঝাড়ন সকল সিলাই হইয়াছে বটে, কিন্তু এখন আমার নিকটে একথান কোরা কাপড় আছে, তাহা ছিঁড়িয়া খাটের চাদর বানাইব। অতএব কল্য তুমি যখন নবীনকে আমার বাটীতে লইয়া যাইবা, তখন আমি সেই চাদর সকল তোমাকে সিলাই করিতে দিব। তুমি যে আপনি কর্ম্ম করিতে মানস করিয়াছ, তাহাতে আমি বড় সন্তুষ্টা হইয়াছি; এবং অদ্য তোমার ঘরে কিছু নাই তাহা দেখিতেছি, অতএব এখন এক টাকা লও, পশ্চাৎ আমার কাপড় সিলাই করিয়া তাহা পরিশোধ করিও। তাহাতে করুণা টাকাটি দেখিয়া হৃষ্টচিত্ত হইয়া সেলাম করিয়া লইল।
আমি সাধু ও সত্যবতীর জন্যে কতক গুলিন মিঠাই আনিয়াছিলাম, তাহাতে আপন বাটী যাইবার পূর্ব্বে তাহাদিগকে সেই মিঠাই দিতে গেলাম। সাধুর পিতা প্রেমচাঁদ ঘরে ছিল; তখন সে আপন স্ত্রীর নিকটে বসিয়া তাহারা দুই জনে কতক গুলিন টাকা ও পয়সা গণিতেছিল। তাহাতে তাহাদের মন এমত নিমগ্ন হইয়াছিল যে আমি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলেও তাহারা প্রথমে জানিতে পারিল না। কিন্তু আমাকে দেখিবামাত্র ফুলমণি শীঘ্র উঠিয়া সেলাম করিল, পরে টাকা ও পয়সা একত্র করিয়া এক পার্শ্বে রাখিয়া কহিল, মেম সাহেব, আমার স্বামী আজি মাহিনা পাইয়াছেন, অতএব আগত মাসে আমরা কি প্রকারে তাহা ভালরূপে খরচ করিতে পারি, ইহাই বিবেচনা করিতেছিলাম।
আমি বলিলাম, যদি এমত হয়, তবে অনুগ্রহ করিয়া সে সকল হিসাব সাঙ্গ কর; কেননা আমি তোমাদের ঘরের কর্ম্মেতে ব্যাঘাত করিতে চাহি না, আর তোমাদের প্রতিবাসিনী করুণাকে যেন পরিমিত ব্যয় বিষয়ে কিছু উপদেশ দিতে পারি, এই কারণ আমি বঙ্গালিদের সাংসারিক খরচের বিষয়ে কিছু শিক্ষা করিতে বড় ইচ্ছা করি।
এই কথা শুনিলেও প্রেমচাঁদ এবং ফুলমণি আমার সাক্ষাতে আপনাদের হিসাব করিতে বড় অনিচ্ছুক হইল, কিন্তু তাহাদিগকে বিস্তর সাধ্যসাধনা করিলে তাহারা পুনর্ব্বার লেখাযোখা করিতে লাগিল।
প্রেমচাঁদ আপন স্ত্রীকে বলিল, আমার সাত টাকা মাহিনার মধ্যে এক টাকা সাহেবের নিকটে জমা করিয়া রাখিয়াছি; তাহার স্থানে আমাদের এখন চৌদ্দ টাকা হইয়াছে। আর এই লও, ছয়টি টাকা আনিয়াছি; এখন তোমার কাছে কত আছে, তাহা দেখি।
ফুলমণি বলিল, আমি দুধ বেচিয়া ৩৸৹ তিন টাকা বারো আনা পাইয়াছিলাম, তাহার মধ্যে গোরুর খোরাকের নিমিত্তে ১৸৹ এক টাকা বারো আনা ব্যয় হইয়াছে; অতএব তাহা ধরিবার কোন আবশ্যক নাই, এই ২ দুই টাকা মাত্র আছে।
প্রেমচাঁদ কহিল, ও গো, তবে ঐ পয়সাগুলিন কোথাহইতে আইল?
ফুলমণি বলিল, করুণার জন্যে এক খানা মোটা শাড়ি কিনিতে তিন মাস পর্য্যন্ত দশ আনা পয়সা জড় করিতেছি। সে দুঃখিনী কাপড় ব্যতিরেকে যে ক্লেশ ভোগ করিতেছে তাহা আর দেখা যায় না। মহেন্দ্র বাবুর স্ত্রীর তিনটা কোর্ত্তা সিলাই করিয়া দিয়াছিলাম, তাহাতে ছয় আনা পাইলাম; এবং এই মেম সাহেব অনুগ্রহ করিয়া এক বার সাধুকে ও সত্যবতীকে এক২ সিকি দিয়াছিলেন, তাহার মধ্যে এই শাড়ি কিনিবার জন্যে তাহারা আমাকে দুই২ আনা করিয়া দিল, তাহাতে দশ আনা হইয়াছে।
প্রেমচাঁদ বলিল, ভাল করিয়াছ ফুলমণি। আমি কল্য এক খান কাপড় কিনিয়া আনিব, এবং তুমি করুণাকে তাহা দিবার সময়ে বলিও, যে এই শাড়ি পরিয়া তোমাকে প্রত্যেক রবিবারে গীর্জায় যাইতে হইবেক; কেননা আমি যখনি গীর্জায় যাইবার কথা তাহার সাক্ষাতে বলি, তখনি সে কাপড়ের ছল করিয়া উত্তর করে, আমার বস্ত্র নাই, আমি কি প্রকারে গীর্জায় যাইব? কিন্তু সে যাহা হউক, এখন আমি হিসাব লিখিতে আরম্ভ করি।
সর্ব্বসুদ্ধ আমাদের আয় ৯৷৷৵৹ নয় টাকা দশ আনা আছে, তাহার মধ্যে সাহেবের নিকটে এক টাকা জমা করিয়াছি, করুণার শাড়ির জন্যে দশ আনা, প্রভুর ভোজনের নিমিত্তে দুই আনা, মিশনরি সোসাইটির মাসিক চাঁদার নিমিত্তে দুই আনা, ইহাতে ১৸৵৹ এক টাকা চৌদ্দ আনা হইল, বাকি থাকে ৭৸৹ সাত টাকা বারো আনা, না গো ফুলমণি?
ফুলমণি কিঞ্চিৎকাল হিসাব করিয়া কহিল, হাঁ, তাহা ঠিক হইয়াছে; কিন্তু সাধুর নিমিত্তে বড় ধর্ম্মপুস্তক কিনিবার কারণ যে দুই আনা মাসে আমরা জমা করিয়া রাখি, তাহা লিখিতে ভুলিয়াছেন।
প্রেমচাঁদ বলিল, হাঁ গো, সে কথা তো সত্য। আরো আমি এক জন হিন্দু স্ত্রীলোকের নিমিত্তে চারি আনা পয়সা লইব। আজি সাহেবের কর্ম্মে আমাকে তেঘরি গ্রামে যাইতে হইয়াছিল, তথায় গিয়া দেখিলাম এক গাছ তলায় এক জন বিধবা স্ত্রী প্রসব হইয়াছে, এবং তাহাকে একটু জল দেয় এমত ব্যক্তি সেখানে নাই, তাহাতে আমি সেখানকার এক জন দোকানির নিকটে আটটি পয়সা কর্জ করিয়া তাহাকে দিয়া আইলাম। অতএব কল্য যাইয়া সেই কর্জ পরিশোধ করিতে হইবেক, এবং ঐ অনাথা স্ত্রীলোককে আর দুই আনা পয়সা দিয়া আসিব।
ফুলমণি বলিল, ভাল, তাহাই করিও। তবে আমাদের ঘর খরচের নিমিত্তে ৭৷৵৹ সাত টাকা ছয় আনা রহিল। প্রেমচাঁদ উত্তর করিল, হাঁ গো তাহাতে কি কুলাইবে না? তাহার স্ত্রী হাসিয়া বলিল, বিবেচনা করিয়া খরচ করিলে কুলাইবে না কেন? কেবল কঠিন হইয়াছে এই, যে প্রিয়নাথের জন্যে দুইটা জামার কাপড় এই মাসে না কিনিলে নয়; কিন্তু ক্ষতি নাই, উহার কাপড় কিনিবার কারণ আমি সিলাই আদি করিয়া অবশ্য কোন প্রকারে চারি গণ্ডা পয়সা উপায় করিতে পারিব।
এমত কথা হইলে প্রেমচাঁদ দানাদির সকল টাকা পয়সা আপনি তুলিয়া রাখিল, এবং ঘর খরচের টাকা গুলিন ফুলমণিকে দিয়া কহিল, পরমেশ্বর আমাদের প্রতিপালক, আমাদের কিছুরই অভাব হইবে না; তিনি আমাদের প্রয়োজনীয় আহার অদ্য দিয়াছেন।
এই ধার্ম্মিক পরিবারের সদ্ব্যবহার ও সুখ দেখিয়া করুণার দুঃখের অবস্থা আমার স্মরণ হইল, তাহাতে আমি মনোমধ্যে বিবেচনা করিলাম, ঈশ্বরের সেবকেরা নিতান্ত সুখদায়ক পথে ভ্রমণ করে, এবং তাহাদের সকল গতি শান্তিকর; কিন্তু “যে সমুদ্র কখন স্থির হইতে পারে না, ও যাহার জলেতে মল ও কর্দ্দম উঠে, দুষ্ট লোকেরা এমত আলোড়িত সমুদ্রের ন্যায় হয়। ঈশ্বর যথার্থ কহিয়াছেন, পাপিদের কিছুই মঙ্গল নাই।” যিশয়িয় ৫৭।২০, ২১।
তদনন্তর ফুলমণি কিঞ্চিৎ ভাবিতা হইয়া বলিতে লাগিল, বেলা গেল, আজি ছেল্যারা পাঠশালাহইতে ফিরিয়া আইসে না কেন? এই কথা শুনিয়া প্রেমচাঁদ দ্বারের বাহিরে গিয়া তাহাদের অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া রহিল। কিছুকাল পরে সে অতিশয় বিষণ্ণ বদন হইয়া ভিতরে আসিয়া হঠাৎ মঞ্চহইতে এক গাচা বেত্র নামাইল, এবং তাহা হাতে করিয়া শীঘ্র দৌড়িয়া বাহিরে গেল। ইহাতে আমরা জ্ঞাতা হইলাম, যে সে অবশ্য কোন অসন্তোষক ঘটনা দেখিতে পাইয়াছে, কেননা ইহার পূর্ব্বে প্রেমচাঁদের সুশীল বদনে এত রাগ আমি কখন দেখি নাই। তখন ফুলমণি জানালা খুলিয়া দেখিবা মাত্র উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিল, হে পরমেশ্বর! আমার ছেল্যাকে শয়তানের হস্তহইতে উদ্ধার কর।
এই স্ত্রীপুরুষের মনের অস্থিরতা দেখিয়া আমি অতিশয় ভীতা হইলাম, এবং কি হইয়াছে, ইহা জ্ঞাত হইবার জন্যে শীঘ্র বাহিরে গেলাম। পরে দেখিলাম যে সাধু ও সত্যবতী গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে, এবং করুণার পুত্ত্র বংশী তাহাদের সঙ্গে২ চলিয়া কএক পয়সা ঊর্দ্ধ্বে ফেলিয়া লুফিতেছে, তাহাতে সাধু ঐ পয়সা ধরিবার জন্যে যত্ন করিতেছে। প্রেমচাঁদ দৌড়িয়া তাহাদের নিকটে গেল, এবং বেত দিয়া সাধুকে দুই তিন ঘা মারিল, পরে তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া ঘরে আনিল।
সাধু বলিতে লাগিল, বাবা, বিরক্ত হইও না২! আমি সত্য বলিতেছি ইহাতে আমার কোন দোষ নাই। তাহার পিতা গভীর স্বরে কহিল, চুপ কর সাধু, তুমি আপন দোষ লুকাইতে চেষ্টা করিয়া কেবল পাপের বৃদ্ধি করিতেছ। তুমি দুষ্ট বালকের সহিত আলাপ করিয়া জুয়া খেলা শিখিতেছিলা, ইহাতে কি তোমার দোষ নাই?
এই কথাতে সত্যবতী কাঁদিতে২ তাহার ভ্রাতার গলা ধরিয়া বলিল, হায় দাদা! ঐ দুষ্ট বংশী যদি তোমার পয়সা কাড়িয়া না লইত, তবে এই সকল দুর্ঘটনা হইত না। বেত্রাঘাত বেদনা প্রযুক্ত সাধু কিছু মাত্র কাঁদে নাই, কিন্তু এখন তাহার ছোট ভগিনীর প্রেমিক ব্যবহার দেখিয়া সেও উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে লাগিল।
তখন প্রেমচাঁদ কহিল, সত্যবতি, তুমি এক পার্শ্বে বৈস, সাধুর সহিত আমার কিছু কথা আছে। ইহাতে সত্যবতী পিতার আজ্ঞা পালন করিয়া ফুলমণির বক্ষঃস্থলে হেলান দিয়া কাঁদিতে থাকিল। প্রেমচাঁদ সাধুকে জিজ্ঞাসিল, ঐ দুষ্ট বালকের সহিত কি জন্যে বেড়াইতেছিলা?
সাধু উত্তর করিল, আমি তাহার নিকটে যাই নাই বাবা; সে আমাদের নিকটে আসিয়া আমাদের সঙ্গে বেড়াইতে লাগিল। প্রেমচাঁদ বলিল, তবে তুমি তাহাকে একেবারে ছাড়িয়া কেন ঘরে দৌড়িয়া আইলা না? সাধু বলিল, ও পিতা, আমার পয়সা গুলিন তাহার নিকটে ছিল; আজি আমি পাঠশালায় পুরস্কারার্থে চারিটি পয়সা পাইলাম, সে পয়সা আমার হাতহইতে বংশী কাড়িয়া লইল। প্রেমচাঁদ কহিল, সাবধান হও সাধু, আমি না স্বচক্ষে দেখিলাম যে তুমি পয়সা লইয়া জুয়া খেলা করিতেছিলা? সাধু বলিল, না বাবা, আমি তাহা কখন করি নাই; বংশী তো বলিয়াছিল, আইস, আমরা সন্গরসন খেলা করি, তাহাতে তোমার কপালে যদি থাকে, তবে তুমি আপনার চারিটি সুদ্ধ আমার চারিটি পয়সাও লাভ করিতে পারিবা; কিন্তু আমি তাহা না করিয়া কেবল আপনার পয়সা পুনর্ব্বার তাহার হাত হইতে কাড়িয়া লইতে চেষ্টা করিতেছিলাম।
এই কথা শুনিয়া প্রেমচাঁদ বলিল, ভাল সাধু, আমি তোমাকে যেরূপ দোষী বোধ করিয়াছিলাম, তাহা তুমি নও, এই জন্যে ঈশ্বরের ধন্যবাদ হউক। তথাপি তুমি যে কোন কারণে ঐ দুষ্ট বালকের সহিত এক নিমেষ পর্য্যন্ত ছিলা ইহাতেই অবশ্য তোমার অপরাধ হইয়াছে, কেননা লেখা আছে; “পাপের ছায়াহ্ইতেও দূরে থাক।” এবং পয়সা পাইবার জন্যে যদি তোমাকে ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করিতে হয়, তবে সে পয়সা তখনি ছাড়িয়া দেওয়া উচিত; আরও দেখ, বংশী তোমাহইতে দ্বিগুণ বড় ও বলবান, অতএব তাহার নিকটহইতে তুমি বল করিয়া আপনার পয়সা পুনর্ব্বার লইতে কি প্রকারে আশা করিয়াছিলা? আমি তো বলি, পয়সা গিয়াছে, ভাল হইয়াছে।
সাধুর মাতাও সেই রূপ ভাবিয়া বলিল, ও সাধু, তুমি যদি একেবারে সে পয়সা ত্যাগ করিয়া ঘরে আসিতা, তবে ভালই হইত। তোমার পিতা তোমাকে কতবার বলিয়াছেন, যে বংশির সহিত কোন রূপে আলাপ করিও না। তুমি সুন্দররূপে জান, তাবৎ মন্দের মূল ধনাশা, তাহাতেও আমার ভয় হয়, তুমি ঐ পয়সা গুলিন অতিশয় প্রিয়জ্ঞান কর।
সাধু উত্তর করিল, না মা, আমি পয়সাকে প্রিয়জ্ঞান করি না, কিন্তু বংশী যে তাহা বলপূর্ব্বক আমার নিকটহইতে লইল, এই জন্যে আমি রাগ করিয়া পুনর্ব্বার আপনার পয়সা লইতে চেষ্টা করিলাম। মা, ইহাতে বল দেখি, বংশির ভারি দোষ হইয়াছে কি না?
ফুলমণি বলিল, তাহার দোষ অবশ্য থাকিবে, কিন্তু তদ্দ্বারা তুমি যে একেবারে নির্দোষী এমত বলা যায় না। তুমি আজি প্রাতঃকালে এই প্রার্থনা করিয়াছিলা, হে পরমেশ্বর, আমাকে পরীক্ষায় আনিও না; তথাপি তুমি আপনি পরীক্ষাস্থলে গেলা, এবং তোমার পিতা তোমাকে দেখিয়া যদি সেস্থানহইতে টানিয়া না আনিতেন, তবে কি জানি শেষে তুমি জুয়া খেলা করিতে আরম্ভ করিতা, এবং তাহার পরে অন্যান্য ভারি পাপে পতিত হইতা।
মাতার এই রূপ কথা শুনিয়া সাধু আর আপনাকে নির্দোষি করিতে চেষ্টা না করিয়া বলিল, ও বাবা, এবার আমাকে ক্ষমা করুন, আমি এমত কর্ম্ম আর করিব না।
তখন প্রেমচাঁদ ও ফুলমণি সাধুর হাত ধরিয়া তাহাকে ভিতরের কুঠরীতে লইয়া গেল। ইহাতে সত্যবতী সান্ত্বনা পাইয়া চক্ষের জল মুছিয়া আমাকে কহিল, মেম সাহেব, এখন বাপ মা সাধুর সহিত প্রার্থনা করিবেন, এবং ঈশ্বর যেন তাহাকে ক্ষমা করেন এই যাচ্ঞা করিবেন, তাহার পর তাঁহারা সকল চুকাইয়া দিয়া পুনর্ব্বার তাহাকে প্রেম করিবেন। আমরা যখনি কোন দোষ করি, তখনি বাপ মা এই রূপে আমাদের সহিত প্রার্থনা করেন।
হে বঙ্গদেশীয় খ্রীষ্টিয়ান পিতা মাতা সকল! তোমরাও যাইয়া তদ্রূপ কর।
আমি দেখিলাম, যে উক্ত ঘটনাদ্বারা প্রেমচাঁদ ও ফুলমণির মন কিছু অস্থির হইয়াছে, অতএব এখন বিদায় হওয়া ভাল বুঝিয়া আমি মিঠাই গুলিন সত্যবতীর হাতে দিয়া কহিলাম, তোমার পিতা মাতাকে আমার সেলাম দিও। ইহা বলিয়া আমি বাটীতে ফিরিয়া গেলাম।
ছেল্যাদের অমর আত্মাকে সুপথে লওয়ান, এই যে গুরুতর ভার ঈশ্বর পিতা মাতাগণের হস্তে অর্পণ করিয়াছেন, ইহা যদি তাহারা ভাল রূপে নির্বাহ করিত তবে কেমন আনন্দজনক হইত! হে পিতা ও মাতা সকল! তোমাদের সন্তানদের ভাল মন্দ শিক্ষার বিষয়ে তোমরা ঈশ্বরের সাক্ষাতে দায়ী হইবা, ইহা নিশ্চয় জ্ঞাত হও। অতএব আমি বিনতি করি, তোমরা আপনাদের প্রিয় ছেল্যাদিগকে শাসন কর, তাহাদের নিমিত্তে প্রার্থনা কর, তাহাদিগকে সাধ্য পর্য্যন্ত মন্দহইতে রক্ষা কর, কি২ পাপ ও কি২ পুণ্য ইহা তাহাদিগকে জ্ঞাত করাও, এবং বিশেষরূপে আপনারা এমত সদ্ব্যবহারী হও, যে তাহারা তোমাদের সৎক্রিয়া দেখিয়া তোমাদের অনুকারী হইতে সতত চেষ্টা করে।
ষষ্ঠ অধ্যায়
পর দিবস অতি প্রত্যূষে ছোট নবীন ও তাহার মাতা আমার ঘরে উপস্থিত হইল। আমি তখনি আমার দরজীকে বলিলাম, এই বালকের জন্যে শীঘ্র চারি যোড়া চাপ্কান ও পাজামা সিলাই কর। যখন দরজী চাপ্কান বানাইবার কারণ নবীনের গায়ের মাপ লইতে লাগিল, তখন আমি তাহার অহঙ্কার দেখিয়া হাস্য সম্বরণ করিতে পারিলাম না; কেননা সে দীনহীন বালক এক ছেঁড়া নেকড়া ব্যতিরেকে আর কোন বস্ত্র কখন পরে নাই, অতএব সে দরজীর হাতে সরু কাপড় এবং লাল সালু দেখিয়া বোধ করিল যে ইহা পরিয়া আমি একেবারে বাবু হইব।করুণা ভাবিতা ও মনোদুঃখিনী হইয়া নিরব থাকিল; কিন্তু খাটের চাদর গুলিন যখন ভাঁজ করিয়া ঘরে লইয়া যাইতেছিল, তখন সে বলিল, ও মেম সাহেব, আমি নবীনকে একেবারে আপনাকে দিলাম; সে আর আমার সন্তান নহে, এখন সে আপনকার হইল। তাহার বিষয়ে আমার আর কোন ভাবনা নাই; কেবল এই নিবেদন করি, যে আপনি আমার নিমিত্তে কখন২ ঈশ্বরের নিকটে প্রার্থনা করিবেন।
আমি উত্তর করিলাম, করুণা, যে দিবস তুমি ফুলমণির বাটীতে থাকিয়া তাহার গোলাপ চারা নষ্ট করিয়াছিলা, সেই দিবস অবধি আমি ঈশ্বরের স্থানে তোমার জন্যে প্রার্থনা করিতেছি; এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে তুমি ইহার পরে সত্য খ্রীষ্টিয়ান হইয়া আপন স্বামির সহিত সুখে বাস করিবা। এখন ভাল মনে পড়িল, সে কি কল্য রাত্রিতে ঘরে আসিয়াছিল?
করুণা বলিল, মেম সাহেব, কল্য কি সে আর আইসে? কিন্তু আজি সন্ধ্যার সময়ে সে আসিয়া পুনর্ব্বার ভোজনের নিমিত্তে ঝকড়া করিবে, তাহাতে ভাত যদি থাকে তবে ভাল, নতুবা আরবার আমাকে মার খাইতে হইবে।
আমি কহিলাম, অদ্য তোমার মার খাইবার কোন আবশ্যক নাই; তোমার কাছে তো একটা টাকা আছে, তাহাতে ভাল মাছ কিনিয়া সুন্দররূপে ব্যঞ্জন রাঁধিয়া রাখ। এখন আমার নিকটে এই প্রতিজ্ঞা কর যে এবার তুমি বাটী পরিষ্কার ও পরিপাটি করিবা, ও তোমার স্বামী ফিরিয়া আসিলে তাহার সহিত মিষ্ট কথা কহিয়া হাস্য মুখে সাক্ষাৎ করিবা; এমত করিলে সেও অবশ্য তোমার সহিত কোমল ব্যবহার করিবে। আমার এই কথা সত্য হয় কি না, তাহা দেখিও।
করুণা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, ভাল মেম সাহেব, আপনাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্যে আমি আপনকার পরামর্শ মতে চলিব; কিন্তু আমার স্বামী কখন ভাল হইবে না, তাহা আমি নিশ্চয় জানি।
আমি কহিলাম, এমত কথা বলিও না, চেষ্টাদ্বারা প্রায় সমস্ত কর্ম্মই সিদ্ধ হয়। আর ইহাও স্মরণে রাখিও, ঈশ্বরের অসাধ্য কিছুই নাই।
করুণা বিদায় লইয়া গেল, কিন্তু সে পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া বলিল, মেম সাহেব আমি বড় ভুলিয়াছি, প্যারীর ভারি ব্যামোহ হইয়াছে, এবং সে আমাকে বলিয়াছিল, যে তুমি ইহা মেম সাহেবকে জানাইয়া এমত নিবেদন করিও, যেন তিনি আমাকে দেখিতে একবার আইসেন।
ইহা শুনিয়া আমি বলিলাম, আহা! এই বিষয় পূর্ব্বে সম্বাদ পাইলে ভাল হইত। সে যাহা হউক, আজি সন্ধ্যাকালে আমি তাহাকে অবশ্য দেখিতে যাইব।
যে অবধি প্যারীর সহিত আমার জানা শুনা হইয়াছিল, সেই অবধি আমি বার২ তাহার ঘরে যাইতাম, এবং তাহার সহিত অনেক কথোপকথন করিতাম, তদ্দ্বারাই কেবল তাহার প্রতি আমার প্রেমের বৃদ্ধি হইত। অতএব সন্ধ্যাকাল উপস্থিত হইলে আমি প্যারীর নিমিত্তে কএকটি ডালিম আয়ার হাতে দিয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়া খ্রীষ্টিয়ানদের গ্রামে গেলাম।
আয়ার বিষয়ে কিছু লিখিতে হইল। সে পূর্ব্বে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্মের মধ্যে অনেক দোষ দেখাইত, কিন্তু যে অবধি ফুলমণির সহিত আমাদের পরিচয় হইয়াছিল, সেই অবধি দেখিলাম, যে ক্রমে২ সে কোন মিথ্যা আপত্তি না করিয়া অতিশয় নম্র হইয়াছে। আরও শুনিতে পাইলাম, যে সে আমার অজ্ঞাতসারে অনেকবার ফুলমণির গৃহে যাইয়া থাকে, এবং সাধু ও সত্যবতী যে তাহার বাসাতে নিত্য২ আসিয়া হালুয়া ও রুটী লইয়া যাইত, তাহা আমি স্বচক্ষে দেখিতাম। উক্ত সুলক্ষণদ্বারা এবং সকলের প্রতি আয়ার কোমল আচার ব্যবহার দেখিয়া আমি বোধ করিলাম, যে ঈশ্বরের আত্মা তাহার মনেতে আপন বাক্যরূপ বীজ ক্রমে২ অঙ্কুরিত করিতেছেন। কিন্তু এমত দেখিলেও আমি সে বিষয়ে আয়াকে তখন কিছু বলিলাম না; কেননা পূর্ব্বে যখন তাহাকে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্মের বিষয়ে কোন কথা কহিতাম, তখন সে আমাকে আপন কর্ত্রী জানিয়া ভয় প্রযুক্ত কখন২ সকল কথায় মৌখিক স্বীকার করিত, কিন্তু বাস্তবিক তাহার মনেতে অনেক প্রকার আপত্তি থাকিত। ইহা জানিয়া আমি বোধ করিলাম, যে আমা অপেক্ষা ফুলমণি ও তাহার ছেল্যারা আয়ার পক্ষে উত্তম শিক্ষক হইবে। কিন্তু সে যেন খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম মনোনীত করে, এই অভিপ্রায়ে আমি সর্ব্বদা তাহাকে প্যারীর ন্যায় প্রকৃত ধার্ম্মিক খ্রীষ্টিয়ানদের নিকটে লইয়া যাইতে চেষ্টা করিতাম; কারণ আমি ভালরূপে জ্ঞাতা আছি যে লোকেরা আমাদের কথাদ্বারা নয়, বরং ভাল কর্ম্মদ্বারা ধর্ম্মের বিষয়ে সত্য শিক্ষা প্রাপ্ত হয়।
পরে আমি প্যারীর ঘরে উপস্থিতা হইয়া দেখিলাম, ফুলমণি দাবায় বসিয়া আপন বৃদ্ধা বন্ধুর জন্যে কিছু সাগুদানা পাক করিতেছে। বৃদ্ধা প্যারী পীড়া প্রযুক্ত অতিশয় দুর্বলা হইয়াছিল, তথাপি সে আমাকে দেখিবামাত্র প্রফুল্ল বদনে কহিতে লাগিল, মেম সাহেব, আমার এই পীড়া কখন ভাল হইবে না; বোধ হয়, এই বার আমি আপন স্বর্গস্থ পিতার বাটীতে যাইব।
তখন আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, প্যারি, যদি ঈশ্বরের এমত ইচ্ছা হয়, তবে তুমি যাইতে আহ্লাদিতা হও কি না?
সে উত্তর করিল, আহা! স্বর্গে যাইতে অবশ্য আহ্লাদিতা আছি। মেম সাহেব দেখুন, আমি হেথায় এই ক্ষুদ্র কুঁড়ে ঘরে বাস করি, সেথায় যীশুর সহিত রাজত্ব করিব; হেথায় আমি দুর্বল শরীর প্রাপ্তা হইয়া পাপিষ্ঠ স্বভাব প্রযুক্ত নিত্য২ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অপরাধ করি, সেথায় এই নশ্বর শরীর অনশ্বরতারূপ বস্ত্র পরিধান করিলে আমি ঈশ্বরের সিংহাসনের সম্মুখে নির্দোষী হইয়া দাঁড়াইব। আহা মেম সাহেব! স্বর্গেতে পাপ নাই, অতএব যে স্থানে পাপ নাই সে কেমন সুখের স্থান হইবে!
আমি বলিলাম, হাঁ প্যারি, এ কথা সত্য বটে, কেননা এই পৃথিবীতে পাপ তাবৎ দুঃখের মূল; কিন্তু একটি কথা জিজ্ঞাসা করি, তুমি মৃত্যুছায়ারূপ উপত্যকার মধ্য দিয়া গমন করিতেছ, অতএব যে প্রভু তোমাকে পাপের বশহইতে রক্ষা করিয়া স্বর্গ লাভের আশা দিয়াছেন, তুমি কি এখন তাঁহাকে অতিশয় প্রিয়জ্ঞান কর?
প্যারী বলিল, আহা! মেম সাহেব, আমার ত্রাণকর্ত্তা দশ সহস্র জনের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি সর্ব্বতোভাবে মনোহর; তিনি আমার সহিত থাকিয়া আমাকে সান্ত্বনা করিতেছেন, ও তাঁহার মৃত্যু ব্যতিরেকে আমার আর কোন ভরসা নাই। হে যীশু! ধন্য২ তোমার নাম, যে হেতুক তুমি আপন বহুমূল্য রক্তদ্বারা আমাকে শয়তানের হস্তহইতে ক্রয় করিয়াছ। হে যীশু! তোমার কেমন আশ্চর্য্য প্রেম; সেই প্রেমের কি পর্য্যন্ত দীর্ঘতা ও প্রশস্ততা ও গভীরতা এবং উচ্চতা, তাহা কে বর্ণনা করিতে পারে?
প্যারী অতিশয় উৎসাহ পূর্ব্বক এই সকল কথা কহাতে বলহীনা হইয়া বালিশে পড়িল, ইহা দেখিয়া আমার আয়া তাহার জন্যে একটি ডালিমের দানা খুলিয়া দিতে লাগিল। প্যারী আয়ার হাতহইতে সেই ডালিম লইল, পরে তাহার মুখের প্রতি তাকাইয়া অতিশয় চিন্তিতা হইয়া বলিল, আয়া গো! তুমি বুঝি খ্রীষ্টিয়ান নও? আয়া বলিল, না, আমি মুসলমান।
ইহা শুনিয়া ঐ বৃদ্ধা স্ত্রী উঠিয়া বসিয়া বলিল, ও গো আয়া! তুমি যদি খ্রীষ্টিয়ান নও, তবে আমার কথা শুন। আমার অবশিষ্ট যৎকিঞ্চিৎ বল আছে, তদ্দ্বারা আমি এই সাক্ষ্য দিব, যে প্রভু যীশু খ্রীষ্ট সত্য ত্রাণকর্ত্তা, আর আমি যে তোমার সাক্ষাতে ইহা বলিতে সুযোগ পাইলাম তাহার নিমিত্তে ঈশ্বরের ধন্যবাদ করিব। আয়া আমার প্রতি দৃষ্টি কর, দুই তিন দিনের মধ্যে লোকেরা আমাকে কবর দিতে লইয়া যাইবে, কিন্তু তাহাতে আমার কোন ভয় জন্মিতেছে না; বরং আমাকে যদি কেহ এই জগতে থাকিবার হেতু লোভ দেখাইয়া সহস্র২ টাকা দেয়, তথাপি আমি মরিতে ইচ্ছা করি। কি জন্যে আমার এমন ইচ্ছা আছে, তাহাও বলি। আমি যে কোন ধর্ম্ম কর্ম্ম করিয়া স্বর্গ লাভ করিয়াছি তাহা নয়। ও আয়া! তোমাদের কোরাণে এই রূপ লেখা আছে, তোমরা ধর্ম্ম কর্ম্ম করিও তাহাতে স্বর্গ প্রাপ্ত হইবা; কিন্তু যদি পাপ কর, তবে নরকে নিক্ষিপ্ত হইবা। এই উপায় ভিন্ন মুসলমানদের মধ্যে ত্রাণ পাইবার আর কোন উপায় নাই। অতএব আয়া, তুমি বুঝিয়া দেখ, এমত কঠিন আদেশ ধরিয়া ঈশ্বর যদি আমাদের বিচার করেন, তবে কে তাঁহার সম্মুখে নির্দোষী হইবে? তুমি এবং আমি সে বিচারস্থানে কখন দাঁড়াইতে পারিব না, কেননা সকলেই পাপ করাতে ঈশ্বরের নিকটে দোষী হইয়াছে। আমরা আপনাআপনি কোন ভাল কর্ম্ম করিতে পারি না, অতএব মনুষ্যেরা যাহা করিতে অক্ষম এমত কর্ম্ম না করিলে তোমাদের পয়গম্বর তাহাদিগকে স্বর্গ দিতে পারেন না। যদি কেহ এক জন খোঁড়া ব্যক্তিকে বলে, তুমি এখনি লম্ফ দিয়া বেড়াও, না বেড়াইলে তোমাকে কাটিয়া ফেলিব; কিম্বা এক জন অন্ধকে যদি বলে, তুমি নিকটস্থ অট্টালিকা দেখিয়া তাহার একটি অবিকল নক্সা তুলিয়া দেও, না দিলে তোমার প্রাণ নষ্ট করিব; বিবেচনা কর, ঐ মনুষ্যেরা প্রাণের ভয়ে কি লম্ফ দিতে কিম্বা নক্সা তুলিতে পারিবে? কখন না; সুতরাং তাহারা উক্ত কর্ম্ম করিতে আপনাদিগকে অশক্ত জানিয়া মরিতে প্রস্তুত হইবে। সেই রূপে মহম্মদ পয়গম্বর ভাল কর্ম্ম বিনা তোমাদিগকে আর কোন ত্রাণের উপায় দেখাইতে পারেন নাই, অতএব যদি তোমাহইতে নিশ্চিদ্র ধর্ম্মকর্ম্ম না হয়, তবে নরকযন্ত্রণা ভুগিতে প্রস্তুত থাকিও। কিন্তু আর একটি কথাও আছে; কোন২ মুসলমানেরা বলিয়া থাকে, পরমেশ্বর অতিশয় দয়ালু, অতএব তিনি আমাদের পাপ সকল ক্ষমা করিবেন। ইহাতে আমি বলি, পরমেশ্বর যদি প্রায়শ্চিত্ত বিনা একটিও পাপ ক্ষমা করেন, তবে তাঁহার এক প্রধান গুণ নষ্ট হয়। সেই গুণ কি? ন্যায় বিচার। ইহার দৃষ্টান্ত বলি, শুন; এই জেলার জজ সাহেব চোর ডাকাইতদের ক্রন্দন ও বিলাপ শুনিয়া যদি এক জনকেও ছাড়িয়া দিতেন, তবে কি লোকেরা তাঁহার প্রশংসা করিত? না, কোন প্রকারেই নয়। বরং তাঁহাকে অকর্মণ্য বিচারকর্ত্তা বুঝিয়া কোম্পানির নিকটে এই আবেদন করিত, আমাদের গ্রামে এক জন ভাল জজ সাহেবকে পাঠাইয়া দিউন, নতুবা দস্যুদের দল ক্রমে২ বৃদ্ধি হইবে। ইহাতে সুন্দররূপে বোধ হইতেছে যে স্বর্গের ও পৃথিবীর মহৎ বিচারকর্ত্তা অন্যায় পূর্ব্বক কখনও কাহার পাপ ক্ষমা করিবেন না।
এই সকল কথা বলিবার সময়ে আয়া প্যারীর প্রতি তাকাইয়া অতি মনোযোগ পূর্ব্বক শুনিল; কিন্তু আমি দেখিলাম যে প্যারী বড় দুর্বলা হইতেছে, এই জন্যে তাহাকে ক্ষান্তা হইতে বলিলাম। কিন্তু সে বলিল, না মেম সাহেব, ক্ষান্তা হইব না। আমি আয়াকে কেবল মুসলমান ধর্ম্মের দোষ দেখাইয়াছি, অতএব এখন আমাকে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্মের মহৎ গুণ প্রকাশ করিতে দিউন।
সে সময়ে ফুলমণি সাগু রাঁধিয়া ভিতরে আনিলে প্যারী তাহা কিছু খাইয়া সবল হইল। পরে সে বলিতে লাগিল, শুন আয়া, শুন! যীশু খ্রীষ্ট ঈশ্বরের পুত্ত্র, তিনি স্বয়ং ঈশ্বর, এবং দয়ার সাগর; অতএব তিনি জানিলেন যে সকল মনুষ্যেরা পাপিষ্ঠ স্বভাব প্রযুক্ত ঈশ্বরের আজ্ঞা পালন করিতে না পারিয়া নরকে পতিত হইবে; অতএব তিনি যেন আপন প্রাণ দিয়া পাপি লোকদের প্রায়শ্চিত্ত করিতে পারেন, এই অভিপ্রায়ে তিনি স্বর্গহইতে নামিয়া মনুষ্যদেহ ধারণ করিলেন। তিনি স্বয়ং ধার্ম্মিক হইয়া অধার্ম্মিকদের পরিবর্ত্তে প্রাণদণ্ড ভোগ করিলেন। আরো কহি, খ্রীষ্ট ভিন্ন এমত মহৎ প্রায়শ্চিত্ত কোন মনুষ্য করিতে পারে না, কারণ প্রত্যেক মনুষ্যকে আপন২ পাপের হিসাব দিতে হইবেক। স্বর্গের দূতেরাও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে পারে না, কেননা দূতেরা ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রাণী মাত্র। কিন্তু যীশু খ্রীষ্ট জগতের তাবৎ দেশীয় লোকদিগকে রক্ষা করিতে চাহিলেন, এই জন্যে তাঁহার যে প্রাণ কোটি২ লোকদের প্রাণহইতেও বহুমূল্য তাহা তিনি উৎসর্গ করিয়া ঈশ্বরের নিকটে আমাদিগের সকল পাপরূপ ঋণ আদায় করিলেন। ও আয়া! এমত আশ্চর্য্য প্রেম কোথা পাইবা?
যীশুর প্রেমের তুলনা দিব কিসে?
খুজিলে এমন মিলিবে না কোনো দেশে!
যীশু আপন শত্রুদের নিমিত্তে মরিলেন; যে কোন ব্যক্তি ইহা স্বীকার করিয়া এমত প্রার্থনা করে, হে ঈশ্বর! আমি দীনহীন ও পাপী, কেবল যীশুতে আমার বিশ্বাস আছে, তিনি আমার ধার পরিশোধ করিয়াছেন, অতএব এখন তাঁহার গুণের নিমিত্তে আমার পাপ মার্জনা কর; ঈশ্বর সেই ব্যক্তির পাপ সকল ক্ষমা করত তাহাকে পুণ্যবান জ্ঞান করিয়া গ্রাহ্য করেন।
পরে প্যারী আয়াকে উৎসাহ পূর্ব্বক বলিল, ও আয়া, তুমি খ্রীষ্টিয়ান হও! যীশুর উপরে বিশ্বাস কর; তিনি যে তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছেন তাহা স্বীকার কর। তিনি তো আমারই পাপের ভার লইয়াছেন, তাহা আমি নিশ্চয় জানি, এই জন্যে আপন বিচারকর্ত্তার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আমার কিছু ভয় নাই। তিনি আমাকে দোষি করিবেন না, কেননা তিনি আমার ত্রাণকর্ত্তা, ও আমার দোষের নিমিত্তে পূর্ব্বে দণ্ড ভোগ করিয়াছেন। না আয়া, আমি ভয় করি না, বরং উল্লাসিতা হই, কারণ যীশু অবশ্য আমাকে এই কথা কহিবেন, আইস হে আমার পিতার অনুগ্রহের পাত্র, তোমার জন্যে জগতের পত্তন অবধি যে রাজ্য প্রস্তুত করা গিয়াছে তাহার অধিকারিণী হও। ও আয়া, স্বর্গেতে তোমার সহিত যেন আমার সাক্ষাৎ হয়, ইহা আমি অতিশয় অভিলাষ করিতেছি।
আয়া এই কথা শুনিয়া বড় ক্রন্দন করিতে২ বলিল, ওগো মা, তুমি ও ফুলমণি ও ফুলমণির ছোট ছেল্যারা পর্য্যন্ত সকলে মিলিয়া আমাকে প্রায় খ্রীষ্টিয়ান করিলা; কিন্তু আমি খ্রীষ্টিয়ান হইব কি না, তাহা এখন বলিতে পারি না। সে যাহা হউক, তোমার মৃত্যুর ন্যায় যদি আমারও মৃত্যু হয়, তবে আমার বড় সৌভাগ্য।
প্যারী বলিল, ও গো আয়া! যদি ধার্ম্মিক লোকদের ন্যায় সুস্থির মনা হইয়া মরিতে বাঞ্ছা কর, তবে বিশ্বাস কর। এই কথা বলিয়া সে অচৈতন্য হইয়া বালিশের উপরে পড়িল।
তখন আমি প্যারীর ব্যামোহের বিষয় ফুলমণিকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম, তাহাতে সে বলিল; মেম সাহেব, আপনি কল্য ঘরে গেলে পর প্যারী আমাকে ডাকিয়া পাঠাইল। আমি এখানে আসিয়া দেখিলাম, সে সমস্ত দিন জ্বর ভোগ করিয়াছে, তথাপি কাহাকে কিছু বলে নাই। তাহাতে আমি পাদরি সাহেবের নিকটে সমাচার দিবার জন্যে তখনি সাধুর বাপকে পাঠাইয়া দিলাম। সাহেব প্যারীর ধার্ম্মিক আচরণের বিষয় এখানকার ইংরাজ ডাক্তর সাহেবকে বলাতে তিনি অদ্য প্রাতঃকালে আসিয়া তাহাকে অনেক প্রকার ঔষধাদি দিয়াছিলেন বটে; কিন্তু তিনি পাদরি সাহেবকে বলিলেন, প্যারী অতিশয় বৃদ্ধা হইয়াছে, বোধ হয় সে এই পীড়াহইতে সুস্থ হইতে পারিবে না। ফুলমণি আরো বলিল, পাড়ার প্রায় সকল স্ত্রীলোকেরা অদ্য এখানে আসিয়া প্যারীর কিছু কর্ম্ম করিয়া দিয়াছে, তাহাতে সে এক মুহূর্ত্তও একাকী থাকে নাই; কল্য আমি সমস্ত রাত্রি তাহার নিকটে ছিলাম, এবং অদ্য রাত্রিতে রাণী আসিয়া এখানে থাকিবে, ইহা সে আমাকে বলিয়াছে।
রাণীর কথা শুনিয়া আমি জিজ্ঞাসিলাম, ফুলমণি, রাণী এখন কি রূপ ব্যবহার করিতেছে? আমি প্রায় তাহাকে দুই মাস পর্য্যন্ত দেখি নাই।
ফুলমণি বলিল, মেম সাহেব, রাণী এখন অতি উত্তম আচার ব্যবহার করিতেছে; বোধ হয় সে নূতন জন্ম প্রাপ্ত হইয়া সত্য খ্রীষ্টিয়ান হইল। সে আমাকে অনেক বার বলে, মেম সাহেবের শিক্ষাদ্বারা আমার বিস্তর উপকার হইয়াছে। এবং মেম সাহেব, কেবল রাণীর উপকার হইয়াছে তাহা নয়, এই গ্রামের মধ্যে অনেক লোক আপনকার উপদেশ শুনিয়া পূর্ব্বাপেক্ষা এখন ধর্ম্মের বিষয়ে কিছু২ মনোযোগ করিতেছে।
আমি উত্তর করিলাম, আমাদের নয়, কিন্তু পরমেশ্বরের অনুগ্রহ ও সত্যতার নিমিত্তে তাঁহার নামের মহিমা বৃদ্ধি হউক! তথাপি ফুলমণি, তোমাকে খোশামদ করিতে না চাহিলেও আমি এই কথা বলিব; যে স্থানে আমি ধর্ম্মরূপ বীজ বপন করিয়াছি, সে স্থানে তুমি যদি উত্তম পরামর্শ ও প্রার্থনারূপ জল সেচনদ্বারা তাহা সিক্ত না করিতা, তবে বোধ হয় সে বীজ অঙ্কুরিত না হইয়া নষ্ট হইত। হায়! আমাদের বাঙ্গালা দেশস্থ মণ্ডলীগণের মধ্যে যদি অনেক থার্ম্মিকা স্ত্রীলোক থাকিত, তবে তাহাদের দ্বারা খ্রীষ্টিয়ান লোকদের সংখ্যা কেমন শীঘ্র বৃদ্ধি হইত! যে স্ত্রীলোকেরা অজ্ঞান ব্যক্তিদের শিক্ষা দিতে ও দুর্বল শিষ্যগণের সাহায্য করিতে পারে, মণ্ডলীর মধ্যে এমত স্ত্রীলোকদের অভাব আছে। হিন্দুদের সহিত আমাদের প্রতিদিন সাক্ষাৎ হয়, অতএব তাহাদিগকে কিছু শিক্ষা দেওয়া খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকদের উচিত। তাহারা যদি এমত করিত, তবে বোধ হয় হিন্দুরা ইংরাজদের কথা অপেক্ষা স্বদেশীয় লোকদের কথা উত্তমরূপে শুনিত; সুতরাং তাহারা মনে২ করিবে, পূর্ব্বে ইহারা আমাদের ন্যায় হিন্দু ছিল, এখন বুঝি পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছে যে নূতন ধর্ম্ম পুরাতন ধর্ম্মহইতে উত্তম।
ফুলমণি বলিল, মেম সাহেব, একথা সত্য। কিন্তু এই দুঃখের বিষয় যে মণ্ডলীর মধ্যে অনেক স্ত্রীলোকেরা ধর্ম্মকে প্রিয়জ্ঞান করে না, তবে তাহারা পরকে কি প্রকারে শিক্ষা দিবে? খ্রীষ্টধর্ম্ম কেমন সুমিষ্ট ইহা যদি আপনারা আস্বাদন করিয়া দেখিত, তবে তাহারা অবশ্য অন্য লোকদিগকে সেই পথে আনিতে চেষ্টা করিত। আ মেম সাহেব! চিকিৎসকদ্বারা ভয়ানক রোগহইতে মুক্ত হইয়া পরের নিকটে তাহার প্রসংশা না করে, এমত কোন্ ব্যক্তি আছে? তেমনি যে মনুষ্য মহাচিকিৎসক কর্ত্তৃক পাপ রূপ রোগহইতে উদ্ধার হইয়া মনের সান্ত্বনা পাইয়াছে, সেই মনুষ্য অন্য পাপি লোকদের নিকটে তাঁহার গুণ অবশ্য কীর্ত্তন করিবে। অতএব যদি শুনিতে পাই যে অমুক খ্রীষ্টিয়ান ধর্ম্মের বিষয়ে কাহাকে কিছু বলে না, তবে আমি মনে২ ভাবি সে ব্যক্তি কোন প্রকারে প্রকৃত খ্রীষ্টিয়ান নহে।
আমি কহিলাম, ফুলমণি, তুমি ভাল বলিয়াছ; কেননা যদ্যপিও কোন২ খ্রীষ্টিয়ানেরা ভীরু স্বভাবপ্রযুক্ত ধর্ম্মের বিষয়ে কথা কহিতে কিছু ভয় করে, তথাপি যখন পাপিরা প্রকাশ রূপে ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে, তখন এমত ভীরু ব্যক্তিগণও চুপ করিয়া থাকিতে পারে না।
আমাদের কথোপকথনের সময়ে বৃদ্ধা প্যারী ঘোরতর নিদ্রা গিয়াছিল; অতএব তাহার ভাল সেবা হইতেছে, ইহা দেখিয়া আমি কেবল তাহার সুখাদ্য সামগ্রী কিনিবার কারণ ফুলমণির হাতে দুইটি টাকা দিয়া বিদায় হইলাম। পথের মধ্যে যাইতে২ আমি ইহা ভাবিলাম, যীশু আপন লোকদিগের প্রতি যে অঙ্গীকার করিয়াছেন, “আমি তোমাদের স্থানে শান্তি রাখিয়া যাইতেছি, আমি নিজের শান্তি তোমাদিগকে প্রদান করিতেছি, জগতের লোক যেমন দান করে আমি তদ্রূপ দান করি না; তোমরা মনোদুঃখী ও ভীত হইও না,” যোহন ১৪।২৭। এই অঙ্গীকার তাঁহার দাসীর প্রতি কেমন আশ্চর্য্যরূপে সফল হইতেছে।
পরে করুণার ঘর দিয়া আমাকে যাইতে হইল, অতএব তাহার স্বামী ফিরিয়া আসিয়াছে কি না, ইহা দেখিতে আমি ভিতরে গেলাম। তথায় গিয়া দেখিলাম, বংশির পিতা দাবায় ভোজন করিতেছে, এবং তাহার স্ত্রী তাহার নিকটে বসিয়া নবীনের কর্ম্মের বিষয়ে এবং আমার বড় কোঠা ঘরের বিষয়ে তাবৎ বৃত্তান্ত কহিতেছে। আমাকে দেখিবা মাত্র করুণা শীঘ্র উঠিয়া একটা নূতন মোড়া বাহিরে আনিয়া বলিল, মেম সাহেব, আপনি যে টাকাটি দিয়াছিলেন, তাহা ভাঙ্গাইয়া চারি পয়সা দিয়া প্রথমে এই মোড়াটি কিনিলাম, যেন আপনি এখানে আইলে বসিবার স্থান পান।
এ ক্ষুদ্র বিষয় ছিল বটে, তথাপি ইহা শুনিয়া আমি বড় সন্তুষ্টা হইলাম, কেননা তদ্দ্বারা জানা গেল যে করুণা আমাকে দেখিতে অতিশয় ইচ্ছুক আছে। কিন্তু তাহার স্বামির সহিত অদ্য মিলন হইয়াছে, অতএব তাহাদের কাছে থাকা এখন আমার উচিত নয়, ইহা ভাবিয়া আমি সেই দিনে তাহার ঘরে বসিতে স্বীকৃতা হইলাম না। আমি করুণাকে বলিলাম, তোমার নবীন আমার ঘরে থাকিতে সন্তুষ্ট আছে; আমি যখন বাহিরে আইসি তখন দেখিলাম সে মসাল্চির নিকটে ছুরি কাঁটা পরিষ্কার করিতে শিখিতেছে। ইহা বলিয়া আমি ঘরে ফিরিয়া গেলাম।
করুণার ব্যবহার পূর্ব্বাপেক্ষা কিঞ্চিৎ ভাল হইয়াছে, ইহা দেখিয়া আমার মন অতিশয় আনন্দযুক্ত হইল, এবং তাহার নিমিত্তে আমি ঈশ্বরের স্থানে এই প্রার্থনা করিলাম, হে পরমেশ্বর, আপন দাসীর প্রতি তোমার কর্ম্ম সিদ্ধ কর, তুমি আপন হস্তকৃত কর্ম্ম পরিত্যাগ করিও না। কিন্তু ঈশ্বর কিরূপ ভয়ানক এবং দুঃখজনক ঘটনাদ্বারা করুণার প্রতি আমার এই প্রার্থনা সফল করিবেন, তাহা আমি তখন জানিলাম না।
পর দিবস প্রত্যূষে উঠিয়া আমি আপন রীত্যনুসারে ঘরহইতে বাহিরে আসিয়া বায়ু সেবনার্থে গাড়ীতে আরোহণ করিতেছি, এমন সময়ে ছোট নবীন অতিশয় ক্রন্দন করিতে২ আমার নিকটে আসিয়া বলিল; ও মেম সাহেব, আমাকে ঘরে যাইতে ছুটি দেও। আমাদের পাড়ার এক জন ছেল্যা আমাকে এখনই বলিল, কাল রাত্রির মধ্যে দাদা জলে ডুবিয়া মরিয়াছে। ইহা শুনিয়া আমি ঐ অধার্ম্মিক ও দুষ্ট বালকের ব্যবহার স্মরণ করিয়া পরকালে তাহার কি দুর্গতি হইবে ইহা ভাবিয়া অতিশয় কম্পান্বিতা হইলাম; কিন্তু সে বিষয় নবীনকে কিছু না বলিয়া আমি তাহাকে গাড়ীতে চড়িয়া কোচ্মানের নিকটে বসিতে কহিলাম, এবং কোচ্মানকে খ্রীষ্টিয়ান পাড়াতে শীঘ্র গাড়ী চালাইতে আজ্ঞা করিলাম।
পরে আমি করুণার বাটীতে পৌঁছিয়া দেখিলাম তথায় বড় জনতা হইয়াছে, আর তাহাদের সহিত কএক জন চৌকিদার ও বরকন্দাজ দাঁড়াইয়া আছে। সকলে অতিশয় গোল করিয়া ডাকাইতি, খুন ও চৌর্য্যের বিষয়ে কথোপকথন করিতেছিল। এক জন বলিল, বা! খ্রীষ্টিয়ানদের মধ্যে না কি ধর্ম্ম আছে, তবে তাহারা এমত কর্ম্ম কেন করে?
নবীন পৌঁছিবা মাত্র একেবারে দৌড়িয়া ঘরের ভিতরে গেল; কিন্তু আমি জনতার মধ্যে প্রবেশ করিতে অনিচ্ছুক ছিলাম, এই জন্যে এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া ঐ গোলমালের কারণ জ্ঞাত হইবার নিমিত্তে এক জন বরকন্দাজকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, এই খ্রীষ্টিয়ানদের পুত্ত্র কি ডুবিয়া মরিয়াছে?
তাহাতে বরকন্দাজ কহিল, হাঁ মেম সাহেব, তাহার মৃত দেহ আজি প্রাতঃকালে ঘরে আনা গিয়াছে। কাল রাত্রিতে এক জন হিন্দুলোক ঐ ছেল্যাকে সঙ্গে লইয়া মহেন্দ্র বাবুর ঘরে সিঁধ কাটিয়া প্রবেশ করিয়াছিল। বোধ হয় বংশী তাহাকে পথ দেখাইবার জন্যে গিয়াছিল, কেননা সে বাবুর এক জাতি হওয়াতে তাঁহার গৃহের সমুদয় সন্ধান জানিত। সে যাহা হউক, তাহারা দুই জনে প্রবেশ করিয়া বাবুর স্ত্রীর সকল গহনা খুলিতে লাগিল। সে তখন নিদ্রিতা ছিল, কিন্তু চেতনা পাইয়া চীৎকার শব্দ করিয়া উঠিল, তাহাতে এক জন চোর তাহার কুক্ষিদেশে আঘাত করিল; এমত সময়ে বাবুও জাগিয়া উঠিয়া চোরদিগকে ধরিতে চেষ্টা করিলে তাহারা পলাইয়া গেল, কিন্তু বাবুও বাহির হইয়া তাহাদের পশ্চাৎ২ দৌড়িলেন। কল্য রাত্রিতে ঘোরতর কুজ্ঝটিকা হইয়াছিল, অতএব মাঠের মধ্যে কিছুই দৃশ্য হয় নাই; কেবল সে স্থানে চোরদের গমনের শব্দ শুনিয়া বাবু তাহা লক্ষ্য করিয়া তাহাদের পশ্চাৎ২ যাইতে লাগিলেন। দৌড়িতে২ এক জন অকস্মাৎ জলে পড়িল, এমত শব্দ হওয়াতে বাবু জানিতে পারিলেন, মাঠের বড় পুষ্করিণীর ধারে আসিয়াছি। অন্য চোরও পাকা ঘাটের শিঁড়িতে আছাড় খাইয়া পড়িল, তাহাতে বাবু তখনি তাহাকে ধরিলেন; এমত সময়ে আমরা উপস্থিত হইয়া তাহাকে থানায় লইয়া গেলাম। কল্য রাত্রিতে আমরা বোধ করিয়াছিলাম, যে ব্যক্তি জলে পড়িল সে অবশ্য সাঁতার দিয়া পলায়ন করিয়াছে; কিন্তু আজি প্রাতঃকালে তাহার মৃত দেহ উক্ত পুষ্করিণীতে ভাসিয়া উঠিল, এবং তাহার বাপ আসিয়া তাহাকে আপন পুত্ত্র বলিয়া ঘরে আনিল। সে বলে, আমার ছেল্যা যে চুরি করিতে গিয়াছিল, তাহা আমি কিছু জানি না; সে যাহা হউক, তাহাকে একবার মাজিষ্ট্রেট সাহেবের সাক্ষাতে লইয়া যাইতে হইবে। আমরা যে চোরকে থানায় রাখিয়াছি, যদি সাহেব তাহাকে একেবারে ফাঁসি দিতে আজ্ঞা দেন তবে বড় ভাল হয়; কেননা সে একবার পাঁচ বৎসর পর্য্যন্ত কয়েদ ছিল, তথাপি সে কোন প্রকারে শিক্ষা পায় নাই। বাবুর স্ত্রী এমত আঘাতিতা হইয়াছে যে তাহার বাঁচা ভার, তাহাতে প্রাণের ভয়ে ঐ দুষ্ট বলে, আমি তো তাহাকে কাটি নাই, বংশী তাহা করিয়াছে। কিন্তু এ কথা নিতান্ত মিথ্যা বোধ হয়, কেননা বংশী ছেল্যা বই তো না, মানুষকে খুন করিতে কখন তাহার সাহস হয় না। অতএব স্পষ্ট বোধ হইতেছে যে তাহার সঙ্গি লোক ঐ কর্ম্ম করিয়াছে।
বরকন্দাজের নিকটে এই রূপ খেদজনক সমাচার পাইয়া করুণার অসহ্য দুঃখ আমি কি প্রকারে দেখিব, ইহা ভাবিতে লাগিলাম। ঘরের ভিতরহইতে তাহার ক্রন্দন ও বিলাপের শব্দ স্পষ্ট রূপে আমার কর্ণগোচর হুইল, অতএব সে দিন অমনি বাটী ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করিলাম, কিন্তু শেষে আমি মনে ভাবিলাম, এমত করা অকর্ত্তব্য, কারণ এখন করুণা দুঃখে পড়িয়াছে; এই জন্যে যদ্যপিও তাহার নিকটে যাওয়াতে আমার ক্লেশ হয়, তথাপি তাহাকে সান্ত্বনা করা উচিত হইয়াছে।
এই দুর্ঘটনা যদি এক বৎসর পূর্ব্বে হইত, তবে করুণার মনে এত দুঃখ জন্মিত না; কেবল সাধারণ পুত্ত্রশোকের মত তাহার শোক হইত, এবং তাহার ছেল্যা চোররূপে ধরা পড়াতে তাহার অখ্যাতি হইল, কি জানি ইহাতেও তাহার দুঃখ জন্মিত; কিন্তু পরলোকে তাহার দুর্গতির বিষয়ে সে তখনই কোন চিন্তা করিত না। এখন তাহার মনরূপ চক্ষু কিছু প্রসন্ন হইয়াছিল, ইহাতে সে ধর্ম্মজ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া আপন পুত্ত্রকে যে শিক্ষা দেয় নাই, এ বিষয়ে বড় ভাবিতা হইল।
আমি করুণাকে দেখিবা মাত্র বোধ করিলাম, সে অবশ্য হতজ্ঞান হইয়াছে, কেননা মনের অসহ্য যন্ত্রণাদ্বারা সে আপন কেশ ছিঁড়িয়া বলিতে লাগিল, কে বলে যে আমার ছেল্যা হত্যাকারী? না না, সে হত্যাকারী নয়, আমিই হত্যাকারী; আমাকে মাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকটে লইয়া যাও, তিনি আমাকেই ফাঁসি দিউন। পরমেশ্বরের সাক্ষাতে আমি নরহত্যা করিয়াছি, অতএব তিনি যদি আমাকে একেবারে নরকে ফেলিয়া দেন, তবে তাহা আমার উপযুক্ত শাস্তি হয় বটে। হায়! আমি মা হইয়া আপন ছেল্যার শরীর ও আত্মা উভয় নষ্ট করিয়াছি। আমি তাহাকে গন্তব্য পথে চলিতে শিক্ষা দিই নাই, ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করিতে নিষেধ করি নাই; প্রথমে তাহার মনেতে রাগ, দ্বেষ, লোভাদি প্রবল হইতে দিয়াছিলাম, শেষে তাহাকে কোন প্রকারে উগরাইয়া ফেলাইতে পারিলাম না। সে আমার নিকটে পয়সা চুরি করিত, ও আপন ছোট ভাইয়ের প্রতি অন্যায় করিত, তথাপি আমি স্নেহ প্রযুক্ত তাহাকে একবারও বলি নাই, যে এ সকল করিলে তোমাকে নরকে যাইতে হইবে! হায়! ইহাকে কি প্রেম বলা যায়? ধিক্ এমত মিথ্যা প্রেম! তদ্দ্বারা আমার ছেল্যা নষ্ট হইল। হায়২! আমি কি কিরব? লোকদের প্রতি চক্ষুঃ তুলিয়া আর দেখিতে পারিব না; এবং ঈশ্বরের নিকটে প্রার্থনা করিতে সাহস হইবে না। এই জগতে আমার সুখ নাই, আর পরলোকেও যাইতে আমার ভয় হইতেছে, কেননা সেখানে আমার ছেল্যা আমাকে দেখিবে, আর তাহাকে শিক্ষা দিই নাই বলিয়া সে আমাকে দোষ দিবে। হে পরমেশ্বর, তোমার আত্মাহইতে কোথায় যাইব, ও তোমার সাক্ষাৎহইতে কোথায় পলায়ন করিব? নবীন গো, আমি তোমার ভাইয়ের আত্মাকে নষ্ট করিয়াছি, কিন্তু তোমারই আত্মাকে হত্যা করিব না; মেম সাহেবের হস্তে তোমাকে সমর্পণ করিলাম, তিনি তোমাকে উত্তম শিক্ষা দিবেন, আমি তাহা দিতে অক্ষম। হায়! আমার যে ছেল্যা থাকে আমি এমত যোগ্যপাত্র নহি।
বংশির মৃত দেহ সকলের সাক্ষাতে ঘৃণার্হ বস্তু ছিল বটে, তথাপি তাহার মা উক্ত কথা বলিয়া ঐ শবের মাথা আপন কোলে রাখিয়া তাহার মুখে চুম্বন করত অধিক ক্রন্দন করিয়া বলিতে লাগিল, যে মায়ের নিষ্পাপি শিশু তাহার বক্ষঃস্থলে পড়িয়া প্রাণ ত্যাগ করে, সেই মা উল্লাস করুক! সে যখন ছোট শবকে ধুইয়া তৈল মাখায় ও তাহার কবর সিন্দুকে ফুল ছড়ায়, তখন সে এমত জ্ঞান করুক, আমার ছেল্যা বিবাহের বাটীতে যাইতেছে; ও যে সময়ে তাহার বন্ধু বান্ধবেরা তাহার বাছাকে লইয়া কবরে রাখে, সেই সময়ে তাহার মাও কবরস্থানে যাইয়া আনন্দযুক্ত হউক, কারণ তাহার সন্তানের দুঃখের শেষ হইল! সেই ছেল্যা আপন স্বর্গস্থ পিতার স্বর্ণময় অট্টালিকাতে থাকিয়া প্রতিপালিত হইবে; অতএব তাহার মা ক্রন্দন না করুক। কিন্তু হায়! আমার যেপ্রকার পুত্ত্রশোক, তেমন পুত্ত্রশোক জগতে খুজিয়া পাইব না। হায় আমার বংশি! তুমি এখন কোথায় আছ? হায় আমার বাছা! কে তোমার আত্মাকে নষ্ট করিল? আমি তাহা করিলাম। আমাকে ধিক্, আমি মা হইয়া আপন ছেল্যার শরীর ও আত্মা উভয়কে নষ্ট করিলাম।
এ কথা কহিয়া দুঃখিনি করুণা আপন মনের যন্ত্রণা আর সহ্য করিতে না পারিয়া একেবারে অচৈতন্য হইয়া ভূমিতে পড়িল। সেই সময়ে একটিও শব্দ শুনা গেল না, বরং প্রত্যেক স্ত্রীলোকের চক্ষে জল ছল২ করিতেছিল, ও প্রত্যেক পুরুষ স্বর্গের প্রতি দৃষ্টি করিয়া মনে২ প্রার্থনা করিল, হে ঈশ্বর! আমাদের পরিবারের মধ্যে যেন এমত দুর্ঘটনা না হয়। সেই সময়ে অধর্ম্মের ফল স্পষ্টরূপে প্রকাশ পাইল।
বংশির পিতা গত রাত্রিতে গৃহে থাকিয়া মদ্য পানাদি করে নাই, অতএব কি২ ঘটিয়াছে তাহা সে ভালরূপে জ্ঞাত ছিল; তথাচ সে আপন স্ত্রীর ন্যায় মনোদুঃখী হইল না, কারণ যদ্যপি সে ছেল্যার নিমিত্তে বিস্তর কাঁদিল, তথাপি আপনাকে কোন প্রকারে দোষ না দিয়া এই মাত্র বলিল, আমরা কি করিব? ঈশ্বরের যাহা ইচ্ছা তাহাই তিনি করেন। পরে করুণার অবস্থা দেখিয়া সে দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া তাহাকে ভূমিহইতে তুলিল; এবং আমি তাহার মুখে সুশীতল জল দিয়া বিলাতীয় নস্য সুঙাইয়া তাহাকে চেতন করিতে চেষ্টা করিলাম।
কিঞ্চিৎকাল পরে সে চক্ষুঃ খুলিয়া চতুর্দিগে দেখিতে লাগিল। তখন তাহার স্বামী বলিল, ও গো! তুমি বড় নির্বোধ ব্যক্তির ন্যায় কথা কহিয়াছ। আমাদের কেবল নয়, অন্য লোকদের ছেল্যাও ডুবিয়া মরিয়া থাকে, অতএব তাহাতে আমাদের দোষ কি? তাহা পরমেশ্বরের ইচ্ছা। কিন্তু করুণা বলিল, না গো! আমি নির্বোধ নই। কল্য আমি ধর্ম্মপুস্তকে পড়িয়াছিলাম, যে ঈশ্বর ধার্ম্মিক এলির তাবৎ বংশ একেবারে উচ্ছিন্ন করিলেন; কারণ তাহার পুত্ত্রগণ দুষ্টামি করিত, এবং সে তাহা জ্ঞাত হইয়াও তাহাদিগকে নিষেধ করিত না। তুমি যদি সেই কথা পাঠ করিতা, তবে আমাকে কখন নির্বোধ বলিতা না। সে যাহা হউক, আমি আপন অন্তঃকরণের মধ্যে এই অগ্নি আপনি জ্বালাইয়াছি, অতএব সে এখন চিরকাল জ্বলিতে থাকিবে।
সেই সময়ে ফুলমণি ঘরের মধ্যে আসিয়া আমার কানে২ বলিল, মেম সাহেব, দুখিঃনি করুণার দুর্গতির বিষয় আমি জ্ঞাতা আছি বটে, কিন্তু এতক্ষণ প্যারীকে ছাড়িয়া আসিতে পারিলাম না, কারণ তাহার বাঁচিবার আর বিস্তর সময় নাই, অতএব সে আপনাকে ডাকাইবার জন্যে আমাকে পাঠাইয়াছে। আর মেম সাহেব, যদি করুণাকে সেখানে লইয়া যাইতে পারেন, তবে প্যারীর নিকটে সুন্দর সান্ত্বনার বাক্য শুনিয়া বোধ হয় তাহারও মন কিছু সুস্থির হইতে পারিবে। কিন্তু যে কোন রূপে আমাদিগকে শীঘ্র ফিরিয়া যাইতে হইবে, কেননা আপনকার আয়া ব্যতিরেকে প্যারীর কাছে আর কেহ নাই; পাড়ার সমস্ত লোক বংশির গোলমালেতে মত্ত হইয়াছে।
আয়ার বিষয় শুনিয়া আমি আশ্চর্য্য জ্ঞান করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, আমি আয়াকে ঘরে রাখিয়া আসিয়াছিলাম, সে এখানে কখন আইল? ফুলমণি কহিল, বোধ হয় প্রায় অর্দ্ধঘণ্টা হইল, এবং যেমন শুষ্ক ভূমি আকাশের জল চূষিয়া লয়, তেমনি আয়া সেই অবধি প্যারীর মুখহইতে জীবনদায়ক বাক্য অতি যত্ন পূর্ব্বক গ্রহণ করিতেছে।
ফুলমণি এই কথা কহিতে২ তাহার স্বামী প্রেমচাঁদ আসিয়া উপস্থিত হইল। সে তিন দিন পূর্ব্বে পাদরি সাহেবের কোন কর্ম্মের উপলক্ষে কলিকাতায় গিয়া এই মাত্র ঘরে পৌঁছিল, তাহাতে সে বংশির মৃত্যুর সংবাদ শুনিয়া অতিশয় দুঃখিত হইয়া তাহাদের বাটীতে তৎক্ষণাৎ আইল। পরে ফুলমণির নিকটে প্যারীর বিষয় জ্ঞাত হইয়া প্রেমচাঁদ তাহাকে পুনরায় দেখিবার নিমিত্তে আমাদের সহিত যাইতে স্থির করিল। তাহাতে আমি কহিলাম, ভাল প্রেমচাঁদ, তুমি ও ফুলমণি দুঃখিনি করুণাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া যাও। আমরা তখনই করুণার নিকটে গিয়া তাহার হাত ধরিয়া সকলেই প্যারীর গৃহে গেলাম।
করুণা নিরাশ হইয়া আপন মৃত সন্তানের মুখের প্রতি এক দৃষ্টিতে চাহিয়া বসিয়াছিল, তাহাতে আমরা যখন সেখানহইতে তাহাকে তুলিলাম, তখন আমাকে কোথায় লইয়া যাইবে, এ কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া সে নিরব হইয়া আমাদের সঙ্গে২ চলিল। বংশির বাপও কিছু না বলিয়া ঘরে বসিয়া রহিল, কিন্তু নবীন আমাদের সহিত প্যারীর বাটীতে গেল।
অনন্তর আমাদের বৃদ্ধা বন্ধুর গৃহে পৌঁছিলে প্যারী চক্ষুঃ খুলিয়া মৃদু স্বরে বলিল, আ মেম সাহেব! আপনি আমার মৃত্যু দেখিতে আসিয়াছেন। আমি বলিলাম, হাঁ প্যারি, যে পর্য্যন্ত আমাদের স্বর্গস্থ পিতার বাটীতে তোমার সহিত সাক্ষাৎ না হয়, সেই পর্য্যন্ত তোমার নিকটে বিদায় লইতে আসিয়াছি। তখন স্পষ্ট বোধ হইল যে প্যারীর গমন কাল সন্নিকট, কেননা সে এক কালীন মৃদুস্বরে চারি পাঁচটি কথা ব্যতিরেকে আর বলিতে পারিল না।·
ফুলমণি ভালরূপে বিবেচনা করিয়াছিল, যে এমত সময়ে বংশির ভয়ানক মৃত্যুর বিষয় বলিয়া প্যারীর মনকে অস্থির করা কর্ত্তব্য নয়, এই কারণ প্রাতঃকালের তাবৎ ঘটনার বিষয়ে সে নিতান্ত অজ্ঞাতা ছিল। তথাপি আমি বড় ইচ্ছুক হইলাম, যে প্যারী করুণাকে এই সময়ে একটি সান্ত্বনার বাক্য কহে; এই জন্যে তাহার হাত ধরিয়া বলিলাম, প্যারি, এই স্থানে এক জন আছে, যে আপনাকে অতিশয় পাপিষ্ঠ জানিয়া বোধ করে, পরমেশ্বর আমাকেই ক্ষমা করিবেন না; এমত ব্যক্তিকে তুমি কি পরামর্শ দিয়া যাইবা?
তখন প্যারী করুণাকে আর চিনিতে পারিল না, কিন্তু এই কথাতে সে মস্তক তুলিল, এবং তাহার অবশিষ্ট যৎকিঞ্চিৎ বল ছিল, তদ্দ্বারা সে বলিতে লাগিল, ও গো! যীশু খ্রীষ্টের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস কর, তাহা করিলে ঈশ্বরের স্মরণ পুস্তকের মধ্যে যে পৃষ্ঠায় তোমার সকল পাপ লেখা আছে, সেই পৃষ্ঠ যীশু খ্রীষ্ট ক্রুশে বিদ্ধ রক্তময় আপন হস্তদ্বারা মুচাইয়া ফেলিবেন; তাহাতে যে স্থানে তোমার দোষ লেখা ছিল, সে স্থানে খ্রীষ্টের রক্ত ব্যতিরেকে আর কিছু দেখিতে না পাইয়া ঈশ্বর তোমাকে পুণ্যবান্ জ্ঞান করিবেন।
করুণা ইহাতেও নিরাশ হইয়া বলিল, না না, আমার পাপ অতি ভারী হইয়াছে, তিনি আমাকে কখন পুণ্যবান্ জ্ঞান করিবেন না; আমাকে নরকে যাইতে হইবে, ইহা আমি নিশ্চয় জানিতেছি। প্যারী পুনর্ব্বার কহিল, কোন প্রকারেই নয়। ঈশ্বর আপনি বলিয়াছেন, “তোমাদের পাপ রক্তবর্ণ হইলেও হিমের ন্যায় শুক্লবর্ণ হইবে, ও সিন্দূরের ন্যায় রাঙ্গা হইলেও মেষ লোমের ন্যায় শাদা হইবে।” যিশয়িয় ১।১৮।
ইহা বলিয়া প্যারী চক্ষুঃ মুদ্রিত করিয়া কিছু কাল স্থির হইয়া রহিল, পরে আমরা শুনিতে পাইলাম, সে অতি ক্ষীণ রবে ধীরে২ বলিতেছে, হে যীশু, তুমি কেমন প্রিয়! আহা, স্বর্গ কেমন সুখের স্থান! যীশু, তোমার পুণ্য রক্ত আমার সুন্দর পরিধান; সকল জগৎ লুপ্ত হইলে সেই আমার ভরসা থাকিবে। হে মৃত্যু, তোমার হুল কোথায়? হে পরলোক, তোমার জয় কোথায়? যীশু খ্রীষ্টদ্বারা আমিই জয়যুক্ত হইয়াছি।
আয়া এমত সময়ে বসিয়া২ অতিশয় কাঁদিতেছিল, পরে সে প্যারীর হাত ধরিয়া বলিল, ও গো মা! আমার কথা শুন, আমার কথা শুন। তুমি কেমন সুস্থিররূপে মরিতেছ, ইহা দেখিয়া আমি খ্রীষ্টিয়ান হইলাম।
বোধ হইল প্যারী এই কথা বুঝিতে পারিয়াছিল, কারণ তখনি তাহার ম্লান বদন প্রফুল্ল হইয়া উঠিল, এবং সে স্বর্গের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিল, যদি এমত হয়, তবে হে পিতঃ, আমি তোমার ধন্যবাদ করি। ও আয়া! আমি স্বর্গে তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিব। পরে সে ফুলমণির প্রতি ফিরিয়া বলিল, এই বার যাইতেছি। ফুলমণি গো! আমি তোমার বক্ষঃস্থলে মাথা রাখিয়া মরিতে চাহি; তুমি সপরিবারে আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হও। ও মেম সাহেব, ঈশ্বর আপনাকে আশীর্ব্বাদ করুন। হে প্রভো যীশু, আইস! তাঁহার বাম হস্ত আমার মস্তকের নীচে আছে, ও তাঁহার দক্ষিণ হস্ত আমাকে আলিঙ্গন করিতেছে। আহা! ঈশ্বরের প্রিয় লোকদের কেমন শান্তি! কেমন সুখ!
এই বৃদ্ধা প্যারীর শেষ কথা, ফলতঃ ঐ বিশ্বস্ত দাসী এই সকল কথা বলিয়া আপন প্রভুর সুখের ভাগিনী হইতে লাগিল।
আমি তাহার মৃত দেহের সুস্থির মুখ পানে চাহিয়া ক্রন্দন করিতে পারিলাম না, বরং যে আত্মা ঐ দেহ ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছে, সেই আত্মার সুখ ও শান্তি ও গৌরবের অবস্থা মনে করিয়া উল্লাসিতা হইলাম। এই ক্ষণে সহস্র২ দূতগণ প্যারীকে স্বর্গের দ্বারে অভ্যর্থনা করিতেছে, যীশু তাহাকে স্বর্ণময় মুকুট পরাইতেছেন, এবং ঈশ্বর আপনি তাহার চক্ষের জল মুচাইয়া ফেলিতেছেন; ইহা নিশ্চয় জানিয়া আমি আহ্লাদ পূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে কহিলাম, ধার্ম্মিকের ন্যায় আমার মৃত্যু হউক! ও তাহার শেষ অবস্থার তুল্য আমার শেষ অবস্থা হউক!
পরে আমরা সকলে আপন মৃত বন্ধুর খাটের নিকটে হাঁটু পাতিয়া এই ক্ষুদ্র প্রার্থনা করিলাম, হে পিতঃ ঈশ্বর! এই দিবসের দুই প্রকার ঘটনা আমরা যেন কোনরূপে ভুলিয়া না যাই। বিশেষতঃ যে দুই ব্যক্তি এখন তোমাকে অন্বেষণ করিতেছে, তাহাদের মনকে শান্ত ও আনন্দযুক্ত কর, যেন তাহারা তোমার মৃত দাসীর ন্যায় বলিতে পারে, আহা! ঈশ্বরের প্রিয় লোকদের কেমন শান্তি ও কেমন সুখ!
এমন সময়ে পাদরি সাহেব গৃহে আইলেন। তিনি প্যারীর ব্যামোহ হওয়া অবধি প্রতিদিবস দুই বার তাহাকে দেখিয়া যাইতেন, ও তাহার সহিত প্রার্থনা করিতেন; কিন্তু সেই দিন বংশির মৃত্যুর বিষয় শুনিয়া তাহাদের ঘরে গিয়াছিলেন, তাহাতে প্যারীর নিকটে আসিতে তাঁহার কিছু বিলম্ব হইয়াছিল। প্যারীর শেষ কথার বিষয় আমার নিকটে শুনিয়া তাঁহার চক্ষুঃ জলেতে পরিপূর্ণ হইল; পরে তিনি তাহার মৃত দেহের প্রতি চাহিয়া কহিলেন, আ প্যারি! তুমি এক জন প্রকৃত খ্রীষ্টিয়ান লোক ছিলা বটে।
পরে সন্ধ্যাকালে প্যারীকে কবর দেওয়া গেল। খ্রীষ্টিয়ান লোকদের মধ্যে চারি জন পুরুষ তাহার কাল সিন্দুক কাঁধে করিয়া কবর স্থানে লইয়া গেল। পাদরি সাহেবের পরিবার এবং আমি ও পাড়ার প্রায় সমস্ত লোক তাহার পশ্চাৎ ক্রন্দন করিতে২ গেলাম। কিছু কাল পরে আমার স্বামী প্যারীর নিমিত্তে একটি পাকা গোর নির্ম্মাণ করিয়া তাহার উপরে একখানা শ্বেতবর্ণ প্রস্তর স্থাপন করিলেন। ঐ প্রস্তরে প্যারীর নাম ও প্রভু যীশু খ্রীষ্টের এই বাক্য খোদিত করা গেল, যথা, “আমি তোমাদিগকে যথার্থ কহিতেছি, ইস্রায়েল লোকদের মধ্যেও এমন বিশ্বাস পাই নাই। আর অনেকে পূর্ব্ব ও পশ্চিমহইতে আসিয়া ইব্রাহীম ও ইস্হাক ও যাকূবের সহিত স্বর্গরাজ্যে একত্র বসিবে; কিন্তু যে স্থানে ক্রন্দন ও দন্তের ঘর্ষণ হয়, সেই বহির্ভূত অন্ধকারে রাজ্যের সন্তানেরা নিক্ষিপ্ত হইবে।” মথি ৮।১০,১১।
সপ্তম অধ্যায়
উক্ত সকল ঘটনা দেখিয়া আমার মন অতিশয় ব্যাকুল হওয়াতে আমি প্যারীর কবরস্থানহইতে ঘরে গিয়া ব্যামোহে পড়িলাম। সেই পীড়াতে আমি প্রায় দেড় মাস পর্য্যন্ত শয্যাগত হইয়া রহিলাম; ইতোমধ্যে খ্রীষ্টিয়ান পাড়াতে আর যাইতে পারিলাম না, কিন্তু আমার আয়ার সহিত ধর্ম্মের বিষয়ে বিস্তর মিষ্ট আলাপ করিতাম। সে ব্যক্তি সর্ব্বদা যত্ন পূর্ব্বক আমার সেবা করিত, কিন্তু এখন পূর্ব্বাপেক্ষা শ্রমী হইয়া যাহাতে আমি সন্তুষ্ট হইব কেবল এমত কর্ম্ম করিতে চেষ্টান্বিতা হইত। আর সে খ্রীষ্টিয়ান হওয়াতে আমারই প্রভুর দাসী এবং আমার সহিত একই স্বর্গের অধিকারিণী হইল, ইহা জানিয়া তাহার প্রতি আমারও পূর্ব্বাপেক্ষা অধিক প্রেম জন্মিল। অনেক বৎসর পূর্ব্বে আয়া আমার সহিত কান্পুরহইতে আসিয়াছিল, এই হেতুক আমরা যে গ্রামে তখন ছিলাম সেই গ্রামে তাহার আত্মীয় লোক কেহই ছিল না; এবং তাহার স্বামী ও সন্তান না থাকাতে সে কান্পুরে আর ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা না করিয়া আমারই সহিত থাকিতে স্থির করিয়াছিল; এই কারণ তাহার থ্রীষ্টিয়ান হওয়া এক প্রকার সহজ কর্ম্ম। তথাপি শিশু কালাবধি সে মুসলমান জাতির নিয়ম সকল পালন করাতে ভিন্ন জাতীয় লোকদের সহিত আহারাদি করিতে তাহাকে অতিশয় কঠিন বোধ হইল; এমত দেখিয়া আমি তাহাকে এই পরামর্শ দিলাম, যে তুমি হঠাৎ জাতি ত্যাগ না করিয়া বরং কিছু দিন এ বিষয়ে বিবেচনা কর, পাছে লোকে বলে সাহেব লোকেরা ফাঁদ পাতিয়া তোমাকে খ্রীষ্টিয়ান করিয়াছেন।এক দিবস আয়া আমার খাটের নিকটে বসিয়া বর্ণমালা পড়িতেছিল, কারণ সে যে অবধি খ্রীষ্টিয়ান হইতে মানস করিয়াছিল সেই অবধি পাঠ শিক্ষা করিতে আরম্ভ করিল; এমত সময়ে আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আয়া! প্রথমে খ্রীষ্ট ধর্ম্ম গ্রহণ করিতে তোমার মনে কে প্রবৃত্তি দিল?
আয়া বলিল, মেম সাহেব, ফুলমণির সন্তানেরা ধর্ম্মকে কিরূপ ভারি বিষয় জ্ঞান করে, আমি ইহা দেখিয়া চেতনা পাইয়াছিলাম; কেননা আমি ভাবিলাম, ইহারা শিশুমাত্র, অতএব এই শিশুগণ কোন ক্ষুদ্র দোষ করিলে যদি এমত উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল হয়, তবে নিত্য ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করিতেছি যে আমি, আমি কি প্রকারে প্রভুর কোপ এড়াইতে পারিব? ধর্ম্মাত্মা এরূপে আমার মনের মধ্যে পাপের বোধ জন্মাইয়া আমাকে ইহা জ্ঞাত করাইলেন, যে প্রায়শ্চিত্ত বিনা ঐ পাপ কখন ক্ষমা হইতে পারিবে না। সাধু ও সত্যবতী এমত প্রায়শ্চিত্তের বিষয় আমাকে অনেকবার কহিত, তাহাতে আমি আরও শুনিতে ইচ্ছুক হইয়া তাহাদিগকে বিনতি করিলাম, তোমরা যীশু খ্রীষ্টের তাবৎ বৃত্তান্ত আমার সাক্ষাতে পাঠ কর। আমি তাঁহার মহা দয়ার বিষয়ে যত শুনিলাম, ততই আমার মন তাঁহার প্রতি আকর্ষিত হইল; কিন্তু খ্রীষ্টের মৃত্যুদ্বারা পাপি লোকেরা কি প্রকারে নির্দোষী হইতে পারে, ইহা তখন আমি ভাল বুঝিতাম না। পরে প্যারী মরণ কালে খ্রীষ্টের রক্তময় হস্তের দৃষ্টান্ত দিয়া যখন করুণাকে তাহা বুঝাইয়া দিল, তখন আমিও সুন্দররূপে জ্ঞাতা হইলাম যে যীশুর পতিত রক্তদ্বারা পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা কেবল ক্ষমা পায় তাহা নয়, ঈশ্বর তাহাদিগকে নির্দোষি জ্ঞান করেন; ইহা জানিয়া আমি এমন মহা পরিত্রাণ অবজ্ঞা করিতে আর পারিলাম না।
আমি কহিলাম, হাঁ আয়া! ঈশ্বরের স্মরণ পুস্তকহইতে যীশুর রক্তময় হস্ত যে আমাদের পাপ মুচাইয়া ফেলে, তাহা অতি সুন্দর দৃষ্টান্ত। আর আমার নিজ পাপ সকল এই রূপে মোচন হইয়াছে, ইহা আমাদের প্রিয়া প্যারী কেমন দৃঢ় বিশ্বাস করিত।
প্যারীর মৃত্যুর কথা স্মরণ হওয়াতে আয়া কাঁদিতে২ বলিল, আ মেম সাহেব! প্যারীর পীড়া হইলে পর তাহার সহিত আমার যে দুই বার সাক্ষাৎ হইল, তদ্দ্বারা আমার কেমন লাভ জন্মিয়াছে। আহা! সকল খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকেরা যদি প্যারী ও ফুলমণির মত হইত, তবে বোধ করি অল্প দিনের মধ্যে একটিও হিন্দু কিম্বা মুসলমান আর থাকিত না।
এমত সময়ে এক জন বাহিরে দাঁড়াইয়া আয়াকে ডাকিলে আমাদের কথোপকথন ভঙ্গ হইল; তাহাতে আমি তৎক্ষণাৎ সেই মিষ্ট রব শুনিয়া জানিলাম যে সত্যবর্তী আসিয়াছে, অতএব তাহাকে ঘরের ভিতরে ডাকিলাম। সত্যবতী আসিয়া বলিল, মেম সাহেব, মা আমাদিগকে কহিলেন, যে স্কুলহইতে ফিরিয়া আসিবার সময়ে আয়ার নিকটে গিয়া মেম সাহেব কেমন আছেন, ইহা জিজ্ঞাসা করিয়া আইস; এই নিমিত্তে আমরা আসিয়াছি।
আমি বলিলাম, সত্যবতি, অদ্য আমি কিছু ভাল আছি, অতএব তোমার ভাই যদি বাহিরে থাকে, তবে তাহাকে ডাকিয়া আন। তাহাতে সাধু আসিয়া আমাকে আপন রীত্যনুসারে অতি শিষ্টরূপে সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। পরে আমার মেজের উপর বড় একখান আর্শি দেখিয়া তাহারা দুইজনে অত্যন্ত আশ্চর্য্য জ্ঞান করিল, কারণ পূর্ব্বে তাহারা এমন বস্তু কখন দেখে নাই। তখন সত্যবতী আনন্দপূর্ব্বক করতালি দিয়া বলিল, ও দাদা! আমি মাকে গিয়া বলিব, যে এখানে আসিয়া আমরা এক আকৃতি দুই জন মেম ও দুই জন আয়াকে দেখিতে পাইলাম; এ কথার ভাব মা কখন বুঝিতে পারিবেন না। পরে মেজের উপর যে গোলাপ জল ও আতরাদির শিশি ছিল, তাহাও দেখিয়া ছেল্যারা বড় প্রশংসা করিল, এবং আমি কিঞ্চিৎ আতর তাহাদের কাপড়ে ঢালিয়া দিলে তাহারা অত্যন্ত আহ্লাদে পুলকিত হইয়া কি করিবে তাহা জানিল না। কিন্তু এমত হইলেও তাহারা বড় শিষ্ট ব্যবহার করিয়া কোন দ্রব্যেতে হাত দিল না, এবং কোন সামগ্রী আমার নিকটে চাহিল না।
পরে আমি যে পীড়িত ছিলাম, তাহা সাধু স্মরণে রাখিয়া বলিল, মেম সাহেব, বোধ করি আমরা এখন ঘরে গেলে ভাল হয়, এখানে থাকিয়া কেবল আপনাকে ব্যামোহ দিতেছি। কিন্তু তাহা না হইয়া বরং তাহাদের নিষ্কপট কথা শুনিয়া আমার মনে আমোদ জন্মিতেছিল, এই হেতু আমি কহিলাম, না না, এখন তোমরা ঘরে যাইও না। আজি স্কুলে কি শিখিয়াছ, তাহা বসিয়া২ আমাকে বল।
এই কথা শুনিয়া সত্যবতী কহিল, ও মেম সাহেব, আপনি অনেক দিন হইল এক বার বলিয়াছিলেন, কোন রবিবার দিনে আমি গিয়া ধর্ম্মপুস্তকের পদ তোমাদের মুখস্থ শুনিব; কিন্তু এক বারও যান নাই, অতএব যদি আজ্ঞা করেন, তবে স্কুলের পাঠ না দিয়া গত রবিবারের শিক্ষিত পদ গুলিন আপনার সাক্ষাতে বলি; তাহার মধ্যে অনেক উত্তম২ কথা আছে। আমি কহিলাম, ভাল তাহাই বল; পরে তোমার পিতা কি প্রকারে সে সকল পদ তোমাদিগকে বুঝাইয়া দিয়াছেন, তাহাও বলিতে হইবে। সত্যবতী প্রথমে আরম্ভ করিতে চাহিল, তাহাতে তাহার ভাই হাসিয়া বলিল, সত্যবতি, আমি প্রথমে মুখস্থ বলিলে বলিতে পারিতাম; কিন্তু ক্ষতি নাই, তুমি বলিতে চাহিতেছ, অতএব তুমিই বল।
তখন সত্যবতী শুদ্ধরূপে এই২ পদ সকল মুখস্থ বলিতে লাগিল, যথা; “বালকের গন্তব্য পথে তাহাকে শিক্ষা দেও, তাহাতে সে প্রাচীন হইলে তাহাহইতে বিমুখ হইবে না।” হিতোপদেশ ২২।৬।
“বালকের মনে অজ্ঞানতা বদ্ধ থাকে, কিন্তু শাসনদণ্ড দ্বারা তাহা তাহাহইতে দূরে যায়।” হিতোপদেশ ২২।১৫।
“হে বালকগণ, পরমেশ্বরের বাক্যানুসারে তোমরা পিতা মাতার আজ্ঞাবহ হও, কেননা ইহা উপযুক্ত।” ইফিষীয় মণ্ডলীর প্রতি পত্র ৬।১।
“যীশু শিশুগণকে দেখিয়া কহিলেন, শিশুদিগকে আমার নিকটে আসিতে দেও, তাহাদিগকে বারণ করিও না, কেননা এমত ব্যক্তিরা ঈশ্বরের রাজ্যের অধিকারী।” মার্ক ১০।১৪।
সত্যবতী আপন পাঠ সাঙ্গ করিলে পর আমার মুখ পানে দৃষ্টি করিয়া বলিল, ঐ শেষ পদটি সকলহইতে ভাল। যীশু খ্রীষ্ট বলেন, শিশুদিগকে আমার নিকটে আসিতে দেও, ইহাতে তাঁহার কত বড় দয়া প্রকাশ পায়! ' আহা! আমি যীশুর প্রতি অতিশয় প্রেম করি।
এই প্রিয়া বালিকার বাক্য শুনিয়া আমার চক্ষুঃ জলেতে ছল্২ করিল, তাহাতে সে তাহা টের পাইয়া আপন ছোট শাড়ির অঞ্চল দিয়া শীঘ্র মুচাইয়া ফেলিল।
পরে সাধু বলিল, সত্যবতি, যে বালকেরা আপন পিতা মাতার আজ্ঞাবহ হইয়া ইহকালে পুরস্কার পাইয়াছিল, তাহাদের কথা ধর্ম্মপুস্তকের মধ্যে আমরা কি প্রকারে খুজিয়া বাহির করিলাম, সে বিষয়ও মেমকে জানাও।
সত্যবতী কহিল, সকল কথা এখন আমার মনে নাই, কিন্তু যে দুই জন বালকের বৃত্তান্ত আমি ধর্ম্ম পুস্তকের মধ্যে আপনি খুজিয়া বাহির করিলাম, তাহা মেম সাহেবকে বলিতে পারি। যূষফ ও শৌল আপন২ পিতার আজ্ঞা পালন করাতে শেষে রাজা হইয়াছিল। যূষফ আপন পিতার কথা শুনিয়া ভ্রাতাদের তত্ত্ব করিতে গিয়াছিল, তাহাতে সে মিসর দেশে নীত হইয়া শেষে দেশাধ্যক্ষ হুইল। তদ্রূপ শৌল আপন পিতার গর্দভ অন্বেষণ করিতে গেলে, শিমূয়েল ভবিষ্যদ্বক্তা তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহাকে ইস্রায়েল দেশের রাজপদে অভিষিক্ত করিলেন।
আমি এই কথাতে ঈষৎ হাসিয়া বলিলাম, ভাল সত্যবতি, তুমি ভারি দৃষ্টান্ত বাহির করিয়াছ বটে! এখন বল দেখি, যদি তুমি আপনার পিতা মাতার কথা শুন, তবে কি একটি ছোট রাণী হইবার অপেক্ষা কর?
সত্যবতী অতিশয় গম্ভীর হইয়া কহিল, না মেম, এমত নয়; কিন্তু মা বাপের কথা শুনিলে ঈশ্বর আমার প্রতি প্রেম করিবেন, তাহা হইলে আমি আর কোন পুরস্কার চাহি না। এখন দাদার পাঠ লউন, ইনি আমা অপেক্ষা অনেক পদ জানেন।
তখন সাধু স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া স্পষ্টরূপে বলিতে লাগিল, যথা;
“পরমেশ্বর বিষয়ক যে ভয়, সেই জ্ঞানের আরম্ভক; কিন্তু অজ্ঞানেরা বিদ্যা ও উপদেশ তুচ্ছ বোধ করে।” হিতোপদেশ ১।৭।
“হে আমার পুত্ত্র, পাপিগণ তোমাকে কুপথে লওয়াইলে তুমি সম্মত হইও না। তাহাদের সহিত সে পথে যাইও না, তাহাদের পথহইতে তোমার চরণ ফিরাও।” হিতোপদেশ ১।১০,১৫।
“মূর্খ পুত্ত্র আপন পিতার মনস্তাপ ও মাতার দুঃখজনক হয়।” হিতোপদেশ ১৭।২৫।
“আমিই প্রকৃত মেষপালক; যে জন প্রকৃত মেষপালক, সে মেষের নিমিত্তে আপন প্রাণ সমর্পণ করে। আমার মেষগণ আমার রব শুনে; আমি তাহাদিগকে জানি, এবং তাহারা আমার পশ্চাৎ গমন করে। আমি তাহাদিগকে অনন্ত পরমায়ু দি; তাহারা কখনো বিনষ্ট হইবে না, এবং কেহ আমার হস্তহইতে তাহাদিগকে হরণ করিতে পারিবে না।” যোহন ১০।১১,২৭,২৮।
“আমি দ্রাক্ষালতাস্বরূপ, তোমরা শাখাস্বরূপ; যে জন আমাতে থাকে, এবং যাহাতে আমি থাকি, সে প্রচুর ফলেতে ফলবান্ হয়; কিন্তু আমা ভিন্ন তোমরা কিছুই করিতে পার না।” যোহন ১৫।৫।
সাধুর পাঠ সাঙ্গ হইলে পর আমি জিজ্ঞাসিলাম, ভাল সাধু, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট কি ভাবে আপনাকে মেষপালক বলিলেন, তাহা কি তুমি জান?
সাধু উত্তর করিল, হাঁ মেম সাহেব, জানি। যেমন মেষপালক আপন মেষগণকে রক্ষা করে, তদ্রূপ যীশু আপন বিশ্বস্ত লোকদিগকে সকল আপদহইতে ত্রাণ করেন। ধর্ম্মপুস্তকের এক স্থানে লেখা আছে, শয়তান গর্জনকারি সিংহ; যীশু সেই গর্জনকারি সিংহহইতে আপন শিষ্যদিগকে রক্ষা করেন, অর্থাৎ তাহাদিগকে এমত শক্তি দেন যে তাহারা শয়তানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারে।
তখন সত্যবতী বলিল, ও দাদা! তুমি মেষশাবকের বিষয়ে মেম সাহেবকে বলিতে ভুলিয়াছ। দেখ, ছোট বাচ্চা গুলিন ক্লান্ত হইলে মেষপালক যেমন তাহাদিগকে ক্রোড়ে করিয়া লইয়া যায়, তদ্রূপ যীশু আপন লোকদের ছোট ছেল্যাদিগকে প্রেম করিয়া বলেন, শিশুদিগকে আমার নিকটে আসিতে দেও!
তাহাতে আমি কহিলাম, সত্যবতি, একথা যথার্থ বটে; এবং যীশু খ্রীষ্ট এক বার আপনি বালক ছিলেন, অতএব তিনি ছেল্যাদের সুখ ও দুঃখ সকল ভালরূপে জ্ঞাত আছেন।
ইহা শুনিয়া সত্যবতী প্রফুল্ল বদনে বলিল, ও মেম সাহেব, আমি যখন যীশুর নিকটে প্রার্থনা করি, তখন ঐ কথা আমার মনে উঠে। একবার পাদরি সাহেবের মেম প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যদি বৃষ্টি না হয়, তবে সন্ধ্যাকালে আমি তাবৎ স্কুলের বালক বালিকাকে ওপারে লইয়া যাইয়া এক সাহেবের পোষা চিত্র বাঘ দেখাইব; তাহাতে আমি প্রার্থনা করিলাম যেন সে দিন বৃষ্টি না হয়। প্রার্থনা করিয়া আমি ভাবিতে লাগিলাম, কি জানি এমত ক্ষুদ্র বিষয়ে প্রার্থনা করিলে ঈশ্বর আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হইবেন; কিন্তু পরে মনে করিলাম, যীশু যখন বালক ছিলেন, তখন বোধ হয় তিনিও পোষা বাঘ দেখিয়া সন্তুষ্ট হইতেন, অতএব আমি ঐরূপ প্রার্থনা করিতে আর ভয় করিলাম না। আমার প্রার্থনাও সফল হইল, কারণ সে দিবসে বৃষ্টি হইল না, তাহাতে আমরা বাঘকে স্বচ্ছন্দে দেখিলাম।
তখন সাধু বলিল, মেম সাহেব, পিতা সেই কথা শুনিয়া কহিলেন, সত্যবতী ভাল করিয়াছে। পৌল প্রেরিত লিখিয়াছেন; যথা, “দৌর্ব্বল্যেতে আমাদের সহিত দুঃখ ভোগ করিতে অক্ষম, এমন মহাযাজক আমাদের নহেন।” ইব্রী ৪।১৫। অতএব বয়ঃপ্রাপ্ত লোকেরা যাহা চাহে তাহার নিমিত্তে যদি প্রার্থনা করিতে আজ্ঞা পাইয়াছে, তবে অবশ্য শিশুরাও যাহা২ ইচ্ছা করে তাহার জন্যে প্রার্থনা করিতে পারে।
আমি কহিলাম, তোমার পিতা যথার্থ বুঝিয়াছে। এখন বল দেখি, “তোমরা আমাতে থাক,” এই যে আজ্ঞা খ্রীষ্ট আপনার শিষ্যগণকে দিয়াছেন ইহার অভিপ্রায় কি?
সাধু বলিল, ইহার অর্থ এই, আমাদিগকে খ্রীষ্টের পশ্চাৎ২ গমন করিতে হইবে, ও তাঁহার নিকটে থাকিতে হইবে। আমি জিজ্ঞাসিলাম, তিনি এমত আজ্ঞা কেন দিলেন? সাধু কহিল, যেমন ভাল গাছের মূলহইতে রস না পাইলে শুষ্ক হইয়া যায়, সেইরূপ খ্রীষ্টের লোকেরা যদি তাঁহার সঙ্গ ছাড়ে, তবে তাহাদের ধর্ম্ম নষ্ট হয়; কারণ শয়তান আসিয়া সতত মনুষ্যদের মনকে পরীক্ষা করে, তাহাতে তাহারা যদি খ্রীষ্টের অনুগ্রহ ও শক্তি না পায়, তবে শয়তানকে জয় করিতে না পারিয়া পাপে পতিত হইবে।
এমত কথোপকথন হইতে২ অনেক সময় বহিয়া গেল; ইতোমধ্যে আমি ও ছেল্যারা সকলই ভুলিয়া গিয়াছিলাম, যে তাহাদের মাতা তাহাদের অপেক্ষাতে ভাবিতা হইয়া থাকিবে। কিঞ্চিৎকাল পরে ফুলমণি আপন হারাণ ধনকে আপনি খুজিতে আইল। সে ছেল্যাদিগকে আমার সহিত দেখিয়া কিছু মাত্র অসন্তুষ্টা না হইয়া বলিল, মেম সাহেব, আপনি পীড়িতা আছেন, অতএব ভয় হয় ছেল্যারা আপনাকে বিস্তর ব্যামোহ দিয়া থাকিবে; আমি এখন উহাদিগকে একেবারে ঘরে লইয়া যাই।
ফুলমণির এইরূপ ব্যবহারদ্বারা বাঙ্গালাদেশস্থ স্ত্রীলোকেরা শিক্ষা পাইতে পারে, বিশেষতঃ অনেকেই সাহেব লোকদের কিম্বা আপন২ প্রতিবাসিদের ঘরে অসময়ে উপস্থিতা হইয়া তাহাদিগকে নিরর্থক ব্যস্ত করে।
আমি ফুলমণিকে বলিলাম, না ফুলমণি, তোমার ছেল্যারা আমাকে কিছু মাত্র ব্যামোহ দেয় নাই; আমি ইহাদিগকে ধর্ম্মের বিষয় জিজ্ঞাসা করিতেছিলাম, কেননা আমার বোধে খ্রীষ্টের খোঁয়াড়ের মেষশাবকগণকে শিক্ষা দেওয়া অপেক্ষা পৃথিবীর মধ্যে আর উত্তম কর্ম্ম নাই।
এমত সময়ে সাধু ও সত্যবতী আমার হিরামন তোতাকে দেখিবার জন্যে বারাণ্ডায় দৌড়িয়া গেল। তাহাতে আমি তাহাদের প্রশংসা করিতে ভয় না করিয়া বলিলাম, ফুলমণি, আমি দেখিতেছি যে তোমার সন্তানেরা ধর্ম্মকে ভাল বাসে, এবং তাহাদের স্বর্গস্থ পিতা যাহাতে সন্তুষ্ট হইবেন কেবল এমত কর্ম্ম করিতে চেষ্টা করে; অতএব স্পষ্ট বোধ হয়, যে ঈশ্বর তোমার সকল সুশিক্ষাতে আশীর্ব্বাদ করিতেছেন।
ফুলমণি কহিল, আঃ মেম সাহেব! আমি এই প্রার্থনা করি, যেন আমি শিমূয়েল ও তীমথির মায়ের ন্যায় ছেল্যাদিগকে শিশুকাল অবধি ধর্ম্ম পথে লওয়াইতে পারি, এবং শিমূয়েল ও তীমথি যেরূপ ঈশ্বরপরায়ণ হইয়া উঠিল, সেইরূপ আমার সন্তানেরাও যদি ধার্ম্মিক হইয়া উঠে, তবে আমার মনোবাঞ্ছা সিদ্ধ হইবে।
আমি উত্তর করিলাম, ভয় নাই ফুলমণি, তুমি অবশ্য সেই বর পাইবা; কারণ ঈশ্বর বলিয়াছেন, “যাহারা আমার প্রতি প্রেম করে তাহাদিগের প্রতি আমিও প্রেম করি,” এবং তিনি তাহাদিগকে কখন রিক্ত হস্তে বিদায় করেন না। করুণা যদি আপন সন্তানদিগকে শিক্ষা দিয়া তাহাদের নিমিত্তে প্রার্থনা করিত, তবে এখন তাহার পুত্ত্রের বিনাশের বিষয়ে সে আপনাকে নির্দোষি জানিয়া কিছু শান্তা হইত।
এই কথা সাঙ্গ হইলে পর সাধু ও সত্যবতী ভিতরে আইলে ফুলমণি তাহাদিগকে সঙ্গে করিয়া বিদায় লইয়া ঘরে গেল।
আহা! এই দরিদ্র খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোক ও তাহার প্রিয় সন্তানদের সহিত সাক্ষাৎ করণদ্বারা আমার মন কেমন উল্লাসিত হইল। ভারতবর্ষের তাবৎ লোক এক দিবস প্রভুর সেবা করিবে, ফুলমণির পরিবার এমত সুদিবসের বায়না স্বরূপ হইয়াছে, আমি ইহা ভাবিয়া মনে২ এই প্রার্থনা করিলাম, হে প্রভো, এমত কাল শীঘ্র উপস্থিত কর; এবং সুস্থকারি কিরণবিশিষ্ট ধর্ম্মরপ সূর্য্য উদয় করাইয়া এই দেশের ভ্রমান্ধকার নষ্ট কর। হে প্রভো, যদ্যপি আমি কেবল কাষ্ঠছেদক ও জলবাহক স্বরূপ হই, তথাপি আমাদ্বারা যেন এই মহৎ কর্ম্মের কিছু২ বৃদ্ধি হয়!
প্রায় দেড় মাস গত হইলে পর আমি স্বাস্থ্য পাইয়া পুনর্ব্বার বাহিরে যাইতে পারিলাম; তাহাতে প্রথমে দুঃখিনী করুণার সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাঞ্ছা করিয়া তাহার বাটীতে উপস্থিতা হইয়া দেখিলাম, তাহার মুখ অতিশয় ম্লান এবং মনের দুঃখ প্রযুক্ত বড় কৃশ হইয়াছে।
করুণা আমাকে দেখিবামাত্র আপন পুত্ত্রের মৃত্যুর দিবস মনে করিয়া তৎক্ষণাৎ ক্রন্দন করিতে২ বলিল, আ মেম সাহেব! আমার কেমন মন্দ কপাল, দুঃখেতেই আমার কাল বহিয়া যাইতেছে। তাহাতে আমি বংশির বিষয়ে আর কিছু বলিতে ভাল না বুঝিয়া কহিলাম, করুণা, তোমার মন যাহাতে শোকহইতে বিশ্রাম পায় এমত চেষ্টা কর। আপন কপালকে দোষ দেওয়াতে কোন ফল নাই; বরং তদ্দ্বারা অন্তঃকরণ কঠিন হয়, এবং তাহাতে তোমার প্রতি ঈশ্বরের ক্রোধ জন্মে। বল দেখি করুণা, পৃথিবীর মধ্যে দুঃখ কি প্রকারে প্রবেশ করিল?
করুণা উত্তর করিল, পাপদ্বারা দুঃখ হইল।
আমি কহিলাম, একথা সত্য; তবে দুঃখ ঘুচাইবার জন্যে দুঃখের কারণকে দূর করিতে হয়, অর্থাৎ কপালকে দোষ না দিয়া আপন পাপের বিষয়ে ক্রন্দন ও বিলাপ করত তাহা ত্যাগ করিতে হয়। যীশু বলিয়াছেন, খিদ্যমান লোকেরা ধন্য, কারণ তাহারা সান্ত্বনা পাইবে; অর্থাৎ যাহারা পাপের বিষয়ে খেদ করে তাহারাই ধন্য; যেমন আমি পূর্ব্বে বলিয়াছিলাম, যে জন আপন পীড়ার নিমিত্তে খেদ করিয়া ঔষধাদি খায় সে ব্যক্তি অবশ্য সুস্থ হইতে পারে। পাপ মনের রোগ, খ্রীষ্ট তাহার চিকিৎসক হইয়াছেন, তুমি তাঁহার প্রতি বিশ্বাস রাখিলে পাপহইতে মুক্ত হইবা।
করুণা কহিল, হাঁ মেম সাহেব, সে সত্য বটে; কিন্তু আমার তাবৎ দুঃখ আপনাহইতে জন্মে না, ইহাতে আমার স্বামির অধিক দোষ আছে। দেখুন, আজি আমি সুঁড়ির দোকান পর্য্যন্ত পয়সা চাহিবার জন্যে তাহার পিছে২ গিয়াছিলাম, তথাচ একটি কড়াও পাইলাম না; বরং সে আমাকে গালি দিয়া তাড়াইয়া দিল।
আমি কহিলাম, করুণা, তুমি যদি পারিপাট্য ও মিষ্ট কথাদ্বারা আপনার বাটীকে রম্যস্থান করিতা, তবে সে অন্য স্থানে কেন চঞ্চল হইয়া বেড়াইবে? কিন্তু তুমি তাহাই করিলে সেও তোমাকে ভাল রূপে প্রতিপালন করিবে।
করুণা বলিল, বোধ হয় তাহা কেবল আমাহইতে হইবে না। কেহ যদি আমাকে শিক্ষা দেয়, তবে কি জানি হইলেও হইতে পারে।
পরে আমি কহিলাম, করুণা, আমার পরামর্শে যদি চলিতে পার, তবে আমি তোমাকে শিক্ষা দিই। তুমি প্রথমে ঈশ্বরের দশ আজ্ঞা মুখস্থ কর, পরে সে সকল আজ্ঞা পালন করিতে যত্নবতী হও, বিশেষতঃ বিশ্রামবারকে পবিত্র রূপে মানিয়া প্রভুর গীর্জা ঘরে যাও। আহা করুণা! তুমি যদি এত দিন গীর্জায় যাইতা, তবে এখন ধর্ম্মের বিষয়ে এমত অজ্ঞান হইয়া থাকিতা না।
করুণা বলিল, মেম সাহেব, আমার একখানিও ভাল কাপড় নাই, এই জন্যে গীর্জায় যাইতে লজ্জা করি। সকলে রবিবার দিনে ভাল কাপড় পরিয়া আইসে, কেবল আমি কি মলিন বস্ত্র পরিয়া যাইব?
আমি উত্তর করিলাম, করুণা, প্রভুর গৃহে পরিষ্কার বস্ত্র পরিয়া যাওয়া উচিত বটে, তথাচ যদি কোন প্রকারে এমত বস্ত্র যোগাইতে না পার, তবে গীর্জা ত্যাগ করা অপেক্ষা সামান্য বস্ত্র পরিয়া যাওয়া ভাল; কেননা শরীর এক প্রকার তুচ্ছনীয় বস্তু, আত্মা অতিশয় দুর্লভ, অতএব তোমার আত্মা যেন খ্রীষ্টের পবিত্রতাতে ভূষিত হয়, এমত চেষ্টা কর। দায়ূদ রাজা যখন জিজ্ঞাসিলেন, “পরমেশ্বরের পর্ব্বতে কে আরোহণ করিবে? ও তাঁহার ধর্ম্মধামে কে অধিষ্ঠান করিবে?” তখন ধর্ম্মাত্মা উত্তর করিলেন, “যাহার পরিষ্কৃত করতল ও পবিত্র অন্তঃকরণ আছে; যে জন মিথ্যা কথাতে মনোনিবেশ ও মিথ্যা শপথ না করে; এমত ব্যক্তি পরমেশ্বরহইতে আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে।” গীত ২৪।৩,৪,৫। আর করুণা, বিবেচনা কর, তুমি যদি এখন মনুষ্যদের সমাজে মলিন বস্ত্র পরিয়া যাইতে লজ্জা কর, তবে শেষ বিচারে তাবৎ পৃথিবীস্থ লোকদের ও দিব্য দূতগণের সাক্ষাতে পাপরূপ মলিন নেকড়া পরিয়া কি প্রকারে দাঁড়াইবা? সে যাহা হউক, তুমি কি গীর্জায় যাইবার জন্যে কোন প্রকারে একখান উপযুক্ত কাপড় কিনিয়া রাখিতে পার না?
করুণা কহিল, মেম সাহেব, চারিটি ভাত খাইয়া যে তৃপ্তা হই, এমত কড়ি স্বামী আমাকে আনিয়া দেয় না, তবে কোথাহ্ইতে ভাল শাড়ি কিনিব? এবং এখন গীর্জায় গেলে আমার কি ফল হইবে? আমি আপন দুর্ভাগ্য ছেল্যার আত্মা নষ্ট করিয়াছি, অতএব ঈশ্বর আমার প্রার্থনা কখন শুনিবেন না। ঐ ছেল্যার সহিত আমাকে অনন্তকাল নরকাগ্নিতে পুড়িতে হইবে।
ইহা শুনিয়া আমি কহিলাম, হায়২ করুণা! তুমি কি এত শীঘ্র প্যারীর শেষ বাক্য ভুলিয়া গেলা?
করুণা বলিল, না না মেম, তাহা ভুলি নাই, বরং আমি অনেকবার আপন অন্তঃকরণের মধ্যে সেই মিষ্ট কথা গুলিন আন্দোলন করিয়া থাকি; তথাচ খ্রীষ্ট যে আমাকে ত্রাণ করিবেন আমার এমত ভরসা হয় না।
আমি কহিলাম, করুণা, তুমি ভয় করিও না; তিনি অবশ্য তোমাকে ত্রাণ করিবেন। তুমি প্রতিদিন এইরূপ প্রার্থনা করিও, হে পরমেশ্বর! তোমার পুত্ত্র যীশু খ্রীষ্টের রক্ত যে তাবৎ পাপহইতে আমাদিগকে পরিষ্কৃত করে, আমার মনে এমত দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাইয়া দেও।
করুণা স্বীকার করিয়া কহিল, ভাল মেম সাহেব, তাহাই করিব।
পরে আমি বলিতে লাগিলাম, তোমার গৃহ যেন সুখের স্থান হয়, এই জন্যে আমি তোমাকে আর দুই একটি উপদেশ দিই। তোমার নিজ ব্যবহার পূর্ব্বাপেক্ষা উত্তম হউক, তাহা হইলে যদ্যপিও তোমার স্বামী তাহাতে হঠাৎ মনোযোগ না করে, তথাপি শেষে তাহা দেখিয়া তোমার প্রশংসা অবশ্য করিবে। তুমি সকল প্রকার রাগ ত্যাগ করিয়া ঘরের উচিত কর্ম্ম সকল নির্ব্বাহ কর; এবং প্রেমচাঁদ কর্ম্মহইতে ফিরিয়া আইলে ফুলমণি যেমন তাহার ঘরে পরিবার কাপড় ও হুকা ইত্যাদি প্রস্তুত করিয়া রাখে, তেমনি তুমিও সর্ব্ব প্রকারে আপনার স্বামির সন্তোষ জন্মাইতে চেষ্টা কর। বিশেষতঃ প্রতিদিন পরমেশ্বরের নিকটে প্রার্থনা কর, তিনি যেন তোমাকে এই সকল করিতে সুমতি ও শক্তি দিয়া তোমাদের দুই জনের মন ফিরাইয়া দেন। আহা! ঈশ্বর এই প্রার্থনা শুনিলে তোমরা কেমন সুখে বাস করিবা। নবীন এখন আমার নিকটে প্রায় থাকে, তথাপি সে তোমারি সন্তান, এবং তাহার শিক্ষার বিষয়ে ঈশ্বর তোমার নিকটে হিসাব লইবেন, এই জন্যে তুমি তাহাকে এমত কথা বল; আমি এত দিন পর্য্যন্ত ঈশ্বরকে না জানিয়া তাঁহার আজ্ঞা লঙ্ঘন করিয়াছি, কিন্তু এখন ধর্ম্ম পথে চলিতে ইচ্ছা করি, ও তোমাকেও সেই পথে আনিতে চাহি। নবীন এমত কথা শুনিয়া তোমাকে তুচ্ছ না করিয়া আরও সম্মান করিবে; কেননা খ্রীষ্টিয়ানদের কিরূপ ব্যবহার করা উচিত তাহা সে সুন্দররূপে জ্ঞাত আছে। এই নূতন পথ তোমার পক্ষে প্রথমে কঠিন বোধ হইবে তাহা আমি জানি, তথাপি তাহা ত্যাগ করিও না, বরণ অদ্যাবধি আপন ব্যবহার সুধরাইতে আরম্ভ কর। কি জানি তোমার স্বামী এই সময়ে সুঁড়ির দোকানে মাতাল হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে; কিন্তু তদ্দ্বারা নিরাশ না হইয়া তাহার প্রত্যাগমনের নিমিত্তে সকল দ্রব্য সুন্দর রূপে আয়োজন করিয়া রাখ। তোমার নিকটে খরচের জন্যে টাকা পয়সা কিছু নাই, তাহা আমি জানি, অতএব এই দুইটি টাকা লও; এবং যাবৎ তোমরা দুই জনে সুখে বাস না কর, ও এক সঙ্গে প্রভুর ভজনালয়ে না যাও, তাবৎ আমি তোমাদের জন্যে ঈশ্বরের নিকটে প্রার্থনা করিতে ক্ষান্তা হইব না।
এই কথা শুনিয়া করুণার মুখ কিছু প্রফুল্ল হইল, কিন্তু পরে সে নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, আহা! এমন সুগতি কি আমার হইবে? আমার গৃহ কি কখন ফুলমণির গৃহের মত হইবে?
আমি কহিলাম, করুণা, অবশ্য হইতে পারে, কিন্তু এই নিমিত্তে তোমাকে চৌকি দিয়া প্রার্থনা করিতে হইবে। তুমি আপনার মনকে নিত্য২ চৌকি দেও, যেন কোন প্রকারে পাপ তাহাতে প্রবেশ করিতে না পারে; এবং কোন বিপদে পড়িলে ফুলমণির নিকটে গিয়া তাহার পরামর্শ লও, সে তোমাকে অবশ্য সদুপদেশ দিবে।
এই সকল কথা সাঙ্গ হইবা মাত্র এক জন চৌকিদার নবীনের বাপকে ধরিয়া ঘরে লইয়া আইল। তখন সে অতিশয় মাতাল হইয়া প্রায় অচৈতন্য হইয়াছিল। চৌকিদার করুণাকে বলিল, তোর ভাতারকে লও, গো। আমি না থাকিলে সে এখনি গাড়ীতে চাপা পড়িয়া মরিত। স্বামির অবস্থা দেখিয়া করুণার মুখ রাগেতে রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল; তাহাতে আমি বলিলাম, সাবধান! করুণা সাবধান, অচৈতন্য মানুষকে অনুযোগ করাতে কোন ফল দর্শিবে না। উহাকে ধীরে২ বিছানাতে শয়ন করাইয়া দেও, এবং প্রাতঃকালেও উহাকে ভর্ৎসনা করিও না।
আমি সেখানে দাঁড়াইয়া করুণা কি করে তাহা দেখিতে লাগিলাম; তাহাতে সে একখান মাদুর ও কাঁথা ঘরের মধ্যে বিছাইয়া মিষ্ট রবে বলিল, ও গো, এখানে শুইয়া ঘুমাও। করুণার এমত নূতন ব্যবহার দেখিয়া তাহার মাতাল স্বামী তাহাকে কিছু মাত্র চিনিতে না পারিয়া বিছানাতে শুইয়া আপনা আপনি বলিতে লাগিল, এ বেটী বড় ভাল মানুষ, ইহার ঘরে বরাবর আসিব। পরে সে শীঘ্র ঘুমাইয়া পড়িল, তাহাতে করুণা পুনর্ব্বার বাহিরে আসিয়া দাবাতে আমার সহিত কথা কহিতে লাগিল।
আমি কহিলাম, দেখ, এখন বেলা গেল বটে, তথাপি বোধ করি শীঘ্র বাজারে গেলে কিছু মাছ পাইতে পারিবা, তাহা আনিয়া কল্য তোমার স্বামিকে ভালরূপে খাওয়াও। এবং করুণা, এ সকল কর্ম্মেতে তোমাকে অতি চেষ্টান্বিতা ও অনবরত যত্নবতী হইতে হইবে; তাহা না হইলে একেবারে তুমি উত্তম কর্ম্ম কি প্রকারে করিতে পারিবা? যেমন পূর্ব্বে বলিলাম, উত্তম ব্যবহার করা প্রথমে তোমার অতিশয় কঠিন বোধ হইবে; কিন্তু ভয় নাই, কেবল আপনার দুর্বলতা ও পাপিষ্ঠ স্বভাব মনে রাখিয়া নিত্য২ ঈশ্বরের নিকটে শক্তি ও অনুগ্রহ যাচ্ঞা কর, তাহাতে তিনি অবশ্য তাহা প্রদান করিবেন।
করুণা কিঞ্চিৎ কাল চিন্তিতা হইয়া রহিল, শেষে সে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, আ মেম সাহেব! যদ্যপিও আমি পূর্ব্বাপেক্ষা সদ্ব্যবহারিণী হই, তথাপি নবীনের বাপ ভাল না হইলে আমার ইহকালে কোন প্রকারে সুখ হইবে না।
আমি উত্তর করিলাম, করুণা, তোমার সদ্ব্যবহার ও মৃদু স্বভাব দেখিয়া বোধ হয় সেও ক্রমে২ ভাল হইতে পারিবে। কিন্তু যদ্যপি এমত সুঘটনা না হয়, তবে কি তুমি নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিবা? তুমি ঈশ্বরের সৃষ্ট বস্তু, ইহা মনে রাখিও। অতএব যাহা ঘটে, ঘটুক; ঈশ্বরকে প্রেম ও সেবা করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য, ইহা যদি মনে না রাখ, তবে তুমি ধর্মের পথে কিঞ্চিৎ ক্লেশ পাইলে বিরক্তা হইয়া তাহা ত্যাগ করিবা। যাহারা সুখ কি মান কিম্বা আর কোন সাংসারিক বস্তু পাইবার জন্যে সাধুদের পথে চলে, তাহারা যদি সে বস্তু না পায়, তবে নিরাশ হইয়া পূর্ব্বকালীন যিহূদীয়দের ন্যায় বলে, ঈশ্বরের সেবা করা বৃথা, এবং সৈন্যাধ্যক্ষ পরমেশ্বরের আজ্ঞা পালন করাতে ও তাঁহার সম্মুখে শোকাচার করাতে আমাদের লাভ কি? কিন্তু যাহারা ঈশ্বরের বিশেষতঃ তাঁহার পুত্ত্রের প্রতি প্রেম করিয়া সদাচারী হয়, তাহারা কোন আপদ প্রযুক্ত পিছে হাঁটিয়া যায় না; কারণ তাহারা জ্ঞাত আছে, যে ইহকালে যদ্যপি আমরা প্রকাশরূপে লাভ না পাই, তথাপি স্বর্গেতে প্রচুর ধন অবশ্য পাইব।
করুণা কাঁদিতে২ কহিল, হাঁ মেম সাহেব! এই কথা সত্য বটে। আহা! ঈশ্বর যদি আমার পাপ ক্ষমা করিয়া শেষে আমাকে স্বর্গে লন, তবে এই জগতে দুঃখ পাইলেও কিছু ক্ষতি নাই। আমি অনেক দোষ করিয়াছি তাহা জানি, তথাপি এখন আমার মনে এক প্রকার ভরসা উঠিতেছে, যে ঈশ্বর আমার প্রতি দয়া করিলেও করিতে পারেন। আজি অবধি আমি প্রাতঃকালে ও সন্ধ্যাকালে তাঁহার নিকটে প্রার্থনা করিব। ও মেম সাহেব, দীনহীন পাপিষ্ঠা যে আমি, আমাকেও যে আপনি শিক্ষা দিয়াছেন, এই কারণ পরমেশ্বর আপনাকে আশীর্ব্বাদ করুন!
অনন্তর আমি কহিলাম, আইস করুণা, আমরা এখনি হাঁটু পাতিয়া প্রার্থনা করি, যেন প্রভু তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া তোমার চেষ্টা সকল গ্রাহ্য করেন, ও তোমার স্বামির এবং তোমার সন্তানের মনকে পরিবর্ত্ত করান। করুণা কহিল, হাঁ মেম সাহেব, তাহাই করুন; কেননা আমি আপনা আপনি ভাল কর্ম্ম করিতে পারিব না। তখন আমরা উভয়ই হাঁটু গাড়িয়া করুণার যে২ পারমার্থিক দ্রব্যের প্রয়োজন ছিল, তাহা আমি এক২ করিয়া পরমেশ্বরকে জানাইলাম, এবং সেই প্রার্থনা সমাপ্ত হইলে পর করুণা ক্রন্দন করত আর কথা কহিতে পরিল না।
সে সময়ে প্রায় সন্ধ্যা হইয়াছিল, অতএব আমি করুণার নিকটে বিদায় হইয়া ঘরে গেলাম। তাহার সহিত সাক্ষাৎ করাতে আমার অন্তঃকরণ উল্লাসিত হইল, কারণ তখন বোধ করিলাম, যে ঈশ্বর ভারি যন্ত্রণাদ্বারা তাহার মনকে আপনার প্রতি আকর্ষণ করাইতে মনস্থ করিয়াছেন, এবং সান্ত্বনা বাক্য কহিবার জন্যে তাহাকে দুঃখরূপ অরণ্যেতে আনিয়াছেন; যেমন এই দেশস্থ এক জন কবি কহিয়াছেন, যথা,
ধার্ম্মিক লোকের এই নিশ্চয়, দুঃখ পাইলে সুখ হয়,
তাহার সাক্ষী দেখ না, আকাশে।
আগে রাত্রি পিছে দিন, জান সবে তাহার চিন,
সোণা রূপা অনলে পরশে॥
অষ্টম অধ্যায়
করুণা উক্ত সকল উপদেশ পাইয়া কিরূপ ব্যবহার করিবে, তাহা দেখিতে আমি এমত ইচ্ছুক ছিলাম, যে দুই দিন পরে পুনর্ব্বার তাহার গৃহে যাইয়া উপস্থিত হইলাম। ফুলমণির এবং করুণার ঘরের মধ্যে বিস্তর বিশেষ ছিল বটে, তথাপি দেখিলাম যে করুণা ঘরের সকল বস্তু পূর্ব্বাপেক্ষা কিছু পরিপাটি করিয়া রাখিয়াছে। উঠানে ঝাঁটি দেওয়া গিয়াছিল, কিন্তু ফুলমণি যেমন তাবৎ জঞ্জাল বাহিরে ফেলিয়া দিত, করুণা তেমন না করিয়া উঠানের এক কোণে তাহা ঢিপী করিয়া রাখিয়াছিল। সেও ঘরটি লেপন করিয়াছিল বটে, কিন্তু ফুলমণি যেমন লেপন করিয়া গোলা হাঁড়ি ঘরের পিছনে রাখিত, করুণা তেমন না করিয়া তাহা সম্মুখে ফেলিয়া রাখিয়াছিল।করুণা আমাকে দেখিবা মাত্র যে মোটা শাড়িখানি ফুলমণি তাহাকে দিয়াছিল, সে তাহা পরিয়া হাস্যমুখে বাহিরে আইল, এবং তাহার মাথাও সুন্দররূপে বাঁধা ছিল। আমি ঘরের মধ্যে গিয়া দেখিলাম যে করুণা কিছু পুরাতন কাপড় লইয়া একটি কোর্ত্তা সিলাই করিতেছিল। যদ্যপি সেই কোর্ত্তা ভাল কাটা হয় নাই, এবং সিলাই বড় মোটা, তথাপি তাহা দেখিয়া আমি অতিশয় সন্তুষ্টা হইয়া হাসিয়া বলিলাম, করুণা, তুমি তো বড় নিপুণ দরজী হইতেছ। ইহাতে করুণাও হাসিয়া উত্তর করিল, মেম সাহেব, যেমন পারি তেমনি করিতেছি। আগত রবিবারে গীর্জায় যাইব, অতএব ভাবিলাম, যে সেথায় যাইবার জন্যে একটি কোর্ত্তা তৈয়ার করিলে ভাল হয়।
আমি কহিলাম, তুমি উত্তম বুঝিয়াছ, এবং বোধ হয় কোন কর্ম্ম চেষ্টা করিলে অল্প দিনের মধ্যে এক খান ভাল শাড়িও কিনিতে পারিবা। ইংলণ্ডদেশে আমাদের একটি চলিত কথা আছে, যথা,
যেখানে যাইবার ইচ্ছা হয়।
সেখানে যাইবার পথ করয়॥
করুণা কহিল, হাঁ মেম সাহেব, আপনি সত্য বলিয়াছেন। ফুলমণি আমাকে এক উপায় দেখাইয়াছে, যাহাতে আমি এক মাসের মধ্যে একটি টাকা সঞ্চয় করিয়া গীর্জায় যাইবার নিমিত্তে একখান শাড়ি কিনিতে পারিব।
এমত কথা শুনিয়া আমি সন্তুষ্টা হইয়া জিজ্ঞাসিলাম, সে কেমন উপায় বল দেখি?
করুণা কহিল, আমাদের পাড়াতে কোন২ ধনি স্ত্রীলোকেরা সপ্তাহের মধ্যে একবার চারিটি পয়সা দিয়া পরের দ্বারা ঘর লেপিয়া লন। ফুলমণি বলিয়াছে যে আমি মহেন্দ্র বাবুর স্ত্রীকে এবং আর দুই তিন জনকে তোমার দুঃখের বিষয় জানাইব, তাহাতে তাঁহারা অবশ্য তোমাকে প্রতি সপ্তাহে ঐ কর্ম্ম করিতে ডাকিবেন। এমত হইলে আমার ভাবনা কি? সপ্তাহ গেলে চারি ঘরে যদি ৷৹ চারি আনা পাই, তবে স্বচ্ছন্দে মাসে এক টাকা উপার্জন করিতে পারিব। করুণা আরো জিজ্ঞাসিল, মেম সাহেব, আপনি কি শুনিয়াছেন যে মহেন্দ্র বাবুর স্ত্রী সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হইয়াছেন, এবং তিনি সকলের সাক্ষাতে বলিয়াছেন যে আমার বংশী তাঁহাকে মারে নাই, কিন্তু যে ব্যক্তির সঙ্গে বংশী গিয়াছিল সেই লোক ছুরিদ্বারা তাঁহার কুক্ষিদেশে আঘাত করিয়াছিল?
আমি কহিলাম, হাঁ করুণা, আমি কল্য তাহা শুনিয়া বড় সন্তুষ্টা হইলাম, কারণ যদ্যপি সে স্ত্রীলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় নাই, তথাপি সকলের মুখে তাঁহার প্রশংসা শুনিয়া থাকি।
করুণা বলিল, হাঁ মেম সাহেব, তাঁহার প্রশংসা আমাকেও করিতে হইবে, কেননা তিনি দরিদ্রদের প্রতি বড় দয়ালু।
তাহাতে আমি হাস্য করত কহিলাম, করুণা, তুমি যদি মাসে এক টাকা উপার্জন কর, তবে আপনাকে আর দরিদ্রা বলিও না, তুমি ক্রমে২ ধনী হইয়া উঠিবা।
করুণা বলিল, আ মেম সাহেব! এ কর্ম্ম করা যে সে কেবল পেটের জ্বালায়। ঘর লেপন করা বড় কঠিন কর্ম্ম, তাহা করিবার ভয়ে আমি আপনার ঘরটি ফেলিয়া রাখিতাম। এখন পরের ঘর লেপন করিতে হইল; তাহা পারি কি না, সে আগে দেখা যাউক।
আমি বলিলাম, করুণা, পারিবা না কেন? তুমি অবশ্য পারিবা। ঘর লেপিবার সময়ে ইহা মনে রাখিও, এখন আমি কর্ত্তব্য কর্ম্ম করিতেছি, তাহাতে তোমার পরিশ্রম লঘুতর বোধ হইবে; এবং কর্ম্ম করাতে আর একটি লাভ আছে, তদ্দ্বারা তুমি নিজ মনের দুঃখ বিস্মৃতা হইবা।
তদনন্তর আমি বলিলাম, করুণা, কল্য প্রাতঃকালে তোমার স্বামী জাগৃত হইলে কি ঘটিল, তাহাই বিশেষরূপে শুনিতে আসিয়াছি।
তাহাতে করুণা কহিল, ও মেম সাহেব, তাহার বিষয়ে অনেক কথা আছে। সে যখন সন্ধ্যাকালে মাতাল হয়, তখন পরদিবসে সর্ব্বদা তাহার মাথা বড় ভারী হয়, ও সে উঠিয়া বসিলেও ঝিমাইতে থাকে। তেমনি কল্য সে উঠিয়া কাহাকেও কিছু না বলিয়া ঝিমাইতে২ দাবায় তামাক খাইতে লাগিল; এমত সময়ে আমি তাহাকে গামছা ও তৈল আনিয়া দিয়া কহিলাম, ও গো, যদি তোমার মাথার ব্যথা হইয়া থাকে, তবে পুষ্করিণীতে স্নান করিয়া আাইস, বোধ হয়, তাহাতে ভাল হইবে; তুমি ফিরিয়া না আসিতে২ তোমার জন্যে ভাত রাঁধিয়া রাখিব। নবীনের বাপ উত্তর করিল, কি ভাগ্য করুণা! আজি তোমার কি হইয়াছে? আমার সুখ জন্মাইতে কেন এত যত্ন করিতেছ? বোধ হয়, তুমি আমাকে ফুসলাইয়া আমার কাছে পয়সা লইতে চাও; কিন্তু তাহা কথনও হইবে না, সে আগে থাকিতে বলি। যাহা হউক, আমি তোমার কথা শুনিয়া স্নান করিতে যাই, পরে আসিয়া ভাত খাইব। মেম সাহেব, আমি ভোরে উঠিয়া ঘর ঝাঁটি দিয়া সকল দ্রব্য সুন্দররূপে পরিষ্কার করিয়া রাখিয়াছিলাম, তাহাতে বোধ করিলাম, যে নবীনের বাপ তদ্দ্বারা সন্তুষ্ট হইবে; কিন্তু তাহার এইরূপ কঠিন বাক্য শুনিয়া আমি কিছু রাগান্বিতা হইয়া তাহাকে ভর্ৎসনা করিবার মানস করিতেছিলাম, এমত সময়ে আপনকার উপদেশ আমার স্মরণ হইল, তাহাতে আমি কিছু না বলিয়া চুপ করিয়া রহিলাম। পরে সে পুষ্করিণীহইতে ফিরিয়া আইলে আমি একটা মাজুর দাবায় বিছাইয়া তাহাকে ইলিস মাছের ব্যঞ্জন ও ভাল অম্ল ও ভাত আনিয়া দিলাম। সে তাহা দেখিয়া বড় আশ্চর্য্য জ্ঞান করিয়া কহিল, করুণা, আজি কি হইয়াছে, তাহা কিছু বুঝিতে পারিতেছি না। এমত ভাল খাওয়া তিন মাস পর্য্যন্ত পাই নাই; এই সকল আয়োজন কেন করিলা? এবং কোথায় বা পাইলা? তখন আমি কহিলাম, কেবল তোমাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্যে এই সকল প্রস্তুত করিয়াছি। এই কথাতে সে আমার মুখ পানে চাহিয়া আরো চমৎকৃত হইয়া কহিল, তুমি তো একেবারে নূতন মানুষ হইয়াছ! এমন স্বভাব যদি তোমার বরাবর থাকে, তবে আমার বড় ভাগ্য। পরে কোমরহইতে গেঁজিয়া বাহির করিয়া সে তাহা আমার সম্মুখে ফেলিয়া হাসিয়া কহিল, যাহা হউক করুণা, আজি তুমি ভুলাইয়া আমার পয়সা গুলিন লইলা; অতএব যাহা উহাতে থাকে তাহা বাহির করিয়া লও। গেঁজিয়াতে কেবল চারিটি পয়সা ছিল, তথাপি তাহা লইয়া নবীনের বাপকে বলিলাম, তোমার নিকটে এই যে চারিটি পয়সা পাইলাম, ইহাতে আমার বিস্তর বোধ হইল। পরে সে কহিল, আমার মাথা বড় বেদনা করিতেছে, অতএব তুমি যদি ওবেলাও আমাকে এইরূপ খাওয়াইতে পার, তবে আমি আজি কর্ম্মে না গিয়া ঘরে থাকি। মেম সাহেব, আপনি যে দুই টাকা দিয়াছিলেন, আমি তাহার বিষয় তাহাকে বলিতে ভয় করিলাম, পাছে যত দিন ঘরে কড়ি থাকে তত দিন সে কর্ম্মেতে না যায়; এই জন্যে কহিলাম, ভাল, আজি গৃহে থাক, আর কিছু ইলিস মাছ আছে, তাহাই সন্ধ্যাকালে রাঁধিয়া দিব।
ইহাতে আমি কহিলাম, করুণা, তুমি জ্ঞানির মত কর্ম্ম করিলা বটে। সে কথা শুনিয়া তোমার স্বামী কি সমস্ত দিন ঘরে রহিল?
করুণা উত্তর করিল, হাঁ মেম সাহেব, আর কি জানি কিসে তাহার মনে প্রবৃত্তি হইল, সে গোটা কতক বাঁস আনিয়া ঘরের বেড়া মেরামত করিতে লাগিল, তাহাতেই সকল আজি এমত শোভা দেখাইতেছে।
আমি কহিলাম, করুণা, তোমার বড় সৌভাগ্য দেখিতে পাই; ধর্ম্মপথে চলিতে তোমার স্বামী বাধা না দিয়া বরং তোমার উপকার করিতেছে।
করুণা কহিল, না মেম সাহেব, সম্পূর্ণরূপে এমত বলা যায় না; কিন্তু তাহার কথা আরও কিছু শুনুন। সন্ধ্যার সময়ে তাহার দুই তিন জন দুষ্ট সঙ্গিরা আসিয়া তাহাকে লইয়া যাইবার নিমিত্তে বিনতি করিতে লাগিল। প্রথমে সে যাইতে চাহিল না, কিন্তু ক্ষণেক পরে তাহারা সাধ্য সাধনা করাতে সে গেল। তথাপি সে যে তাহাদের সহিত গিয়া নিতান্ত মাতওয়ালা হইল এমত নয়, কিঞ্চিৎ মদ খাইয়া সে নয়টা বাজিলে ঘরে ফিরিয়া আইল।
তাহাতে আমি জিজ্ঞাসিলাম, আজি সে কোথায়? করুণা কহিল, মেম সাহেব, আহারাদি করিয়া আমি কর্ম্মেতে যাই বলিয়া সে প্রাতঃকালে বাহিরে গিয়াছে; এখন সে কি করে তাহা দেখা যাইবে।
আমি জিজ্ঞাসিলাম, তবে পরশু অবধি সে কি তোমাকে আর কোন প্রকারে কঠিন কথা কহে নাই? করুণা মাথা হেট করিয়া বলিল, না মেম। আমি আপন স্বামির নম্র ব্যবহার দেখিয়া টের পাইয়াছি, যদি পূর্ব্বাবধি তাহার প্রতি কোমল আচরণ করিয়া আসিতাম, তবে আমাদের এত দুঃখ কখন হইত না। করুণা এমত ভাবিয়া সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ লজ্জিতা হইল।
অনন্তর আমি জিজ্ঞাসিলাম, এই দুই দিনের মধ্যে কি ফুলমণি তোমার গৃহে আসিয়াছিল?
করুণা বলিল, হাঁ মেম সাহেব, আজি প্রাতঃকালে সে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্য্যন্ত এখানে ছিল। আমার পরিষ্কার কাপড় ও ঘরের পারিপাট্য দেখিয়া প্রথমে সে আশ্চর্য্য জ্ঞান করিয়া কহিল, করুণা, তুমি কি এত দিনের পর ভাল গৃহিণী হইলা? আপনকার সহিত পরশু যে সকল কথা হইয়াছিল, আমি সে সকল তাহাকে জ্ঞাত করিয়া কহিলাম; ফুলমণি, এই অবধি আমি তোমাকে নিদর্শন স্বরূপ জ্ঞান করিয়া ঈশ্বরের আদেশ পালন করিতে চেষ্টা করিব। ফুলমণি এই কথা শুনিয়া বড় আহ্লাদ পূর্ব্বক বলিল, আহা করুণা! তুমি আমার মনকে কেমন প্রফুল্ল করিলা। আমি সাধুর পিতার নিকটে প্রিয়নাথকে রাখিয়া আসিয়াছি, অতএব এক দণ্ড স্বচ্ছন্দে বসিয়া তোমার সহিত কথা কহিতে পারিব। তাহাতে সে আমাকে ধর্ম্ম পুস্তকের অনেক বচন কহিয়া এই পদটি মুখস্থ করাইল, যথা; “কঠিন বাক্য ও কোপ ও রাগ ও কলহ ও নিন্দা এবং তাবৎ জিঘাংসা, এই সকল তোমাদেরহইতে দূর হউক। আর খ্রীষ্টের অনুরোধে ঈশ্বর তোমাদিগকে যেমন ক্ষমা করিয়াছেন, তোমরা তেমনি দয়ালু ও কোমল অন্তঃকরণ হইয়া পরস্পর ক্ষমা কর।” পরে ফুলমণি আমার নিকটে অনেক ক্ষণ বসিয়া যীশু খ্রীষ্টের প্রেমের বিষয় কহিতে লাগিল, তাহাতে সে সকল মিষ্ট কথা আমি পূর্ব্বাপেক্ষা ভালরূপে বুঝিতে পারিয়া বোধ করিলাম, কি জানি যীশু আমাকেও ক্ষমা করিয়া স্বর্গে লইয়া যাইবেন। কিন্তু ফুলমণি গেলে পর আর এক জন স্ত্রীলোক আমাকে বংশির মা বলিয়া উচ্চেঃস্বরে ডাকিল। সে সময়ে আমি পরিত্রাণের বিষয়ে ভাবিতেছিলাম, এই জন্যে ঐ কথাতে আমার মনে বড় ভয় হইল; তাহাতে আমি কাঁদিতে২ বলিলাম, হায়! আমি বংশির মা বটে, কিন্তু আপন ছেল্যাকে নষ্ট করিয়াছি, অতএব এখন যে স্বর্গ পাইবার ভরসা করিতেছি, ইহা আমার নিতান্ত ভ্রম।
আমি কহিলাম, না করুণা, ভ্রম কেন হইবে? তোমার পাপ ভারী হইয়াছে বটে, অতএব পাপকে যে ক্ষুদ্র বিষয় বোধ কর, ইহা আমার কোন প্রকারে ইচ্ছা নয়; তথাপি একটি সান্ত্বনার কথা কহিতে হয়, যে সময়ে তুমি আপন ছেল্যার পরিত্রাণের বিষয়ে নিশ্চিন্তা ছিলা, সে সময়ে তুমি আপনি ধর্ম্মের বিষয়ে এক প্রকার অজ্ঞান ছিলা; কিন্তু যে খ্রীষ্টিয়ান লোক প্রভুর মহানুগ্রহের আস্বাদন করিয়াও আপন শিশুদিগকে সুশিক্ষা না দেয়, ও ভালরূপে শাসন না করে, তাহাদের দোষ তোমার দোষ অপেক্ষা শত গুণে বড়। হায়! ঈশ্বরের বিচার স্থানে দাঁড়াইয়া এমত ব্যক্তিগণকে কেমন ভয়ানক হিসাব দিতে হইবে। কিন্তু করুণা, তুমি ভয় না করিয়া এই২ কর্ম্ম কর; মন ফিরাইয়া প্রভু যীশু খ্রীষ্টের প্রতি বিশ্বাস কর, এবং আগত কালে পাপ ত্যাগ করিয়া সৎক্রিয়া কর। তোমার এখন একটি সন্তান আছে, তাহাকেই ধর্ম্মের পথে লওয়াও। এই সকল করিলে ঈশ্বর তোমার পূর্ব্বদোষ মুচিয়া ফেলিয়া খ্রীষ্টের অনুরোধে তোমাকে অবশ্য গ্রাহ্য করিবেন।
করুণা উক্ত কথা শুনিয়া আপন চক্ষের জল মুচিয়া কহিল, ও মেম সাহেব! সন্তানদিগকে শিক্ষা দি নাই, ইহাতে যে আমার ভারি দোষ হইয়াছে, তাহা আমি নবীনকে বলিয়াছি; আর যীশু খ্রীষ্ট কে, ও তিনি বা কি করিলেন, তাহা সাধ্য পর্য্যন্ত তাহাকে বুঝাইয়া দিয়া তাঁহার প্রতি বিশ্বাস করিতে বিনয় করিয়াছি।
আমি কহিলাম, করুণা, তুমি ভাল করিয়াছ। এমত কর্ম্মদ্বারা যে আমরা স্বর্গ লাভ করি, ইহা নয়; তথাপি কর্ণীলিয়ের প্রার্থনা ও দানাদি যে রূপ ঈশ্বরের গোচরে সাক্ষী স্বরূপ হইল, সেইরূপ তুমি যে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের সেবা করিতে বাঞ্ছা কর তোমার এই কর্ম্ম তাহারি সাক্ষী হইয়াছে।
পরে আমি করুণাকে জিজ্ঞাসিলাম, ফুলমণি কি আর কিছু বলিয়া যায় নাই?
করুণা উত্তর করিল, হাঁ মেম, সে আমাকে অনেক সুপরামর্শ দিয়া শেষে আমার সহিত প্রার্থনা করিল, যেন ঈশ্বর আমাকে সৎক্রিয়া করিতে শক্তি দেন, ও আমি যেন তাঁহাকে পূর্ব্বাপেক্ষা ভালরূপে সেবা করিতে পারি। পরে সে বিদায় লওনের সময়ে বলিল, করুণা, তোমার প্রতিদিনের সামান্য আচার ব্যবহার যাহাতে ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারে হইতে পারে, এই অভিপ্রায়ে ধর্ম্ম পুস্তকের কএকটি নিয়ম তোমাকে লিখিয়া দিতে সাধুর বাপকে বলিব; এবং এই দেখ, মেম সাহেব, দুই ঘণ্টা হইল সাধু এই তক্তিখানি আমাকে দিয়া গিয়াছে।
আমি সে তক্তি হাতে করিয়া দেখিলাম, যে প্রেমচাঁদ তাহাতে এক খান শাদা কাগজ বসাইয়া অতি স্পষ্ট রূপে বড়২ অক্ষরে ধর্ম্মপুস্তকহইতে তেরটা পদ লিখিয়াছে। ঐ বাক্য সকল বাঙ্গালা দেশস্থ খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকদের প্রতি অতি সুন্দররূপে খাটে, ইহা বুঝিয়া ধর্ম্মপুস্তকের কোন্ স্থানে সেই পদ পাওয়া যায় তাহা সে সময়ে লিখিয়া লইলাম, এবং এখন পাঠকবর্গের হিতার্থে বিস্তারিত রূপে ব্যাখ্যা করি। যথা,
খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকদের ব্যবহার্য্যের ধারা।
১ ঈশ্বরের প্রতি যাহা কর্ত্তব্য।
“তুমি সর্ব্বদাই পরমেশ্বরকে সম্মুখে রাখ।” দায়ূদের গীত। ১৬।৮।
“নিরন্তর প্রার্থনা কর।” থিষলনীকীয়দের প্রতি প্রথম পত্র। ৫।১৭।
“তুমি সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত পরমেশ্বরেতে বিশ্বাস কর; এবং আপন বুদ্ধিতে নির্ভর দিও না। আপন তাবৎ গতিতে তাঁহাকে স্বীকার কর; তাহাতে তিনি তোমার পথ সরল করিবেন।” হিতোপদেশ। ৩।৫, ৬।
স্মরণে রাখিও যে “তোমরা খ্রীষ্টের।” করিন্থীয় মণ্ডলীর প্রতি প্রথম পত্র। ৩।২৩।
“তোমরা ভোজন পান প্রভৃতি যে কোন কর্ম্ম কর, সে সকলি ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশের নিমিত্তে কর।” ১ করিন্থীয়। ১০।৩১।
২ পরিবারের প্রতি যাহা কর্ত্তব্য।
“তোমরা আপন২ পরিবারের প্রতি মনোযোগ কর, ও আলস্যের খাদ্য খাইও না।” হিতোপদেশ। ৩১।২৭।
“কার্য্যেতে নিরালস্য ও আত্মাতে উদ্যোগী হইয়া প্রভুর সেবা কর।” রোমীয়। ১২।১১।
“হে নারি সকল, তোমরা যেমন প্রভুর বশীভূতা তেমনি নিজ২ স্বামিরও বশতাপন্না হও।” ইফিষীয়। ৫।২২।
“তোমরা আপন২ সন্তানদিগকে প্রভুর শিক্ষা ও উপদেশ দিয়া প্রতিপালন কর।” ইফিষীয়। ৬।৪।
৩ প্রতিবাসির প্রতি যাহা কর্ত্তব্য।
“তুমি মুখ খুলিয়া জ্ঞানের কথা কহ, এবং তোমার জিহ্বাগ্রে অনুগ্রহের ব্যবস্থা থাকুক।” হিতোপদেশ। ৩১।২৬।
“তোমরা এক জন অন্যের প্রতি মিথ্যা কথা কহিও না; কেননা তোমরা কর্ম্মের সহিত পুরাতন স্বভাব পরিত্যাগ করিয়া সৃষ্টি কর্ত্তার প্রতিমূর্ত্তি অনুসারে জ্ঞানেতে পুনর্নির্ম্মিত যে নূতন স্বভাব তাহা গ্রহণ করিয়াছ।” কলসীয়। ৩।৯, ১০।
“তোমরা পরস্পর প্রেম বিনা আর কিছুতে কাহার ঋণী হইও না; এবং কেবল আত্মবিষয়ে নহে, কিন্তু পরের বিষয়েও মনোযোগ কর।” রোমীয়। ১৩।৮। ফিলীপীয়। ২।৪।
“তোমরা সুযোগ পাইলে সকল লোকের বিশেষতঃ বিশ্বাসকারি পরিবারের মঙ্গল করিও।” গলাতীয়। ৬।১০।
উক্ত বাক্য পড়িয়া আমি করুণাকে কহিলাম, করুণা, তুমি যদি এই নিয়মানুসারে চল, তবে তুমি ধন্যা বট; এবং ফুলমণি যে তোমার বন্ধু, এও বড় আহ্লাদের বিষয়। কিন্তু ইহা স্মরণে রাখিও, যদ্যপি তুমি তাহার পরামর্শে না চল ও তাহার সদ্ব্যবহার দেখিয়া আপনার ব্যবহার পরিবর্ত্তন না কর, তবে ঈশ্বরের নিকটে ভয়ঙ্কর হিসাব দিতে হইবে।
এই কথাতে করুণা চিন্তিতা ও মৌনী হইয়া থাকিল। পরে আমি তাহাকে জিজ্ঞাসিলাম, তুমি কি এই সকল ঈশ্বরীয় বচন ভালরূপে বুঝিয়াছ? করুণা বলিল, মেম সাহেব, যে অবধি সাধু ঐ তক্তি খানি আমাকে দিয়া গিয়াছে, সেই অবধি আমি ঐ বাক্যের মর্ম্ম মনেতে আন্দোলন করিতেছি; কিন্তু তাহার মধ্যে দুইটি পদ আমাকে কিছু কঠিন বোধ হইতেছে। আমি জিজ্ঞাসিলাম, কোন্২ পদ, তাহা আমাকে বল; আমি আহ্লাদপূর্ব্বক তাহা বুঝাইয়া দিব, এবং ঈশ্বরের নিকটে প্রার্থনা করিব যেন তিনি আপন নিগূঢ় বাক্য তোমার বোধগম্য করিয়া দেন।
করুণা বলিল, মেম সাহেব, চতুর্থ নিয়ম এই, “তোমরা খ্রীষ্টের,” ইহা স্মরণে রাখিও; কিন্তু এই কথা কি নিমিত্তে স্মরণে রাখিতে হয়, তাহা ভালরূপে বুঝিলাম না।
আমি কহিলাম, করুণা, তোমাকে একটি দৃষ্টান্ত বলি শুন। অন্য দেশীয় একজন রাজা তোমাকে ধরিয়া কারাগারে রাখিয়া যদি এই কথা বলে, তুমি আমাকে ১০০০০ দশ সহস্র টাকা আনিয়া না দিলে আমি তোমাকে মারিয়া ফেলিব। এমত হইলে তুমি কি করিবা? তোমার কাছে টাকা নাই, এবং তোমার দরিদ্র বন্ধুবান্ধবেরা যে দশ সহস্র টাকা দিতে পারিবে, ইহা নিতান্ত অসম্ভব কথা। তাহারা তোমাকে রক্ষা করিতে চাহিলেও কি জানি সকলে একত্র হইয়া এক শত ১০০ টাকা পর্য্যন্ত যোগাইতে পারিবে না, সুতরাং তোমার আর কোন উপায় না থাকাতে তোমাকে মরিতে হইবে। প্রাণদণ্ড কারক হাতে খড়্গ লইয়া তোমাকে ধরিয়াছে, এমত সময়ে যদি এক জন ধনি ব্যক্তি আসিয়া উপস্থিত হন, এবং তিনি অসীম দয়া প্রকাশ করিয়া প্রেমিক ও মৃদু রবে বলেন, ও দুর্ভাগ্যা স্ত্রি! তোমার যদি বাঁচিবার ইচ্ছা থাকে, তবে আমার কথা শুন। আমি তোমার শত্রুকে দশ সহস্র টাকা দিয়া তোমাকে রক্ষা করি, কিন্তু এমত করিলে তুমি চিরকাল আমার দাসী হইবা; আমি তোমাকে কিনিয়া লওয়াতে তুমি আর কোন কর্ত্তার সেবা করিতে পারিবা না। আমার নিকটে যদি এই স্বীকার কর, তবে আমি তোমাকে রক্ষা করি; কিন্তু আমার আজ্ঞা যে কঠিন হইবে, এমত বোধ করিও না, কেননা যাহাতে তোমারই হিত জন্মে কেবল এমত আজ্ঞা করিব। করুণা, এখন জিজ্ঞাসা করি, তুমি এমত দয়ালু ব্যক্তিকে কি উত্তর দিবা?
করুণা বলিল, ও মেম সাহেব, আমি তখনি তাঁহার নিয়মে স্বীকৃতা হইয়া সর্ব্বদা তাঁহার নিকটে বাধ্য হইয়া থাকিতাম।
আমি কহিলাম, হাঁ করুণা, ঐ প্রকার কর্ম্ম করা তোমার উচিত হইত বটে; কিন্তু কিছু দিন পরে তুমি যদি ঐ ব্যক্তির সেবা ছাড়িয়া তাঁহার এক জন শত্রুর নিকটে কর্ম্ম করিতে যাইতা, তবে তোমার বিষয়ে কি বলা যাইত? করুণা কহিল, মেম সাহেব, এমত যদি করিতাম, তবে আমাকে অবশ্য দুষ্টা ও অকৃতজ্ঞা স্ত্রী বলিত। আমি কহিলাম, করুণা, তবে বল দেখি, এমত অকৃতজ্ঞের মত কর্ম্ম যেন তোমাহইতে না হয়, এই অভিপ্রায়ে আপন মনকে কি প্রকারে রক্ষা করিতা? করুণা উত্তর করিল, মেম সাহেব, আমি সর্ব্বদা ইহা মনে রাখিতাম, যে আমি মৃতপ্রায় হইয়াছিলাম, এমত সময়ে আমার দয়ালু কর্ত্তা টাকা দিয়া আমাকে মৃত্যুহইতে বাঁচাইলেন, তাহাতে আমি এক প্রকার তাঁহার ক্রীতা দাসী হইয়াছি, অতএব এখন যদি তাঁহাকে ছাড়িয়া পরের সেবা করি, তবে ইহাতে বড় অধর্ম্ম হইবে।
আমি বলিলাম, ভাল কহিয়াছ করুণা, তুমি আমার দৃষ্টান্তের তাৎপর্য্য সুন্দররূপে বুঝিয়াছ। এখন বোধ করি, “তোমরা খ্রীষ্টের, ইহা স্মরণে রাখিও,” এই কথা সাধুর বাপ কি অভিপ্রায়ে লিখিল তাহাও বুঝিতে পরিবা।
করুণা প্রফুল্ল বদন হইয়া কহিল, হাঁ২, এখন আমি বুঝিয়াছি বটে। আমি পাপ রোগে মৃতপ্রায় হইয়া নরকের পথে যাইতেছিলাম, এমত সময়ে খ্রীষ্ট দশ সহস্র টাকা না দিয়া আপন বহুমূল্য রক্ত ব্যয় করিয়া আমাকে রক্ষা করিলেন; অতএব এখন আমি তাঁহারি হইয়াছি, ইহা সর্ব্বদা স্মরণে রাখিলে আমি শয়তানের সেবা কোন প্রকারে না করিয়া কেবল আপন দয়ালু ত্রাণকর্ত্তার নিকটে বাধ্য হইয়া থাকিব।
করুণার এইরূপ বাক্য শুনিয়া আমি অতিশয় আহ্লাদিতা হইলাম, যেহেতুক তদ্দ্বারা বোধ করিলাম, এ ব্যক্তি যদি ধর্ম্মাত্মাহইতে শিক্ষিতা না হইত, তবে সে এমত কথা কহিতে পারিত না।
ঈশ্বর যে আমার প্রার্থনা শুনিয়া করুণাকে এরূপ শিক্ষা দিলেন, এই জন্যে আমি মনে২ তাঁহার ধন্যবাদ করিয়া কহিলাম, এখন করুণা, তুমি আর কোন্ কথা বুঝিতে পার নাই, তাহা আমাকে বল।
করুণা কহিল, মেম সাহেব, পঞ্চম নিয়ম এই, “তোমরা ভোজন পান প্রভৃতি যে কোন কর্ম্ম কর, সে সকলি ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশের নিমিত্তে কর;” কিন্তু আমাদিগকে দিনে২ আপন সন্তোষের নিমিত্তে অনেক প্রকার ক্ষুদ্র২ কর্ম্ম করিতে হয়, তবে সে সকল কর্ম্মদ্বারা ঈশ্বরের মহিমা কিরূপে প্রকাশ হইবে?
আমি কহিলাম, করুণা, বোধ করি পৌল প্রেরিত ঐ বিধি দৃঢ়রূপে স্থাপন করিবার জন্যে এই প্রকার কথা লিখিলেন। সেই কথার অভিপ্রায় এই, কেবল মহৎ কর্ম্মে নয় বরং ক্ষুদ্র কর্ম্মেও ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ করা উচিত; তাহাতে বোধ হয়, তিনি দৃষ্টান্তভাবে ভোজন পান করিবার বিষয় কহিলেন। ভোজন পানদ্বারা যে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ করা যায় না, এমত অনুমান করিও না। অনেক খ্রীষ্টিয়ান লোকেরা এই বাক্যেতে মনোযোগ না করিয়া কেবল আত্মসুখের জন্যে আহারাদি করে, কিন্তু এমত করা উচিত নয়। ইন্দ্রিয়গণের বশীভূত ব্যক্তি পেটুক হইয়া অপরিমিত ভোজন পান করে, তাহাতে তাহার শরীর ক্রমে২ নিস্তেজ ও স্থূল হইলে সে ঈশ্বরের সেবা করিতে অক্ষম হয়। কিন্তু সত্য খ্রীষ্টিয়ান ব্যক্তি সেইরূপ না করিয়া পরিমিত আচরণ করে; ফলতঃ সে ঈশ্বরের দত্ত বস্তু ভোজন পান করিবার সময়ে ইহা মনে রাখে, যে আমার শরীর পরমেশ্বরের খাদ্য দ্রব্যদ্বারা প্রতিপালিত ও সবল হইতেছে, অতএব সে শরীর তাঁহারি হইল, এবং তাঁহারি কার্য্যে তাহা ব্যয় করা কর্ত্তব্য। পেয় দ্রব্যের বিষয়েও এইরূপ বলা যায়। পরমেশ্বর মনুষ্যদের পান করিবার জন্যে জল ও দুগ্ধ আদি নানা প্রকার সদ্গুণযুক্ত উত্তম দ্রব্য দান করিয়াছেন, এবং যতকাল মনুষ্যেরা কেবল ঐ সকল দ্রব্য পান করে, তত দিন তাহাদের জ্ঞানচক্ষুঃ নির্ম্মল থাকে, ও তাহারা সেই জ্ঞান ও বুদ্ধিদ্বারা ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ করিতে পারে; কিন্তু যখন তাহারা মদ্যাদি পান করিতে আরম্ভ করে, ও তদ্দ্বারা মাতওয়ালা হয়, তখন তাহারা শয়তানের বশীভূত হইয়া তাহারই মহিমা প্রকাশ করিবার হেতু পান করে, ও আপনার শরীর ও আত্মা উভয়কে নষ্ট করে। আরো বলি, করুণা, যাহাতে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ হয়, এমত আর২ অনেক ক্ষুদ্র কর্ম্ম আছে। দেখ, আমি তোমার ঘরে আসিয়া দেখিলাম, তুমি একটা কোর্ত্তা সিলাই করিতেছ, তাহাতে তুমি আমাকে কহিলা, গীর্জায় যাওয়া আমার কর্ত্তব্য, এবং যাহারা গীর্জায় যায়, তাহাদিগকে উপযুক্ত বস্ত্র পরিয়া যাইতে হয়, কারণ ঈশ্বর কহিয়াছেন, বিহিতরূপে সকল কর্ম্ম কর; তুমি এই আজ্ঞা পালন করিতে চাহিয়া ঐ কোর্ত্তাটি সিলাই করিতে লাগিয়াছ। অতএব বোধ হয়, এই ক্ষুদ্র কর্ম্মের বিষয়ে বলা যায় যে তদ্দ্বারা ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ হইতেছে। এই প্রকার আরো অনেক দৃষ্টান্ত দেখাইতে পারি। তুমি আপন স্বামির বশীভূতা হও, কেননা ঈশ্বর এমত আজ্ঞা করিয়াছেন; এবং সন্তানদিগকে সুশিক্ষা দেও, যেন তাহারা ঈশ্বরের সেবা করিতে পারে; ও আত্মসুখের নিমিত্তে কিম্বা মান্য হইবার জন্যে নয়, কিন্তু ঈশ্বরের সন্তোষ জন্মাইবার জন্যে দরিদ্রদের প্রতি দয়া কর; এবং বিশেষরূপে খ্রীষ্টিয়ানদের প্রতি প্রেমিক ব্যবহার কর, কারণ তাহারা প্রভুর পরিবার; সকলের প্রতি সরল আচরণ কর, মনুষ্যের ভয়ে তাহা নয়, কিন্তু ঈশ্বর এমত আদেশ করিয়াছেন, এই নিমিত্তে তাহা কর। এই২ সকল করিলে তদ্দ্বারা ঈশ্বরের মহিমা অবশ্য প্রকাশ হইবে। এখন করুণা, তুমি ঐ পঞ্চম নিয়ম বুঝিয়াছ কি না?
করুণা বলিল, হাঁ মেম সাহেব, বুঝিয়াছি।
আমি তাহার সহিত আরো কথোপকথন করিতে ইচ্ছুক ছিলাম, কিন্তু সেই সময়ে দূরে দেখিলাম, যে নবীনের বাপ ক্ষেত্রের উপর দিয়া ঘরে আসিতেছে। তাহাতে করুণা শীঘ্র উঠিয়া দ্বারের নিকটে গেল, এবং তাহার স্বামিকে দেখিবা মাত্র সে প্রফুল্ল বদনে কহিল,ও মেম সাহেব, তাহার সঙ্গে কোন দুষ্ট লোক নাই, এবং সে টল্মল্ না করিয়া ভাল মানুষের মত আসিতেছে। আজি সে মাতওয়ালা হয় নাই। হায়! সে যদি মদ্যপান ত্যাগ করে, তবে আমার ভাবনা কি? আমি তাহার সহিত অতি সুখে বাস করিতে পারিব, কেননা মাতওয়ালা না হইলে নবীনের বাপ আমার প্রতি কোন দৌরাত্ম্য করে না।
স্বামিকে ভাল হইবার লক্ষণ দেখিবা মাত্র তাহার স্ত্রী যে এইরূপ প্রেমের কথা কহিল, তাহাতে আমি উল্লাসিতা হইলেও আশ্চর্য্যজ্ঞান করিলাম না, কারণ যৌবন কালে বিবাহিত স্বামি অপেক্ষা এই জগতের মধ্যে এমত প্রিয়তম সম্বন্ধ আর কাহারও সহিত হয় না। আমি করুণার নিকটে এই কথা বলিয়া বিদায় হইলাম, করুণা, তুমি শীঘ্র তোমার স্বামির জন্যে তামাক সাজিয়া রাখ; সে প্রায় এক ক্রোশ পথ হাঁটিয়া আসিতেছে, অতএব বোধ হয় আসিবা মাত্র তামাক খাইতে চাহিবে। পরে ঘরের বাহির হইলে নবীনের পিতার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল, সে আমাকে অতি নম্রতা পূর্ব্বক সেলাম করিয়া বাটীর ভিতরে প্রবেশ করিল। করুণা যেমত বলিয়াছিল, আমি সেই মত দেখিলাম, সে এখন মাতওয়ালা হয় নাই বটে। হে স্ত্রীগণ, তোমরা মন দিয়া শুন; যে ব্যক্তি প্রতিদিবস মাতাল হইয়া অর্দ্ধ রাত্রি পর্য্যন্ত পথে পড়িয়া থাকিত, এখন সে ব্যক্তি কিছু মদ্যাদি পান না করিয়া বেলা থাকিতে২ ঘরে ফিরিয়া আইল। কি জন্যে এমত করিল তাহা বলি, শুন; তাহার স্ত্রী তিন দিবস পর্য্যন্ত তাহার গৃহ পরিপাটি করিয়া তাহাকে প্রেমের বাক্য কহিয়াছিল।
পরে গাড়ীতে উঠিবার সময়ে ফুলমণি শীঘ্র আসিয়া আমাকে আপন ঘরে ডাকিল, তাহাতে আমি নামিয়া তাহার নিকটে গেলাম। তাহার চক্ষে জল ছল্২ করিতেছিল বটে, তথাপি আমি টের পাইলাম, যে সে জল দুঃখ প্রযুক্ত নয়, কিন্তু অত্যন্ত আনন্দদ্বারা জন্মিয়াছে। ফুলমণি অতিশয় প্রফুল্ল বদনে কহিল, ও মেম সাহেব! এত দিন পরে আপনি আমার সুন্দরীকে দেখিতে পাইবেন; আজি পাদরি সাহেব আমাকে বলিলেন, আমার ভগিনী এই সপ্তাহের মধ্যে আসিবেন, এবং বোধ করি তিনি তিন মাস পর্য্যন্ত এখানে থাকিবেন। মেম সাহেব, আপনি আমাসকলের প্রতি বড় প্রেম করেন, এই জন্যে আমার মেয়্যাকে আপনাকে দেখাইতে অতিশয় বাঞ্ছা আছে। লোকে তাহাকে পরম সুন্দরী কহে, কিন্তু আপনি তাহাকে দেখিলে সে বিষয় বিচার করিবেন। সুন্দরী আইলে পর আপনাকে সেলাম করিবার জন্যে আমি কি তাহাকে আপনার বাটীতে লইয়া যাইব, কি আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমাদের ঘরে আসিবেন?
আমি কহিলাম, ফুলমণি, তোমার মেয়্যাকে আমার বাটীতে লইয়া যাইও না; আমি তোমাদের ঘরে আসিব, কারণ আমি সুন্দরীকে তাহার ভাই ভগিনীর সহিত দেখিতে চাহি। বোধ হয়, সাধু ও সত্যবতী বড় আহ্লাদিত হইয়াছে।
ফুলমণি কহিল, ও মেম সাহেব, তাহাদের আমোদের সীমা নাই; আজি সমস্ত দিন সত্যবর্তী নাচিতে২ দিদি আসিতেছে২ এই কথা সকলকে বলিয়াছে।
আমি কহিলাম, ফুলমণি, আমিও তোমার সহিত আনন্দ করি। যে দিন তোমার সহিত প্রথমে আমার সাক্ষাৎ হইল, সেই দিন অবধি আমি সুন্দরীকে দেখিতে ইচ্ছুক আছি; তাহার ভাঙ্গা গোলাপ চারার বিষয় আমি অদ্যাবধি ভুলি নাই।
ফুলমণি বলিল, ও মেম সাহেব, সে অনেক দিনের কথা, বোধ করিতেছিলাম যে সে আপনকার মনে পড়িবে না।
আমি বলিলাম, হাঁ ফুলমণি, সে এক বৎসরের কথা হইল বটে, তথাপি ঐ গোলাপ চারার বিষয় তোমার মেয়্যার যে সুন্দর উপদেশ, তাহা আমি কখন ভুলিব না। ফুলমণি, ইহাও তোমাকে বলি, যদ্যপিও আমি ইংরাজি বিবি এবং তুমি বাঙ্গালি স্ত্রীলোক, তথাপি তোমার সহিত যে আমার সাক্ষাৎ হইল, এই জন্যে আমি অনেকবার ঈশ্বরের ধন্যবাদ করিয়াছি। তোমার সহিত আলাপ করিয়া আমার মন বিস্তর সান্ত্বনা পাইয়াছে, এবং সকল ধর্ম্মকর্ম্মে তুমি আমাকে সর্ব্বদা সাহায্য করিয়াছ।
এই কথা শুনিয়া ফুলমণির চক্ষুহইতে জল পড়িতে লাগিল। পরে সে কহিল, মেম সাহেব, আপনি আমাদিগকে বড় প্রেম করেন, তাহা আমি জানি, কিন্তু আমরা তাহার যোগ্যপাত্র নহি। আমি আপনকার সাহায্যার্থে কি করিয়াছি? যাহারা ভাল হইয়াছে তাহারা আপনারই শিক্ষাদ্বারা হইয়াছে।
আমি কহিলাম, না না ফুলমণি, এমত কথা বলিও না। আমি নয়, কিন্তু ধর্ম্মাত্মা তাহাদের মনে আপন বাক্যরূপ বীজ ফলবান্ করিয়াছেন; ফলতঃ আমরা সে বীজ বপন করিতে পারিয়াছিলাম, এই হেতুক পরমেশ্বরের ধন্যবাদ করা আমাদের কর্ত্তব্য। আমি যেরূপ পূর্ব্বে একবার বলিয়াছিলাম, সেইরূপ আরবার বলি, আমি যে স্থানে বীজ বপন করিয়াছি, সেই স্থানে তুমি প্রার্থনা ও সদুপদেশরূপ জল সেচন করিয়াছ; তাহাতে যদি কোন ফল উৎপন্ন হইয়া থাকে, তবে আমরা উভয়ে মিলিয়া উল্লাসিতা হইতে পারি। গত বৎসরের মধ্যে ঈশ্বর আমাদিগকে কেমন ধর্ম্মরূপ ফসল দিয়াছেন, তাহা আমরা বিবেচনা করিয়া দেখি; কেননা তাঁহার অনুগ্রহ চিন্তা করণদ্বারা আমাদের মনে তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা জন্মে। প্রথমে আয়ার কথা বলিতে হয়। আমি যখন এই স্থানে আইলাম, তখন সে মিথ্যা পয়গম্বরের মতালম্বী ছিল; এখন সে যীশুর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখিতেছে। আয়া আমাকে অনেকবার বলিয়াছে, আমি প্রথমে ফুলমণির ছেল্যাদের ব্যবহার দেখিয়া ও তাহাদের কথাবার্ত্তা শুনিয়া ধর্ম্মের বিষয়ে ভাবিতে লাগিলাম।
ইহা শুনিয়া ফুলমণি স্বর্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া মৃদুস্বরে বলিল, হে দয়ালু পিতঃ! আমি তোমার ধন্যবাদ করি।
পরে আমি কহিলাম, রাণীর বিষয়েও মনযোগ কর। সে এখন কিরূপ সদাচারণ করিতেছে, ও তাহার দুষ্টা ঝকড়াটে শাশুড়ীর প্রতি কেমন সহিষ্ণুতা প্রকাশ করিয়া তাহার সকল আজ্ঞা পালন করিতেছে। ফুলমণি, রাণী তোমারই ধর্ম্ম মেয়্যা; তাহার সহিত ধর্ম্মের বিষয়ে আমার তো প্রায় কথা হয় নাই।
ফুলমণি কহিল, মেম সাহেব, সে আপনার স্বামী মধুর ভয়ানক মৃতু্য দেখিয়া আপন আত্মার বিষয়ে প্রথমে চিন্তা করিতে লাগিল; এবং দুই দিবস পরে তাহার প্রসব হওনের সময়ে ঈশ্বর তাহার প্রতি অতি দয়া প্রকাশ করিলেন, তদ্দ্বারা তাহার মন বিশেষরূপে নম্র হইল, ইহা সে আপনি আমাকে বলিয়াছে। সে যাহা হউক, মেম সাহেব, রাণী যদ্যপি আমার ধর্ম্ম মেয়্যা হয়, তবে আমাদের প্রিয়া করুণাকে আপনকার শিষ্য অবশ্য বলিতে হইবে। ও মেম সাহেব, শেষ দিবসে সে আপনকার পক্ষে আনন্দরূপ মুকুট হইবে; কারণ করুণার মন অতিশয় প্রেমিক, এবং সে যদি সত্য খ্রীষ্টিয়ান হয়, তবে বোধ হয় অনেকের ন্যায় খ্রীষ্টের প্রতি তাহার প্রেম কখন শীতল হইবে না।
আমি কহিলাম, ফুলমণি, করুণার শিক্ষাতে তুমি আমাকে কিপর্য্যন্ত সাহায্য করিয়াছ, তাহা আমি কখন ভুলিব না। কিন্তু তোমার মনে এখন কেমন লয়? করুণা যে সত্য খ্রীষ্টিয়ান হইবে, এমত কি তোমার ভরসা আছে?
ফুলমণি উত্তর করিল, মেম সাহেব, অবশ্য আছে। করুণা আমাদের প্রভুর উপর নির্ভর দিয়া অসৎকর্ম্ম ত্যাগ করিতে ও সৎকর্ম্ম করিতে চেষ্টান্বিতা আছে; এবং সে যে কৃতকার্য্য হইবে ইহার কোন সন্দেহ নাই, কারণ প্রভু আপনি কহিয়াছেন, “আমি তোমাদিগকে এক নূতন অন্তঃকরণ দিব, ও তোমাদের অন্তরে এক নূতন আত্মা স্থাপন করিব।” যিহিষ্কেল ৩৬।২৬।
আমি কহিলাম, হাঁ ফুলমণি, সে সত্য বটে, কেননা প্রভু আপন বাক্য সফল করণার্থে তাহার মনকে দুঃখদ্বারা এখন অনেক নম্র করিয়াছেন।
ফুলমণি বলিল, আ মেম সাহেব! এ কেমন খেদের বিষয়, যে পর্য্যন্ত আমরা দুঃখরূপ দণ্ড ভোগ না করি, সেই পর্য্যন্ত আমরা খ্রীষ্টের যোঁয়ালি বহিতে অসম্মত হই; কিন্তু দুঃখদ্বারা যদি তিনি আপনার প্রতি আমাদের মনকে আকর্ষণ করেন, তবে সেই দুঃখের নিমিত্তে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিতে হয়। তিনি করুণার প্রতি এমত করিয়াছেন; আর সে যদি সত্য খ্রীষ্টিয়ান হয়, তবে তাহার স্বামীও ধর্ম্মের বিষয়ে মনোযোগ করিবে, আমার এমত ভরসা আছে।
আমি কহিলাম, হাঁ ফুলমণি, আমিও এইরূপ ভাবিয়াছিলাম; অতএব আইস, আমাদের বাঞ্ছা সফল করণার্থে আমরা দুই জনে আজি অবধি নবীনের পিতার নিমিত্তে প্রার্থনা করিতে আরম্ভ করি। তাহার সহিত আমাদের বড় একটা আলাপ নাই বটে, কিন্তু প্রভু বলিয়াছেন, পৃথিবীতে তোমাদের মধ্যে দুই জন যদি এক পরামর্শ হইয়া কিছু প্রার্থনা করে, তবে আমার স্বর্গস্থ পিতাদ্বারা তাহা তাহাদের জন্যে সম্পন্ন হইবে। এমত অঙ্গীকার পাইয়া আমরা যেন কিছু ভয় না করি, কারণ ঈশ্বরের বাক্যানুসারে আমাদের প্রার্থনা অবশ্য সফল হইবে। এই কথা বলিয়া আমি বিদায় হইলাম, এবং নিশ্চয় বলিতে পারি যে সে রাত্রিতে ফুলমণি ও আমি দয়ার সিংহাসনের নিকটে ঐ দুষ্ট ব্যক্তির পরিত্রাণ চাহিতে বিস্মৃতা হইলাম না।
নবম অধ্যায়
পূর্ব্বোক্ত পরিবারগণের বিবরণ বাহুল্যরূপে লেখা অনাবশ্যক; কিন্তু তাহা সমাপ্ত করিবার পূর্ব্বে ফুলমণির জ্যেষ্ঠ কন্যার চরিত্রের বিষয় পাঠকদিগকে কিঞ্চিৎ জ্ঞাত করিতে আমার বড় ইচ্ছা হয়। তাঁহাদের অবশ্য স্মরণ থাকিবে যে এই ইতিহাসের আরম্ভে ঐ কন্যার বৃত্তান্ত কিছু লিখিত আছে; ভরসা করি সুন্দরীর নিষ্কপট ধর্ম্মের ও পিতামাতার প্রতি অত্যন্ত প্রেমের বিষয় পড়িয়া তাঁহারা তাহার বিষয়ে আরও কিঞ্চিৎ শুনিতে ইচ্ছুক হইবেন।সুন্দরীর আসিবার বিষয়ে ফুলমণির সহিত কথা হইলে পর রবিবারে আমি গীর্জাতে পাদরি সাহেবের পরিবারের সহিত এক জন নূতন মেমকে দেখিলাম, এবং দেখিয়া তৎক্ষণাৎ বোধ করিলাম, ইনি অবশ্য সুন্দরীর কর্ত্রী হইবেন। এমত হইলে আমি ফুলমণির গৃহে শীঘ্র যাইতে মনস্থ করিলাম, কেননা তাহাকে সন্তুষ্টা করিতে ও তাহার কন্যাকে দেখিতে আমার বড় ইচ্ছা ছিল।অতএব পর দিন সন্ধ্যাকালে আমি তথায় গিয়া উপস্থিতা হইলাম। ফুলমণি আমাকে গাড়ীহইতে নামিতে দেখিবা মাত্র বাহিরে আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিল। আমি তাহার প্রফুল্ল বদন দেখিয়া কহিলাম, ফুলমণি, কেমন? তোমার মেয়্যাকে কুশলে পাইলা?
সে উত্তর করিল, হাঁ মেম সাহেব, ঈশ্বরের অনুগ্রহেতে পাইয়াছি বটে, এবং আমার দৃষ্টিতে বোধ হয়, তাহার শরীরের সৌন্দর্য্য ও তাহাহইতে অধিক মূল্যবান যে মনের সৌন্দর্য্য এই উভয়েতে আমার মেয়্যা পূর্ব্বাপেক্ষা বিস্তর বাড়িয়াছে।
আমি বলিলাম, ফুলমণি, ঈশ্বর কহিয়াছেন, “হে ধার্ম্মিকগণ, তোমাদের মঙ্গল হইবে, ও তোমরা আপন২ ক্রিয়ার ফল ভোগ করিবা। আমি আপন মর্য্যাদাকারিদিগকে মর্য্যাদা করিব, কিন্তু আমার তুচ্ছকারিগণ তুচ্ছীকৃত হইবে”। তুমি আপন মেয়্যাকে প্রভুর শিক্ষা ও উপদেশ দিয়া ঈশ্বরের মর্য্যাদা করিলা, তাহাতে তিনি এখন ঐ কন্যাকে ধার্ম্মিকা ও সুশীলা করিয়া সকলের সাক্ষাতে তোমার মর্য্যাদা করিতেছেন।
এই কথা বলিয়া আমি উঠানে প্রবেশ করিলাম। সুন্দরী দাবাতে একটা মাজুর বিছাইয়া ঘরের প্রতি মুখ ফিরাইয়া বসিয়াছিল, তাহাতে সে প্রথমে আমাকে দেখিতে পাইল না। সাধু তাহার পার্শ্বে বসিয়াছে, এবং সত্যবতী আপন ভগিনীর গালে হাত বুলাইয়া বলিতেছে, ও দিদি! তুমি পূর্ব্বে যেমন সুন্দর গল্প বলিতা, তেমন একটি গল্প এখন আমাদিগকে বল। পরে সে আমাকে টের পাইয়া শীঘ্র উঠিয়া কহিল, ওগো দিদি! সেই মেম সাহেব আসিয়াছেন।
ইহাতে সুন্দরী উঠিয়া আমাকে সেলাম করিল। আমি তাহার সৌন্দর্য্যের বিষয়ে যাহা শুনিয়াছিলাম, তাহা যথার্থ বোধ হইল। সে অতিশয় রূপবতী ছিল বটে; বিশেষতঃ তাহার বর্ণ গৌর, এবং তাহার যেমন সুন্দর ও বড় চক্ষুঃ তেমন আমি আর কাহারো দেখি নাই। তাহার বদন লাবণ্যযুক্ত, এবং সে সুন্দররূপে গমন করিত। সুন্দরী কিছু মাত্র অসভ্য না হইয়া বড় লজ্জাবতী ছিল, কিন্তু কোন কপট লজ্জা প্রকাশ করিত না, কারণ মেম সাহেবদের সহিত আলাপ করা তাহার অভ্যাস ছিল।
আমি তাহাকে বলিলাম, সুন্দরি, আমি তোমাকে দেখিয়া সন্তুষ্টা হইলাম; আমি অনেক দিন পর্য্যন্ত তোমার আগমনের অপেক্ষাতে আছি। বোধ হয়, আমি কে তাহা তুমি শুনিয়া থাকিবা।
সুন্দরী উত্তর করিল, হাঁ মেম সাহেব, আমার পিতা মাতার প্রতি আপনকার সকল অনুগ্রহের বিষয় আমার ছোট ভাই ও ভগিনী আমাকে বলিয়াছে। মেম সাহেব, এই জন্যে ঈশ্বর আপনাকে আশীর্ব্বাদ করুন! ইহা বলিয়া তাহার চক্ষুঃ জলেতে পরিপূর্ণ হইল। সত্যবতী ইহা দেখিয়া অঞ্চল লইয়া তাহার ভগিনীর চক্ষুঃ শীঘ্র মুছাইয়া কহিল, না না দিদি! এখন তোমার কাঁদা উচিত নয়, কেননা এই আমাদের আনন্দের সময়। পরে ঐ কথা যেন সকলে ভুলিয়া যায়, এই অভিপ্রায়ে সে আমার প্রতি ফিরিয়া কহিল, মেম সাহেব, দিদি কলিকাতাহইতে আমাদের জন্যে যে সকল সুন্দর দ্রব্যাদি আনিয়াছে তাহা কি আপনি দেখিতে চাহেন?
আমি উত্তর করিলাম, হাঁ, অবশ্য দেখিতে চাহি। তখন সত্যবতী শীঘ্র ঘরের ভিতরে গিয়া ঐ সকল দ্রব্য বাহির করিয়া আনিল, তাহাতে আমি দেখিলাম সুন্দরী সত্যবতীর জন্যে ইংরাজ বিবিদের মত পোষাক পরা একটি কাষ্ঠের পুত্তলিকা, আর এক যোড়া পুতি বসান চুড়ি আনিয়াছে; ও সাধুকে বিদ্যার্থি বালক জানিয়া সে তাহার নিমিত্তে পুস্তক রাখিবার সিন্দুক আর একখান খ্রীষ্টীয় মণ্ডলীর ইতিহাস পুস্তক, এবং পিতার জন্যে একটি মের্জাই আনিয়াছে। সুন্দরী আপন মনিবের তিনটি শাটিন কাপড়ের পুরাতন জামা পাইয়া তাহাতে যোড় দিয়া অতি নিপুণতা প্রকাশ করত সেই মের্জাইটিকে বড় সুন্দররূপে সিলাই করিয়াছিল।
সত্যবতী তাহা আমাকে দেখাইয়া বলিল, মেম সাহেব, বাবা এই জামাটি পরিলে ঠিক বাবুর মত দেখায়। তাহার বড় ভগিনী কহিল, সত্যবতি, বাবা কি বাবু নয়? তাঁহাকে অবশ্য বাবু বলিতে হইবে; কেননা কলিকাতায় আমি অনেক বাবু দেখিয়াছি, কিন্তু আমাদের পিতা যেমন সেই নাম পাইবার যোগ্যপাত্র, তেমনি আর এক জনকেও দেখি নাই। আমার বোধ হয়, যিনি ধার্ম্মিক ও শিষ্টাচারী হইয়া ধনি ও দরিদ্র সকলের প্রতি দয়া করেন, এমত ব্যক্তিকেই প্রকৃত বাবু বলা যায়। তোমরা বল দেখি, আমাদের পিতা এই প্রকার বাবু আছেন কি না? সাধু ও সত্যবতী উভয়ে উত্তর করিল, হাঁ অবশ্য২, আমাদের পিতা যেমন ভাল, তেমন আর কোন মানুষকে দেখি না।
উক্ত কথোপকথনের সময়ে ফুলমণি কিছু বলিল না বটে, কিন্তু আপন সন্তানদের ঐ সকল বাক্য শুনিয়া সে অতিশয় সন্তুষ্টা হইয়াছে, ইহা আমি তাহার প্রফুল্ল বদনের প্রতি দৃষ্টি করিয়া টের পাইলাম। পরে তাহার মেয়্যা তাহার নিমিত্তে যে বিলাতীয় শাড়ি আনিয়াছিল, তাহা সে আমাকে দেখাইয়া বলিল, মেম সাহেব, আমার সুন্দরী যে বাবার কর্ম্ম করে, তাহার জন্ম দিন হইলে মেম তাহাকে তিনটি টাকা পারিতোষিক দিয়াছিলেন, সে ঐ টাকা লইয়া আমার নিমিত্তে এই শাড়িখানি কিনিয়া আনিয়াছে; এমন উত্তম শাড়ি এ স্থানে পাওয়া যায় না।
অতঃপর সত্যবতী কহিল, আর দেখুন মেম সাহেব! দিদি আমাদের ছোট প্রিয়নাথকে কখন দেখে নাই, তথাপি তাহার জন্যে সে দুইটি ছিটের কোর্ত্তা ও একটি গরম টুপি সিলাই করিয়া আনিয়াছে, এবং সেই কোর্ত্তা ও টুপি তাহার গায়ে ঠিক হইয়াছে। আমি ঐ সকল বস্ত্রাদি দেখিয়া বড় প্রশংসা করিলাম, কেননা সকলই সুন্দর ছিল বটে; কিন্তু তদ্দ্বারা সুন্দরীর মনের যে ভাব (অর্থাৎ পিতা মাতার প্রতি তাহার অত্যন্ত প্রেম) প্রকাশ হইল, সে সকল অপেক্ষা উত্তম; কেননা দ্রব্য গুলিন ক্ষয়ণীয়, কিন্তু সুন্দরী যে অভিপ্রায়ে তাহা প্রস্তুত করিয়াছিল সেই অভিপ্রায় ঈশ্বরের সিংহাসনের নিকটে ঊর্দ্ধ্বে গমন করিয়া সুগন্ধি নৈবেদ্য ও বলিরূপে তৎকর্ত্তৃক অবশ্য গৃহীত হইল।
পরে আমি সুন্দরীর সহিত কথোপকথন আরম্ভ করিতে চাহিয়া বলিলাম, সুন্দরি, বোধ হয় এই মের্জাই সিলাই করিতে তোমাকে অনেক দিন লাগিয়া থাকিবে; কারণ দেখিতেছি যে তাহাতে আস্তর দেওয়া গিয়াছে, এবং ঐ সকল শাটিনের মগ্জি ঠিক রাখিতে অবশ্য বড় ক্লেশ পাইয়া থাকিবা।
সুন্দরী উত্তর করিল,মেম সাহেব, তাহা সিলাই করিতে অনেক দিন লাগিয়াছিল বটে, কারণ রাত্রিতে বাবারা শয়ন না করিলে আমার অবকাশ হইত না; বোধ হয় প্রায় দেড় মাস হইয়া থাকিবে। কিন্তু তাহা সিলাই করিতে যে ক্লেশ পাইলাম, এমত বলিতে পারি না। সিলাই করিবার সময়ে আমি কেবল ঘরের কথা মনে করিয়া বলিতাম, আমার পিতা যে দিবসে এই মের্জাইটি গায়ে দিবেন, সে আমার পক্ষে কেমন আমোদের দিবস হইবে! ইহা মনে করিয়া আমার কিছু ক্লেশ বোধ হইত না। যাহা হউক, কল্য যখন আমার পিতা গীর্জায় যাইবার সময়ে ঐ মের্জাই পরিয়া আমার মস্তকে হাত দিয়া কহিলেন, ঈশ্বর আমার প্রিয়া কন্যাকে আশীর্ব্বাদ করুন! তখন আমি তাবৎ পরিশ্রমের প্রচুর ফল প্রাপ্তা হইলাম।
এই কথা শুনিয়া আমি মনে২ ভাবিলাম, আহা সুন্দরি! তোমার মত আর অনেক মেয়্যা যদি আমাদের মণ্ডলীগণের অলঙ্কারস্বরূপ হইয়া এই দুষ্ট জাতিদের মধ্যে ঈশ্বরের সেবা করিত, তবে কেমন আনন্দের বিষয় হইত।
পরে আমি সুন্দরীকে জিজ্ঞাসিলাম, তুমি কি একাকিনী রাত্রে বসিয়া সিলাই করিতা? সুন্দরী কহিল, হাঁ মেম সাহেব, প্রথমে আমার সঙ্গে এক মুসলমানী আয়া থাকিত, কিন্তু প্রায় আট মাস হইল সে বাবাদের সাক্ষাতে অনেক অপবিত্র কথা কহাতে আমার মেম তাহাকে ছাড়াইয়া দিয়াছেন।
আমি কহিলাম, সুন্দরি, ভাল মনে পড়িল; আমি এই বিষয় তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতে চাহি, অন্য চাকরদের সহিত তোমার কেমন ঐক্য আছে? তাহারা সকলে হিন্দু ও মুসলমান না কি?
সুন্দরী কহিল, হাঁ মেম সাহেব, কেবল এক জন বৃদ্ধ মালী খ্রীষ্টিয়ান আছে; সেই ব্যক্তি ও তাহার স্ত্রী বড় ভাল লোক, এবং তাহারা আমার প্রতি অতিশয় দয়া প্রকাশ করিত। আমি যখন প্রথমে ঐ গৃহে গেলাম, তখন সকল চাকরেরা বড় অসন্তুষ্ট হইল; কেননা তাহারা বোধ করিল, যখন এক জন খ্রীষ্টিয়ান আসিয়াছে, তখন আরো অনেকে আসিয়া আমাদের উপায়ের স্থান নষ্ট করিতে পারিবে। কিন্তু এখন তাহারা ঐ সকল মনে করে না, তাহাতে তাহাদের সহিত আমার ভালরূপে মেল হইয়াছে। আমি যত দুঃখ পাইলাম তাহা প্রথমেই পাইলাম। এক জন যুব খিদ্মৎগার আমাকে ভ্রষ্টা করিতে অনেক চেষ্টা করিয়াছিল, তাহাতে আমি তাহার কথা আর সহ্য করিতে না পারিয়া মেম সাহেবকে জ্ঞাত করিলাম। তখন সাহেব অন্য সকল দাসদের সাক্ষাতে তাহাকে বিস্তর ধম্কাইয়া ও লজ্জা দিয়া ছাড়াইয়া দিলেন। সেই দিন অবধি সকলে ভয় পাইয়া আমাকে আর একটিও মন্দ কথা কখন কহে নাই; কিন্তু আমি অন্য প্রকারে দুই তিন বার বড় পরীক্ষিতা হইয়াছি।
এক জন সরদার বেহারা ছিল, সে ব্যক্তি বড় চোর, মেম সাহেবকে অতিশয় ঠকাইত। ছুরি কাঁচি পয়সা অঙ্গুরী, এই সকল ছোট দ্রব্য কোন স্থানে ফেলিয়া রাখিলে তখনি অদৃশ্য হইত। ঐ সরদারের প্রতি সন্দেহ হইত বটে, কিন্তু কেহ তাহাকে ধরিতে পারিত না। পরে এক দিবস সে তিন মোন নারিকেল তৈল বাজারহইতে আনিল; তাহাতে মেম সাহেব আমাকে কহিলেন, সুন্দরি, আজি তুমি গুদামে গিয়া ঐ তৈল ওজন করিয়া লও, কেননা অল্প দিন হইল সরদার আর তিন মোন তৈল আনিয়াছিল, তাহা যে ইহারি মধ্যে ফুরাইয়া গেল, ইহাতে আমার বড় সন্দেহ হইতেছে। সরদার এই কথা শুনিয়া বড় অসন্তুষ্ট হইল, এবং আমি গুদামে গেলে সে বলিল, তৈল ওজন করিতে অনেক ক্ষণ লাগিবে, ইহা ঠিক তিন মোন আছে, তাহাতে তোমার কেবল বৃথা পরিশ্রম হইবে; তুমি যদি ওজন না করিয়াও মেম সাহেবকে বল, আমি তৈল ওজন করিয়া ঠিক পাইলাম, তবে আমি তোমাকে মিঠাই খাইবার জন্যে আট আনা পয়সা দিব। কিন্তু আমি এই কর্ম্ম করিতে স্বীকার করিলাম না; কেননা আমি ভাবিলাম, ইহাতে ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন হইবে, এবং এই দেবপূজক বেহারার সাক্ষাতে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম অপমানিত হইবে। আরও আমি সুন্দররূপে জানিতাম, যে ঐ আট আনা লইলে তদ্দ্বারা আমার সন্তোষ কখন জন্মিবে না, কেবল দুঃখই জন্মিবে; এমত বুঝিয়া আমি তৈল ওজন করিয়া দেখিলাম, যে তিন মোনের মধ্যে অর্দ্ধ মোন কম আছে। তৈলের দর তখন দশ টাকা মোন, অতএব সরদার একেবারে পাঁচ টাকা চুরি করিয়াছে। আমি মেম সাহেবকে এই কথা বলাতে সরদার ওজর করিয়া বলিল, আমি সুন্দরীকে অর্দ্ধেক দস্তুরি দিতে চাহিলাম না, এই জন্যে সে আমার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিতেছে। মেম সাহেব যে পুনর্ব্বার আপন সাক্ষাতে তৈল ওজন করাইবেন, সরদার এমত মনে করিল না; ফলতঃ মেম সর্ব্বদা ন্যায় বিচার করেন, বিনা প্রমাণে কাহাকেও দোষি জ্ঞান করেন না, কিন্তু একবার প্রমাণ পাইলে তিনি দোষি ব্যক্তির প্রতি যথার্থ শাসন করেন। তাহাতে মেম সাহেব আপনি তৈল ওজন করিয়া দেখিলেন যে অর্দ্ধমোন কম আছে, তখনি ঐ দুষ্ট সরদার বেহারা জবাব পাইল।
ইহার পর কেবল এক জন বৃদ্ধা আয়ার কথা বাকী আছে। মেম সাহেব তাহাকে বড় ভাল বাসিতেন, কারণ সে অনেক দিনের চাকর, এবং বাবাদিগকে অতিশয় প্রেম করিত। কিন্তু তাহার এই একটি দোষ ছিল, মেম সাহেব বাহিরে গেলে সে বাবাদিগকে বাঙ্গালা মিঠাই আনিয়া খাওয়াইত। মেম সাহেব তাহাকে এমত কর্ম্ম করিতে অনেকবার বারণ করিয়াছিলেন, কিন্তু সে কিছু না মানিয়া গোপনে মিঠাই আনিয়া দিয়া বাবালোককে কহিত, তোমরা এ কথা মামাকে বলিও না। এই রূপে বাবারা ক্রমে২ প্রবঞ্চনা শিখিতে লাগিল, এবং আমার নিকটে গোপনে মিঠাই না পাওয়াতে তাহারা আমাকে কিছু ভাল বাসিত না। বুড়ি আয়ার বিষয়ে আমার কি করা কর্ত্তব্য, তাহা আমি মনে স্থির করিতে পারিলাম না, তাহাতে ঈশ্বর যেন গন্তব্য পথে চালান্ আমি তাঁহার নিকটে এই প্রার্থনা বার২ করিতাম। আয়ার প্রবঞ্চনার বিষয় আমি মেমকে জ্ঞাত করিতে অনিচ্ছুক ছিলাম, কেননা আয়া আমাকে বড় ভাল বাসিয়া অনেক কর্ম্ম শিখাইয়াছিল; কিন্তু শেষে মেম সাহেব আপনি তাহার কুক্রিয়ার উদ্দেশ পাইলেন। যে দিনে দুর্গা প্রতিমা গঙ্গায় ভাসান যায়, সে দিনে তিনি বাবাদিগকে ঘরে রাখিয়া বাহিরে গেলেন। আয়া বুড়ি আমাকে বলিল, চল, বাবালোককে লইয়া আমরা তামাসা দেখিতে যাই। আমি এই কথাতে চমৎকৃতা হইয়া উত্তর করিলাম, ও আয়া দিদি! মেম সাহেব যদি এই কথা শুনেন, তবে তিনি কেমন রাগান্বিতা হইবেন। আয়া কহিল, তুমি যদি তাঁহাকে না বল, তবে তিনি কাহারো মুখে শুনিতে পাইবেন না; আর আপত্তি করিও না, চল, আমরা যাই। আমি কহিলাম, না আয়া, এমত হইবে না; তুমি যদি যাইতে চাহ তবে বাবাদিগকে আমার নিকটে রাখিয়া আপনি যাও। তখন আয়া কহিল, সুন্দরি, তুমি যদি না যাও, তবে তুমি আমার নামে বলিয়া দিবা। আমি কহিলাম, না আয়া, বাবারা গেলে আমার বলা উচিত হইত বটে; কিন্তু তাহারা যদি আমার নিকটে থাকে, তবে আমার বলিবার কোন প্রয়োজন নাই; এই কথাতে আয়া চলিয়া গেল। আমরা বোধ করিয়াছিলাম যে ছোট মেরি বাবা আমাদের কথা সকল বুঝিবে না। কিন্তু সে এই মাত্র বুঝিয়াছিল, আয়া আমাকে দুর্গা বলিয়া কোন সুন্দর বস্তু দেখাইতে চাহিয়াছিল, কিন্তু সুন্দরী তাহা আমাকে দেখাইতে দিল না; এই হেতু সে বড় কাঁদিয়া উচ্চৈঃস্বরে আয়াকে ডাকিতে লাগিল। এমন সময়ে মেম সাহেব ফিরিয়া আইলেন, তাহাতে মেরি বাবা তাঁহার নিকটে গিয়া কান্দিতে২ বলিল, মামা! সুন্দরী বড় দুষ্টা, বুড়ি আয়া বড় ভাল মানুষ, সে আমাকে সুন্দর দুর্গা দেখাইতে চাহিল, কিন্তু সুন্দরী বলিল, না না, যাইও না; আমি সুন্দরীকে কিছু প্রেম করি না। ইহা শুনিয়া মেম সাহেব আমার প্রতি ফিরিয়া জিজ্ঞাসিলেন, সুন্দরি, এই কথার ভাব কি? আমি কহিলাম, মেম সাহেব, এ বিষয়ে আমি কিছু বলিতে পারিব না, কেননা আমি একটা প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। কিন্তু সেখানে দরওয়ান্ দাঁড়াইয়াছিল, আয়ার সহিত সে আমার সকল কথা শুনিয়া মেম সাহেবকে সন্তুষ্টা করিবার জন্যে তাবৎ বৃত্তান্ত জানাইল। ইহা শুনিয়া মেম সাহেব পর দিবস আয়াকে ছাড়াইয়া দিলেন বটে; কিন্তু সে পুরাতন চাকর, এই হেতু তিনি তাহার জন্যে একটি ঘর বাঁধিলেন, ও মাসে২ তাহাকে দুই টাকা করিয়া দেন। যখনি বুড়ি সেই টাকা লইতে আইসে, তখন বাবাদিগকে দেখিয়া যায়, এবং আমার সহিত এখনও তাহার বড় সদ্ভাব আছে। নূতন আয়া কিছু দিন ভাল ব্যবহার করিয়াছিল, কিন্তু শেষে আমি শুনিতে পাইলাম, সে মেরি বাবাকে মন্দ গল্প বলিয়া তাহার মনকে অপবিত্র করিতেছে; অতএব আমি মেমকে বলিলাম, ইহা অপেক্ষা আমার একাকি কর্ম্ম করা ভাল, তাহাতে আয়া বিদায় পাইল। সেই সময় অবধি ঐ ঘরে থাকিতে আমার মন কিঞ্চিৎ উদাস হয় বটে, কিন্তু মেম সাহেব অনুগ্রহ করিয়া বলিয়াছেন, যে আমি ফিরিয়া যাইবার সময়ে তোমার সঙ্গিনী হইবার জন্যে এক জন খ্রীষ্টিয়ান মেয়্যাকে লইয়া যাইব।
অতঃপর সুন্দরী আরও কহিল, মেম সাহেব, এ দেশীয় লোকেরা কন্যাদিগকে বাটীর বাহিরে যাইতে দেয় না। তাহারা বলে, মেয়্যারা সর্ব্বদা পরদার ভিতরে তালা চাবি দিয়া থাকিবে; কিন্তু মনের যে তালা চাবি, তাহার মত ভাল তালা চাবি কোন স্থানে পাওয়া যাইবে না। আমরা মনকে যদি খ্রীষ্টের হস্তে সমর্পণ করিয়া তাঁহার সজ্জাতে সজ্জীভূতা হই, তবে শয়তান আমাদিগকে কখন আক্রমণ করিতে পারিবে না।
আমি কহিলাম, সুন্দরি, একথা যথার্থ বটে। আমি বোধ করি যদ্যপি খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকেরা অন্য খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রী ও পুরুষদের সহিত আরও আলাপ করিত, তবে তাহাদের বিস্তর উপকার হইতে পারিত। বিবেচনা করিয়া দেখ, এখন পুরুষেরা যত সতী ও অসতী স্ত্রী সকলকেই বদ্ধ করিয়া রাখে, তাহাতে সতী স্ত্রীরা অবশ্য মনে নৈরাশ হইয়া বলিতে পারে, আমাদের সতী হইবার ফল কি? আমাদের স্বামী তো আমাদিগকে বিশ্বাস করে না, অতএব আমাদের যাহা ইচ্ছা হইবে তাহাই করিব। কিন্তু যদ্যপি স্বামী আপন স্ত্রীকে সতী জানিয়া তাহাকে নিঃসন্দেহে স্থানে২ যাইবার অনুমতি দিত, তবে সে অবশ্য মনে আহ্লাদিতা হইয়া আপন স্বামিকে আরও সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টান্বিতা হইত। আরও বলি, পুরুষদের সহিত আলাপ করাতে তাহাদের কথোপকথনদ্বারা স্ত্রীরা কিছু বুদ্ধিমতী হইতে পারিত। ঈশ্বর যখন আদমের নিমিত্তে হবাকে সৃষ্টি করিতে চাহিলেন, তখন তিনি এমত বলিলেন না, আমি আদমের গৃহ কর্ম্ম চালাইবার কারণ এক জন দাসী সৃষ্টি করিব, কিম্বা তাহার পক্ষে সন্তান উৎপত্তি করিতে এক স্ত্রীকে সৃষ্টি করিব। তিনি এমন কথা না বলিয়া ইহা কহিলেন, আমি আদমের নিমিত্তে এক জন উপযুক্ত সহকারিণীকে নির্ম্মাণ করিব। এখন বিবেচনা করিয়া দেখ, স্ত্রী কিছু জ্ঞানিনী না হইলে এবং জগতের বিষয় কিছু না জানিলে কেমন করিয়া স্বামির উপযুক্ত সহকারিণী হইতে পারে? পাঁচ প্রকার ভাল লোকদের সহিত আলাপ করাতে অবশ্য জ্ঞান উৎপন্ন হয়, অতএব স্ত্রীরা যাহাতে জ্ঞানবতী হয়, স্বামিদের ইহা চেষ্টা করা কর্ত্তব্য। কোন২ বাঙ্গালি থ্রীষ্টিয়ানেরা এমত নির্ব্বোধ আছে যে তাহাদের স্ত্রীরা পাছে গৃহের কর্ম্ম ত্যাগ করে এই ভয়ে তাহাদিগকে ধর্ম্মপুস্তকও পাঠ করিতে দিতে চাহে না; কিন্তু এমত লোকদিগকে মানুষ না বলিয়া বরং পশু বলিতে হয়। তাহারা আপনারা স্বর্গে যাইতে অপেক্ষা করে, কিন্তু পাছে তাহাদের গৃহের কর্ম্মেতে কিছু ব্যাঘাত হয়, এই হেতু তাহারা আপন স্ত্রীদিগকে ধর্ম্মের বিষয়ে শিক্ষা না দিয়া নরকে যাইতে দেয়। আমি ভরসা করি যে খ্রীষ্টিয়ান মণ্ডলীগণের মধ্যে এমত ব্যক্তিদের সংখ্যা দিনে২ হ্রাস হইতেছে।
পরে আমি ফুলমণির প্রতি ফিরিয়া জিজ্ঞাসিলাম, ফুলমণি, তুমি এ বিষয়ে কিছু বল না কেন? তোমার বিবেচনাতে আমার কথা কি ভাল বোধ হয় না?
ফুলমণি উত্তর করিল, মেম সাহেব, ভাল বোধ হইবে না কেন? কেবল এই একটা কথা বলিতে হয়, কোন বাঙ্গালি স্ত্রী যদি একেবারে ইংরাজ বিবির মত ব্যবহার করে, তবে অন্য লোকেরা তাহাকে কখন সতী স্ত্রী জ্ঞান করিবে না। মেম সাহেব, আপনি বিবেচনা করিয়া দেখুন, আপনারা সাহেবদের সহিত বেড়াইয়া থাকেন ও একাকিনী বসিয়া তাহাদের সহিত কথোপকথন করিতে পারেন; কিন্তু বাঙ্গালি স্ত্রী যদি এমত করিত, তবে সে কি আপনার দৃষ্টিতে ভাল বোধ হইত?
আমি কহিলাম, না ফুলমণি, বাঙ্গালি স্ত্রীলোকেরা যে একেবারে ইংরাজ বিবির ন্যায় হয় আমার তো এমত বাঞ্ছা নাই; কেননা তাহারা পুরুষদের সহিত হিতজনক আলাপ করিতে চাহিলে এক প্রকার লজ্জার আবশ্যক আছে, কিন্তু সেই লজ্জা ঘোম্টাদ্বারা নয়, বরং মনের শুদ্ধতাদ্বারা প্রকাশ পায়। যে স্ত্রীর এমত লজ্জা থাকে, সে কখন কোন পুরুষের সাক্ষাতে অপবিত্র বাক্য ও মন্দ কৌতুকের কথা কহিবে না; এবং যদ্দ্বারা ঐ পুরুষের মন তাহাতে আসক্ত হইতে পারে, সে এমত ক্রিয়া কখন করিবে না। এই প্রকারে স্ত্রীলোকেরা পুরুষদের সহিত স্বচ্ছন্দে আলাপ করিয়া নির্দোষী থাকিতে পারে। কিন্তু যদ্যপি বাঙ্গালি মেয়্যারা ঘোম্টাদি দিয়া অন্তঃপুরে থাকে, তথাপি যত লজ্জা ইংরাজ বিবিদের মধ্যে পাওয়া যায়, তত অন্তঃপুরের মেয়্যাদের মধ্যে পাওয়া যাইবে না। বাঙ্গালি স্ত্রীলোকেরা অন্য পুরুষদের সাক্ষাতে অনায়াসে গর্ভ হওয়া ইত্যাদি বিষয় বলিতে পারে; কিন্তু ইংরাজদের মধ্যে যদি স্বামী ছাড়া পুরুষের নিকটে স্ত্রীলোক এমত বাক্য মুখে লয়, তবে সকলে তাহাকে বড় অসভ্য বলিয়া তুচ্ছজ্ঞান করে। এই সকল বিষয়ে খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীলোকেরা হিন্দুদের অপেক্ষা অনেক ভাল হইয়াছে বটে, তথাপি তাহাদের কিছু ত্রুটি আছে; এবং যত দিন ঐ ত্রুটি থাকে, তত দিন পর্য্যন্ত পুরুষদের সহিত তাহাদের বড় আলাপ করা আবশ্যক নাই। ক্রমে২ তাহারা যখন ইংরাজদের বিদ্যাদি শিক্ষা করিবে, তখন তাহারাও আমাদের মত হইয়া উঠিবে; কিন্তু বোধ হয়, ইহা সম্পূর্ণ রূপে সাধন করিতে আর এক শত বৎসর লাগিবে। এখন আমার বাঞ্ছা এই যেন খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীগণ লোক দেখান মিথ্যা লজ্জা সকল ত্যাগ করিয়া সৎক্রিয়া করে।
এখন আমি যাহা বলিতেছি, তাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছিলাম। এক জন খ্রীষ্টিয়ান শিক্ষক আপন যুবতি স্ত্রীকে ঘরে রাখিয়া কোন কর্ম্মের নিমিত্তে বাহিরে গিয়াছিল, এমত সময়ে তাহার বন্ধু ইহা না জানিয়া তাহাকে দেখিবার কারণ শিক্ষকের ঘরে গেল। সেই স্ত্রী আপন স্বামির বন্ধুকে ব্যাঘ্রের মত দেখিয়া শীঘ্র আপন অন্তঃপুরে দৌড়িয়া গিয়া দ্বার বন্ধ করিল; তাহাতে ঐ বন্ধু লজ্জিত হইয়া ধীরে২ আপন গৃহে ফিরিয়া গেল। পরে স্বামী ঘরে আইলে ঐ স্ত্রী আপন সতীত্বের বিষয় তাহাকে জানাইয়া আপনাকে বড় সাধু বোধ করিল; এবং তাহার স্বামী বন্ধুর সহিত বিবাদ করিয়া তাহাকে আপন ঘরে আসিতে নিষেধ করিল। ফুলমণি, এমত হাস্যজনক লজ্জা ভাল কি মন্দ, তাহা তুমিই বুঝ। তুমি কহিতেছ, বাঙ্গালি স্ত্রীগণ যদি ইংরাজ বিবিদের ন্যায় ব্যবহার করে, তবে লোকেরা তাহাদিগকে তুচ্ছজ্ঞান করিবে। কোন ইংরাজ বিবির ঘরে যদি আপন স্বামির বন্ধু যান, তবে তিনি তাহার সহিত অতিশয় সমাদর পূর্ব্বক কথোপকথন করেন, এবং যাহাতে ঐ সময় তাহার পক্ষে আমোদে যাপন হয়, এমত চেষ্টা করেন; আর কথা সাঙ্গ হইলে কি জানি সে বিবি এক দণ্ড বসিয়া বাদ্য করেন, কিম্বা যদি সাহেবের পড়িবার ইচ্ছা হয়, তবে তাহার হস্তে একখান পুস্তক দিয়া আপনি শিল্পকর্মের দ্রব্যাদি আনিয়া তথায় বসিয়া সিলাই করেন। বাঙ্গালি স্ত্রীর এমত করিবার প্রয়োজন নাই বটে, তথাপি তাহার গৃহে যদি কোন পুরুষ আইসে, তবে সে শিষ্টরূপে তাহাকে এই কথা বলুক, এখন কর্ত্তা ঘরে নাই, অতএব আপনি যদি অন্য সময়ে আসিতে পারেন, তবে ভাল হয়। কিন্তু সে ব্যক্তি পথ শ্রান্ত প্রযুক্ত তাহার ঘরে যদি বিশ্রাম করিতে চাহে, তবে সে দাবাতে তাহার জন্যে একখান আসন রাখুক, পরে তাহাকে তামাক ও জলাদি দিয়া আপন অন্তঃপুরে যাউক। এই প্রকার ব্যবহার না করিলে খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম প্রায় পালন করা যায় না, কেননা ঈশ্বর কহেন, “সুযোগ পাইলে সকল লোকের বিশেষতঃ বিশ্বাসকারি পরিবারের মঙ্গল কর।” গলাতীয় ৬।১০। কিন্তু এ দেশীয় লোকেরা আপন২ স্ত্রীদিগকে বদ্ধ করিলে তাহারা এমত সুযোগ পায় না; অতএব বঙ্গদেশীয় লোক আপন২ ব্যবহারেতে ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে।
আরও বলি, এদেশীয় খ্রীষ্টিয়ানেরা ইংরাজ বিবিদের রীতিকে নিন্দা করে, করুক; কিন্তু যে ধার্ম্মিকা স্ত্রীলোকদিগকে ঈশ্বর আপনি প্রশংসা করিয়াছেন, তাহারা কি তাহাদিগকেও নিন্দা করিবে? শিমূয়েলের মাতা হন্নাকে স্মরণ কর; সে আপন পরিবারের সহিত ঈশ্বরের মন্দিরে যাত্রা করিত, এবং তৎকালের লোকেরা পদব্রজেই গমনাদি করিত, অতএব হন্না অন্তঃপুরে বদ্ধ থাকিত না, তথাপি সে ঈশ্বরের কেমন প্রিয়পাত্র ছিল। আরও যীশুর মাতা মরিয়ম যিনি সকল স্ত্রীলোকদের মধ্যে ধন্যা, তিনি বিবাহের অগ্রে এবং পশ্চাতে স্থানে২ বেড়াইতেন, এবং যীশুর শিষ্যদের সহিত তাঁহার বন্ধুতা ছিল। ইলিয়াসর মরিলে পর যিহদীয়েরা তাহার দুই ভগিনীকে সান্ত্বনা দিতে গেল, এবং তাহারা ঐ যিহদীয়দিগকে আপন বাটীতে গ্রহণ করিল। আক্বিলা ও তাহার স্ত্রী প্রিস্কিল্লা একজন যুব উপদেশককে আপন বাটীতে আনিয়া বিশেষরূপে ঈশ্বরের পথ তাহাকে বুঝাইয়া দিল। আর পৌল রোমীয় খ্রীষ্টিয়ানদের প্রতি লেখেন, “কিংক্রিয়া নগরীয় মণ্ডলীর সেবিকা ফৈবী নাম্নী আমাদের ধর্ম্মভগিনীর বিষয়ে তোমাদের নিকটে এই উপরোধ করিতেছি, সে তোমাদের নিকটে উপস্থিত হইলে তোমরা তাহাকে প্রভুর আশ্রিতা জ্ঞান করিয়া ভক্ত লোকদের বিহিত মতে অতিথি করিবা, এবং তাহার প্রয়োজনানুসারে তোমাদেরহইতে যে উপকার হইতে পারে তাহা করিবা; কেননা তাহাহইতে অনেকের বিশেষতঃ আমার উপকার হইয়াছে।” তদ্রূপে মরিয়মের এবং অন্যান্য কত স্ত্রীলোকের প্রশংসাও লিখিয়াছেন। রোমীয় ১৬।১, ২। আরও লেখা আছে যে পিতর কারাগারহইতে রক্ষা পাইয়া মার্কের মাতা মরিয়মের বাটীতে চলিয়া গেল; এবং তথায় অনেকে একত্র হইয়া প্রার্থনা করিতেছিল। প্রেরিতদের ক্রিয়া ১২।১২। এখন বুঝিয়া দেখ, এই সকল ধার্ম্মিকা স্ত্রীলোকেরা যদি অন্তঃপুরের বিবি হইতেন, তবে উক্ত তাবৎ ধর্ম্ম কর্ম্ম তাঁহারা কখন সাধন করিতে পারিতেন না। অতএব ঈশ্বর যাহার প্রশংসা করিয়াছেন তাহা মনুষ্যেরা নিন্দা না করুক।
শ্বশুর ও ভাসুরদের প্রতি যে অত্যন্ত লজ্জা করা, ইহাও বাঙ্গালি স্ত্রীদের একটি বড় মন্দ রীতি আছে; কেননা কোন স্ত্রী পুরুষকে বিবাহ করিলে স্বামির পিতা তাহার পিতা হয়, এবং স্বামির ভ্রাতা তাহার ভ্রাতা হয়। কিন্তু সে যদি তাহাদের সহিত কোন কথা না কহিয়া মুখ আচ্ছাদন দিয়া বেড়ায়, তবে পিতার ও ভ্রাতার প্রতি যেরূপ প্রেম করা কর্ত্তব্য, ইহা কি তাহাদের প্রতি জন্মিতে পারিবে? কখন না। আমি এবিষয়ে ভালরূপে বিবেচনা করিয়া দেখিয়াছি, স্ত্রীলোকদের মধ্যে অনেকের কপট লজ্জা আছে, কেননা তাহার স্বামির ঘরে এক প্রকার ও পিতা মাতার ঘরে অন্য প্রকার ব্যবহার করে। একবার আমি কোন যুবতী খ্রীষ্টিয়ান স্ত্রীর বাটীতে গিয়া তাহার শ্বশুরের ও স্বামির এক জন বন্ধুর প্রতি অত্যন্ত লজ্জা দেখিয়া বড় দুঃখিতা হইলাম; কিন্তু সে স্ত্রী অল্প দিন পরে আপন মাতার ঘরে আইলে আমি স্বচক্ষে দেখিলাম, সে মাথার কাপড় খুলিয়া এক জন হিন্দু পুরুষের নিকটে দাঁড়াইয়া তাহার সহিত অনেক ক্ষণ পর্য্যন্ত হাস্য করত কথা কহিতেছিল। আর ফুলমণি, ইহাতে জানা যায়, স্ত্রীলোকদিগকে তালা চাবি দিয়া রাখিবার কোন ফল নাই, কেননা তদ্দ্বারা তাহাদের মন শুচি থাকে না, এবং তাহাদের মনকে রক্ষা করিতে না পারিলে তাহাতে কি লাভ? এদেশীয় স্ত্রীদের অন্তঃপুরে যে প্রকার অপবিত্র কৌতুকাদি হয়, ও যে প্রকার গালাগালি করে, সেই সকল ইংরাজ বিবিরা কখন মুখেতেও আনেন না। আমি এক মেমকে চিনি, যিনি বঙ্গদেশীয় ভাষাতে অতিনিপুণা ও বাঙ্গালিদের গালাগালির অর্থ অনেক জানিতেন; কিন্তু তাঁহার স্বামী সে অর্থ তাঁহাকে বলিতে অনেকবার সাধ্যসাধনা করিলেও তিনি অস্বীকৃতা হইয়া বলিতেন, ক্ষমা করুন, আমি ঐ কথা মুখে আনিতে পারিব না। ফুলমণি, যাহাতে মন শুচি থাকে, বাঙ্গালি থ্রীষ্টিয়ানেরা এমত উপায় চেষ্টা করুক; সে উপায় অন্তঃপুরে পাওয়া যায় না, কিন্তু সদুপদেশ ও ধার্ম্মিক লোকদের সহিত আলাপন দ্বারা পাওয়া যাইতে পারে। আইস, আমরা প্রেরিতের আদেশানুসারে ব্যবহার করি, তাহাতে কখন ভ্রান্তিতে পতিতা হইব না। তিনি বলিতেছেন, “হে নারীগণ, তোমরা কেশবেশ ও স্বর্ণ মুক্তাদি অভরণ ও বহুমূল্য পরিছদদ্বারা আপনাদিগকে ভূষিতা না করিয়া লজ্জা ও সতর্কতা পূর্ব্বক উপযুক্ত বস্ত্র পরিধান করিয়া ঈশ্বরসেবিকা স্ত্রীগণের ন্যায় সৎক্রিয়ারূপ ভূষণে ভূষিতা হইও।” ১ তীমথিয়ের ২।৯।
ফুলমণি কহিল, মেম সাহেব, আমি যেন সেই আজ্ঞামতে চলিতে পারি এমত চেষ্টা আছে, এবং সুন্দরীকেও সেইরূপ শিক্ষা দিয়াছি।
তাহাতে আমি কহিলাম, ও আমার প্রিয়া বন্ধু, তুমি যে ইহা করিয়াছ তাহা আমি সুন্দর রূপে জ্ঞাতা আছি। আর আমি যে২ শক্ত কথা কহিয়াছি তাহা তোমারই প্রতি কহিলাম, এমত অনুমান করিও না; কেননা তুমি যে লৌকিক রীত্যনুসারে না চলিয়া ঈশ্বরের আজ্ঞা পালন করিতেছ, তাহা সুন্দরীর কলিকাতায় যাওয়াতেই সপ্রমাণ হইয়াছে। বিশেষতঃ সে ঈশ্বরের সজ্জাতে সুসজ্জীভূতা হইয়া শয়তানের নানাবিধ খলতা নিবারণ করিতে সক্ষম হইবে, ইহা তোমরা দৃঢ় বিশ্বাস করিয়া আপনাদিগকে ঋণহইতে উদ্ধার করিবার জন্যে তাহাকে দূরে পাঠাইয়া দিয়াছিলা। দেখ, ঈশ্বর তোমার আশা ভঙ্গ করেন নাই, কেননা তোমার মেয়্যা যাওয়াতে তাহার কোন ক্ষতি হয় নাই, বরং হিতমাত্র জন্মিয়াছে।
ফুলমণি প্রফুল্ল বদনে কহিল, হাঁ মেম সাহেব, ঈশ্বর অনুগ্রহ করিয়া আমাদের হস্তকৃত কর্ম্ম সফল করিয়াছেন বটে।
সেই দিবস আমি সুন্দরীর সহিত আলাপকরত ফুলমণির গৃহে অতি আমোদে আরও অনেক কাল যাপন করিতাম, কিন্তু উক্ত সকল কথা সাঙ্গ হইলে পর দেখিলাম, আমার আগমনেতে যে গল্পের ব্যাঘাত হইয়াছিল, সেই গল্প সুন্দরীর নিকটে শুনিতে সত্যবর্তী বড় ব্যস্তা আছে, এই হেতু আমি তখন বিদায় হইলাম।
দশম অধ্যায়
সুন্দরীর সহিত প্রথমবার সাক্ষাৎ হইলে পর আমি অনেক বার তাহার দেখা পাইতাম। কখন আমি তাহার গৃহে যাইতাম, কখন বা সে আমার বাটীতে আসিয়া আমার আয়াকে মোজা বুনিতে শিক্ষা দিত। এমত সময়ে তাহার সহিত আমার বিস্তর কথা হওয়াতে ধর্ম্মের বিষয়ে তাহার জ্ঞান ও বুদ্ধি দেখিয়া আমি বড় চমৎকৃতা হইলাম, তাহাতে যখন তাহার কলিকাতায় যাইবার সময় সন্নিকট হইল, তখন আমি অতিশয় দুঃখিতা হইলাম। ডাক্তর সাহেবের মেম সুন্দরীকে যে বেতন দিতেন, আমি তাহার দ্বিগুণ বেতন দিয়া তাহাকে আপনার নিকটে রাখিতে বড় সন্তুষ্টা হইতাম, কিন্তু তাহার পুরাতন কর্ত্রীর প্রতি এমত অন্যায় করিতে পারিলাম না; এবং বোধ হয় সুন্দরীও তাঁহাকে কখন ছাড়িত না, কেননা তাহার মনে অকৃতজ্ঞতার লেশমাত্র ছিল না। সুন্দরীর কর্ত্রী বড় জ্ঞানী ও ধার্ম্মিকা বিবি ছিলেন, এবং ঐ নগরে আমার ইংরাজ বন্ধু অল্প থাকাতে তিনি যত দিন আমাদের নিকটে বাস করিলেন, তত দিন আমি অনেকবার পাদরি সাহেবের গৃহে গিয়া তাঁহার সহিত আলাপ করিতাম।এক দিবস আমি এই রূপে তাঁহাদের গৃহে যাওয়াতে পাদরি সাহেব আমাকে দেখিবামাত্র কহিলেন, বিবি সাহেব, আপনকার সুখশালা[১] নিবাসি বন্ধুরা কিছু দুঃখিত আছে, তাহাদের কন্যা সুন্দরী তাহাদিগকে বড় লেটায় ফেলিয়াছে।
আমি সাহেবের হাস্যমুখ দেখিয়া জানিলাম, যে ফুলমণির পরিবারের কোন ভারি দুর্ঘটনা হয় নাই; তথাপি আমি চমৎকৃতা হইয়া বলিলাম, মহাশয়, সুন্দরী যে আপন পিতা মাতাকে ঝঞ্ঝাটে ফেলিয়াছে, ইহা নিতান্ত অসম্ভব কথা।
সাহেব উত্তর করিলেন, ও! তাহার বিবাহের বিষয়ে একটি গোল উপস্থিত হইয়াছে। আমাদের যুবতি কন্যাগণ যেরূপ কথন২ বোধ করে, আমরা বিবাহের বিষয় পিতা মাতা অপেক্ষা ভাল জানি, সুন্দরীও সেইরূপ বুঝিয়া প্রেমচাঁদ ও ফুলমণি তাহার নিমিত্তে যে বরকে মনোনীত করিয়াছে, তাঁহাকে সে কোনরূপে বিবাহ করিতে চাহে না। কিন্তু এই সকল বৃত্তান্ত প্রথম অবধি আপনাকে না বলিলে আপনি কিছু বুঝিতে পারিবেন না, অতএব শুনুন। গত বুধবারে এক জন সুশ্রী যুব বাবু বিবাহার্থে কন্যা অন্বেষণ করিতে কলিকাতাহইতে এই স্থানে আসিয়াছিলেন। তিনি আপন পাদরি সাহেবের নিকটহইতে একখান অনুরোধ পত্র আনিয়াছিলেন, তাহাতে লেখা আছে, এই যুব পুরুষ পূর্ব্বে ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু তিন বৎসর হইল তিনি খ্রীষ্ট ধর্ম্ম গ্রহণ করিয়া আছেন, সে অবধি বড় সদ্ব্যবহার পূর্ব্বক চলিতেছেন। তিনি ইংরাজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, এবং মাসে২ পঁচিশ টাকা বেতন পান। এই অনুরোধ পত্র পড়িয়া আমি আপন ভগিনীর প্রতি ফিরিয়া বলিলাম, ও লুসি! এই ব্যক্তি বুঝি সুন্দরীর যোগ্যপাত্র হইবে, তুমি কি তাহাকে ছাড়িয়া দিতে সম্মতা হও? তিনি বলিলেন, যাহাতে সুন্দরীর মঙ্গল হইবে আমি তাহা করিতে অবশ্য সম্মতা আছি। ইহা শুনিয়া আমি প্রেমচাঁদ ও ফুলমণিকে ডাকাইয়া ঐ যুব পুরুষ যে অনুরোধ পত্র আনিয়াছিল, তাহার অর্থ তাহাদিগকে জানাইলাম। পরে তিনি আসিলে তাহারা অনেক ক্ষণ পর্য্যন্ত তাঁহার সহিত বিশেষ রূপে ধর্ম্মের বিষয়ে কথোপকথন করিয়া দেখিল, তিনি প্রভুর সত্য শিষ্য বটে, তথাপি প্রেমচাঁদ আমাকে বলিল, পাদরি সাহেব তাঁহার ধর্ম্মের বিষয়ে পত্রেতে কি লিখিয়াছেন, তাহা অনুগ্রহ করিয়া পুনর্ব্বার পড়ুন। তখন আমি সেই পত্রে পড়িলাম,যথা; ‘আমি দৃঢ় বিশ্বাস করিতেছি যে এই যুব পুরুষ নিতান্ত যীশু খ্রীষ্টের একজন মনোনীত পাত্র; ইহার একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে, অর্থাৎ তিনি পরের পরিত্রাণের বিষয়ে অতিশয় চেষ্টান্বিত হন।’ প্রেমচাঁদ ও ফুলমণি ইহা শুনিয়া বড় আহ্লাদিত হইল, কারণ তাহারা অনেক দিন অবধি সুন্দরীর নিমিত্তে এক জন ধার্ম্মিক এবং উপযুক্ত বর অন্বেষণ করিতেছে। পরে আমার পরামর্শানুসারে তাহারা ঐ বাবুকে কল্য তাহাদের গৃহে সুন্দরীকে দেখাইবার কারণ ভোজনের নিমন্ত্রণ করিল। তাহাতে কল্য সন্ধ্যার সময়ে তিনি অত্যুত্তম পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া এখানহইতে প্রেমচাঁদের বাটীতে গমন করিলেন। যাইবার পূর্ব্বে আমি তাঁহাকে সুন্দরীর ধার্ম্মিক চরিত্রের বিষয় জ্ঞাত করিলাম। তিনি কি কারণে প্রেমচাঁদের ঘরে যাইবেন, তাহা ফুলমণি আপন মেয়্যাকে না জানাইয়া কেবল এই কথা কহিল, যে বাবু কলিকাতাহইতে আসিয়া পাদরি সাহেবের গৃহে রহিয়াছেন, আমরা তাহাকে অদ্য নিমন্ত্রণ করিয়াছি। বাবু সেখানে উপস্থিত হইয়া সুন্দরীর সৌন্দর্য্য দেখিবামাত্র তাহাতে অতিশয় আসক্ত হইয়া ফুলমণিকে কহিলেন, আমি গেলে পর এবিষয়ে তোমার মেয়্যার কি ইচ্ছা হয়, তাহা তুমি জিজ্ঞাসা করিও; সে যদি আমাকে বিবাহ করিতে সম্মতা হয়, তবে আমি সন্তুষ্ট হইয়া এই কর্ম্ম করিব। কিন্তু অদ্য প্রাতঃকালে সুন্দরীর পিতা মাতা তাহাকে সেই কথা জানাইলে সে একেবারে ঐ বাবুকে বিবাহ করিতে অস্বীকার করিয়া আর কোন কারণ না দিয়া কেবল ইহাই কহিল; আমি তাঁহাকে চিনি না, এবং তিনিও আমার মনকে জানেন না, অতএব বিবাহ করিলে পশ্চাতে আমাদের সুখ কি দুঃখ হইবে তাহা নিশ্চয় নাই। ফুলমণি এমত কথা বুঝিতে না পারিয়া বলে, আমি তো বিবাহের পূর্ব্বে সুন্দরীর পিতাকে চিনিতাম না, তবে আমার কেন এত সুখ হইয়াছে? সকলে যাহাকে ধার্ম্মিক বলে এমত স্বামিকে পাইলে হয়, তাহাকে চিনিবার কোন আবশ্যক নাই।
তখন আমি পাদরি সাহেবকে কহিলাম, বোধ হয়, এ বার আমাদের বন্ধু ফুলমণি বড় ভালরূপে বিবেচনা করে নাই; আপনি কি বুঝেন, মহাশয়?
পাদরি সাহেব বলিলেন, মেম সাহেব, ইংরাজদের মধ্যে ধর্ম্মভিন্ন স্ত্রী ও স্বামিতে আর অনেক গুণ অন্বেষণ করা যায় বটে। যে স্ত্রীপুরুষের মনের রুচি ও স্বভাব ও বাঞ্ছা এবং রীতি সকল এক হয়, সেই স্ত্রী পুরুষ অবশ্য অন্যদের অপেক্ষা সুখে কাল যাপন করিয়া থাকে, এবং বিবাহ করিতে গেলে এমত ঐক্যতা আমাদের অন্বেষণ করা উচিত বটে। কিন্তু বিবেচনা করিয়া দেখুন, বাঙ্গালি মেয়্যারা ইংরাজদের মত বিবাহের পূর্ব্বে পুরুষদের সহিত আলাপ করিতে পায় না, এবং আলাপ না করিলে তাহাদের মনের ভাব কেমন তাহা তাহারা কি প্রকারে জ্ঞাত হইতে পারিবে? এই জন্যে বলি, যে পর্য্যন্ত বাঙ্গালি মেয়্যারা আপনাদের স্বামিকে আপনারা মনোনীত করিতে না পারে, সেই পর্য্যন্ত তাহারা বিবাহের বিষয়ে স্ব২ পিতা মাতাদের ও মণ্ডলীর অধ্যক্ষগণের পরামর্শানুসারে চলুক।
আমি বলিলাম, হাঁ মহাশয়, একথা সত্য হইতে পারে বটে, তথাপি আমি স্বীকার করিতেছি, যে এই দেশীয় মেয়্যারা যখন বিবাহের বিষয়ে কিঞ্চিৎ স্বাধীনতা প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিবে, তখন আমি বড় আহ্লাদিতা হইব; কিন্তু সে যাহা হউক, উক্ত বিষয় কিছু স্থির হইয়াছে কি না?
পাদরি সাহেব উত্তর করিলেন, মেম সাহেব, সন্ধ্যাকালে ফুলমণি আপন মেয়্যাকে লইয়া এখানে আসিবে, তখন বোধ হয় এবিষয় কিছু স্থির করিতে পারিব। ফুলমণির অভিলাষ এই যে আমি সুন্দরীকে বুঝাইয়া কোনরূপে সম্মত করাই; কিন্তু আমি তাহা কখন করিব না, কেননা বিবাহের কথাবার্ত্তাতে হাত দেওয়া বড় কঠিন বিষয়। যাহা হউক, সুন্দরী কি জন্যে এই ব্যক্তিতে সম্মত হয় না, তাহা আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিব; বোধ হয় তাহার মনে কোন বিশেষ কারণ থাকিবে।
পরে এই বিষয়ে কি হইবে, তাহা শুনিতে অতিশয় ইচ্ছুক হইয়া আমি ফুলমণির অপেক্ষায় পাদরি সাহেবের বাটীতে রহিলাম।
প্রায় এক ঘণ্টা গত হইলে ফুলমণি সুন্দরীকে লইয়া আইল। অন্য বিষয়ের কিছু কথাবার্ত্তা হইলে পর সাহেব সুন্দরীকে কহিলেন, দেখ সুন্দরি, তুমি এই বাবুকে বিবাহ করিতে অসম্মতা হইয়া আপন মাতাকে বলিয়াছ, যে আমি তাঁহাকে চিনি না। ভাল, তুমি কিছু দিন তাঁহার সহিত আলাপ করিয়া পরে এবিষয়ে যথার্থ উত্তর দিও। কিন্তু ইহা যদি করিতে না চাহ, তবে তুমি কি নিমিত্তে তাঁহাকে বিবাহ করিবা না, তাহা সত্য করিয়া আমাকে বল।
বাবুর সহিত যে আলাপ হয়, সুন্দরীর এমত ইচ্ছা ছিল না; বরং সে মাথা হেট করিয়া কহিল, মহাশয়! আপনি যদি এমত স্পষ্টরূপে জিজ্ঞাসা করেন, তবে আমাকে বলিতে হইল। এ ব্যক্তিকে যে বিবাহ করিতে চাহি না, আমার মনে ইহার একটি বিশেষ কারণ আছে বটে; কিন্তু তাহা প্রকাশ করিলে আমি স্বদেশীয় লোকদের নিকটে অবশ্য নিন্দিতা হইব, তথাচ আমি নিশ্চয় জানি যে এবিষয়েতে আমার কোন দোষ নাই।
এই কথা শুনিয়া ফুলমণি কহিল, সুন্দরি, তোমার মনে যাহা আছে তাহা নির্ভয়ে বল। তুমি যদি ঈশ্বরের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন কর্ম্ম না করিয়া থাক, তবে তোমার পিতা মাতা তোমাকে কখন দোষ দিবে না; অন্য লোকেরা যাহা বলে বলুক, তাহাতে তোমার কিছু আইসে যায় না।
আমি কহিলাম, সুন্দরি, একথা সত্য, তোমার পিতা মাতার নিকটে কোন কথা গোপন রাখা বিহিত নয়; অতএব তুমি এ ব্যক্তিকে কেন বিবাহ করিতে চাহ না, ইহার কারণ স্পষ্ট করিয়া বল।
সুন্দরী অধোদৃষ্টি করিয়া কহিল, তাহার কারণ এই, আমি অন্য এক জনকে প্রেম করিতেছি। আমার মেম তাঁহাকে চিনেন, সে যুবা তাঁহার বৃদ্ধ মালির পুত্ত্র।
ডাক্তর সাহেবের বিবি একথা শুনিয়া কহিলেন, আহা! আমি কতবার মনে করিয়াছি যে চন্দ্রকান্ত সুন্দরীর উপযুক্ত স্বামী হইত বটে, কিন্তু ডাক্তর কহিতেন আর দুই তিন বৎসর পর্য্যন্ত চন্দ্রকান্তকে শিক্ষা করিতে হইবে, তাহার পর সে কোন লাভজনক পদে নিযুক্ত হইতে পারিবে। ইহা শুনিয়া আমি ভাবিতাম, সুন্দরীর বয়ঃক্রম এখন প্রায় পোনের বৎসর হইয়াছে, অতএব তাহার পিতা মাতা তাহাকে বিবাহ না দিয়া আর দুই তিন বৎসর কখন রাখিবে না।
আমি জিজ্ঞাসিলাম, মেম সাহেব, এই চন্দ্রকান্ত কি প্রকার লোক? বিবি উত্তর করিলেন, সে আমাদের মালির পুত্ত্র বটে, ও তাহার সহিত থাকিয়া প্রথমতঃ বাগানের কর্ম্ম শিখিত, কিন্তু এখন সে আপন পিতা অপেক্ষা বড় জ্ঞানী হইয়া উঠিয়াছে। বৎসর তিনেক হইল, আমার স্বামী ছবিযুক্ত একখান ইংরাজী পুষ্প বৃতান্ত পুস্তক বৃদ্ধ মালিকে দিয়া কহিয়াছিলেন, শুন মালি, যে সকল বিলাতীয় ফুল এদেশে জন্মিতে পারে তাহা আমি আপন বাগানে আনিয়া রাখিতে ইচ্ছা করি। অতএব তুমি এই সকল ফুলের ছবি ভাল করিয়া দেখ; পরে ইহার মধ্যে যত ফুল এদেশীয় ফুলের সমান হয়, তাহা আমাকে বলিও। চন্দ্রকান্ত সর্ব্বদা নানা প্রকার বৃক্ষের নামাদি ও বিশেষ২ গুণ তত্ত্ব করিত, তাহাতে ঐ পুস্তক পাইয়া সে ঘরে বসিয়া পুষ্পের ছবি সকল আপনা আপনি তুলিতে লাগিল, পরে সাহেবের কাছে আনিয়া দেখাইল। সাহেব তাহা দেখিয়া আশ্চর্য্য জ্ঞান করিলেন, কারণ ঐ বালক নক্সা তুলিতে কখন কিছু শিক্ষা পায় নাই, আর সে কেবল নীল ও আলতা দিয়া ঐ সকল ছবি লিখিয়াছিল, তথাপি সে দেখিতে মন্দ হয় নাই। ইহাতে সাহেব সন্তুষ্ট হইয়া চন্দ্রকান্তকে উদ্ভিদ্বিদ্যা শিক্ষা করাইতে মনস্থ করিলেন। চন্দ্রকান্ত স্বভাবতঃ অতি গুণশীল ব্যক্তি। সে প্রথমে সপ্তাহের মধ্যে দুইবার আমার স্বামির নিকটে গিয়া উদ্ভিদ্বিদ্যা এবং নক্সার বিদ্যা শিক্ষা করিত; পরে ডাক্তর সাহেবদের গৃহে যে প্রকার ছবি থাকে, (অর্থাৎ মানুষের অস্থি ও কলিজা ইত্যাদির ছবি) তাহা দেখিয়া চন্দ্রকান্ত আপনা আপনি সেইরূপ ছবি তুলিতে লাগিল, এবং মনুষ্যের শরীরের মধ্যে কি২ আছে, তাহাও শিক্ষা করিত। সাহেব তাহার এই প্রকার অনুশীলন দেখিয়া তাহাকে ডাক্তরের কর্ম্ম শিখাইতে আরম্ভ করিলেন, তাহাতে সে ঐ বিদ্যাতে এমত নিপুণ হইয়া উঠিয়াছে, যে সাহেব অনুমান করেন দুই তিন বৎসরের মধ্যে সে কোম্পানির কোন ডাক্তর খানায় প্রধান চিকিৎসক হইয়া মাসে২ দেড়শত টাকা উপার্জ্জন করিতে পারিবে। চন্দ্রকান্ত বিদ্যাতে নিপুণ তাহা কেবল নয়, ধর্ম্মের বিষয়েও তাহার বড় অনুরাগ আছে, এবং সে আপন বৃদ্ধ পিতা মাতার প্রতি অতিশয় প্রেম ও ভক্তি করে।
পরে বিবি সুন্দরীর প্রতি ফিরিয়া বলিলেন, সে যাহা হউক, সুন্দরি, চন্দ্রকান্তের সদ্গুণের বিষয় তুমি কি প্রকারে জ্ঞাত হইলা, ইহা আমি বুঝিতে পারিলাম না; কারণ আমি তোমার সাক্ষাতে তাহার প্রশংসা কখন করি নাই, এবং তাহার সহিত কথোপকথন করিতে তোমাকে নিষেধ করিয়াছি। অতএব তাহার প্রতি তোমার প্রেম কি প্রকারে জন্মিল, তাহা তুমি বল।
সুন্দরী কহিল, মেম সাহেব, আমি তাঁহার সহিত কথোপকথন কখন করি নাই, কিন্তু তাঁহার মাতা আমাকে অনেকবার বলিয়াছে, যে আমার পুত্ত্র তোমা বিনা আর কাহাকেও বিবাহ করিবে না; এবং তাহার এই ইচ্ছা ছিল, যেন আমি প্রতিজ্ঞা করি, তিন বৎসর পরে চন্দ্রকান্তকে বিবাহ করিব। কিন্তু আমি কহিলাম, পিতা মাতাকে জিজ্ঞাসা না করিলে কোন প্রতিজ্ঞা করিব না। আমি কলিকাতায় ফিরিয়া যাওনের অগ্রে মাকে এই কথা বলিতে মানস করিয়াছিলাম, কিন্তু এত দিন ভয় প্রযুক্ত বলিতে পারি নাই, পাছে তিনি বলেন, তোমার বিবাহ দিতে আমরা এত বিলম্ব করিব না।
পাদরি সাহেব ইহা শুনিয়া কহিলেন, তবে সুন্দরি, তোমার নিজ কথাদ্বারা জানা যাইতেছে যে তুমি এই বাবু অপেক্ষা চন্দ্রকান্তকে ভালরূপে চিন না।
সুন্দরী কহিল, না মহাশয়, এমত নয়। আমি চন্দ্রকান্তকে প্রত্যহ দেখি, ও তাঁহার পিতা মাতার প্রতি তাঁহার প্রেমিক ব্যবহার জানি; এবং ধর্ম্মের বিষয়ে তাঁহার যেরূপ অনুরাগ আছে, তাহাও আমি জ্ঞাতা আছি, কারণ তিনি প্রতিদিবস সন্ধ্যাকালে তেঁতুল গাছতলায় বসিয়া হিন্দু ও মুসলমান দাসদিগকে যীশু খ্রীষ্টের বিষয় বলিয়া সদুপদেশ দিয়া থাকেন। তিনি কেবল এক বার আমাকে একটি কথা মাত্র বলিয়াছিলেন। যে দিবস মেম সাহেবের ছোট বাবা মরিল, সেই দিবস আমি কবর সিন্দুকের নিকটে দাঁড়াইয়া কাঁদিতেছিলাম, এমত সময়ে চন্দ্রকান্ত ভিতরে আসিয়া এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া মৃদুরবে কহিলেন, সুন্দরি, তুমি কাঁদিও না; ঈশ্বর তোমার ছোট কোমল চারাকে আপন উদ্যানে তুলিয়া লইয়াছেন, যেন সেথায় সে বৃদ্ধি পাইয়া ফুলেতে ও ফলেতে পরিপূর্ণ হয়। আমাদের বাটীর উত্তরে যে বড় বাগান আছে, তাহাতে সাহেব যদি কোন অত্যুত্তম কিম্বা কোমল ফুলগাছ দেখেন, তবে তিনি আমার পিতাকে বলেন, মালি, এই চারাটি আমার দক্ষিণদিক্স্থ ছোট বাগানে রাখিতে হইবে, তাহাতে আমি আপনি তাহার তত্ত্বাবধারণ করিয়া তাহার সৌরভে আমোদিত হইব। সেই রূপে ঈশ্বর আমাদের ছোট মিসিবাবাকে লইয়া ইহা অপেক্ষা ভাল স্থানে রাখিয়াছেন।
এই কথা শুনিয়া ডাক্তর সাহেবের মেম কহিলেন,আহা! এ কেমন সুন্দর দৃষ্টান্ত! ইহা কহিয়া তাঁহার চক্ষুঃ জলেতে পূর্ণ হইল, কারণ তিনি ইহার আট মাস পূর্ব্বে সেই প্রিয় সন্ততিকে কবরে রাখিয়াছিলেন, তখন ইহা তাঁহার মনে পড়িল।
সুন্দরী কহিল, হাঁ মেম সাহেব, ঐ দৃষ্টান্ত অতি সুন্দর বটে। আমি সেই দিন অবধি চন্দ্রকান্তকে পূর্ব্বাপেক্ষা ভাল বোধ করিলাম; আর ঐ কথা শুনিবা মাত্র আমার প্রিয় মাতাকে স্মরণ হইল, কারণ তিনি সর্ব্বদা আপন ফুলগাছের সহিত পারমার্থিক বিষয়ের তুলনা দিয়া থাকেন।
তখন পাদরি সাহেব জিজ্ঞাসিলেন, ফুলমণি, তুমি এবিষয় শুনিলা, এখন কি বল?
ফুলমণি উত্তর করিল, মহাশয়, আমার মেয়্যা যদি দুই তিন বৎসর পর্য্যন্ত এমত ধার্ম্মিক স্বামির অপেক্ষাতে থাকে, তবে তাহাতে আমি সম্মতা আছি; কিন্তু তখন সুন্দরীর আঠারো বৎসর বয়স হইবে, অতএব চন্দ্রকান্তের সহিত তাহার বিবাহের বিষয় সকল যদি স্থির করিয়া রাখা যায়, তবে কিছু বিলম্ব হইলে ক্ষতি নাই।
ডাক্তর সাহেবের বিবি কহিলেন, দেখ ফুলমণি, তোমার মেয়্যা আপনি বলিতেছে যে চন্দ্রকান্ত তাহাকে বিবাহ করিতে চাহে; এমত যদি হয়, তবে আমি তোমার সাক্ষাতে বলিয়া যাইতেছি, আমি ঘরে পৌঁছিবা মাত্র চন্দ্রকান্ত ও তাহার পিতা মাতার সহিত এ বিষয় স্থির করিব; এবং ঐ যুব পুরুষের বিষয় আমি সাহসপূর্ব্বক বলিতে পারি, সে যদি বাঁচিয়া থাকে, তবে যাহা অঙ্গীকার করিবে তাহা সাধ্য পর্য্যন্ত সিদ্ধ করিবে।
তখন সুন্দরী প্রফুল্ল বদন হইয়া ফুলমণিকে কহিল, দেখ মা, এবিষয়েও বিবেচনা করিও, যুবতী স্ত্রীলোকেরা আপন শ্বশুর শাশুড়ী কর্ত্তৃক অনেকবার বিরক্তা হয়, কারণ তাহারা বধূর প্রতি প্রায় ক্রূর ব্যবহার করিয়া থাকে, কিন্তু চন্দ্রকান্তের পিতা মাতা ধার্ম্মিক লোক, এবং যে অবধি আমি কলিকাতায় গিয়াছিলাম, সেই অবধি তাঁহারা আমার প্রতি অতিশয় প্রেমিক ব্যবহার করিয়াছেন, অতএব তাঁহারা পশ্চাতে যে আমাকে দুঃখ দিবেন, এমত কখন বোধ হয় না। ও মা! কলিকাতার বাবু অপেক্ষা চন্দ্রকান্তকে বিবাহ্ করা ভাল, ইহার আর একটি কারণ দেখাইতে পারি; ঐ বাবু কেবল আমার মুখ দেখিয়া আমাকে বিবাহ করিতে চাহেন, কিন্তু ইহা করা বিহিত নয়, কারণ এ এক প্রকার স্ত্রীর নিমিত্তে গুলিবাঁট করা হইল। গুলিতে ভাল কি মন্দ স্ত্রী উঠিবে তাহা তো জানা যায় না, অতএব কন্যাদের মনের গুণ সকল তত্ত্ব করিয়া পরে তাহাদিগকে বিবাহ করিলে ভাল হয়। দেখ, মালির পুত্ত্র এমত করিয়াছে; এক বৎসর পর্য্যন্ত প্রত্যহ তিনি আমার ব্যবহার দেখিয়া আমাকে বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন। এখন আমি ভাল হই কি মন্দ হই তাহা যদি জানিয়া বিবাহ করেন, তবে পশ্চাতে তাঁহার আশা ভঙ্গ হইবে না।
এই কথা শুনিয়া আমরা সকলে কহিলাম, সুন্দরি, তুমি এ বিষয় উত্তমরূপে বিবেচনা করিয়াছ। পরে ফুলমণি আপন মেয়্যাকে সঙ্গে করিয়া বিদায় লইল।
তাহারা প্রস্থান করিলে পর আমি পাদরি সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলাম, মহাশয়, আপনি কি সুন্দরীকে দোষ দিতে পারেন? তিনি বলিলেন, না, তাহাকে দোষ দেওয়া যায় না, কারণ সে অকপট রূপে সাধু ব্যবহার করিয়াছে। বঙ্গদেশস্থ সকল খ্রীষ্টিয়ান মেয়্যারা যদি সুন্দরীর ন্যায় হইত, তবে তাহারা প্রায় ইংরাজদের মত বিবাহের পূর্ব্বে আপনাদের স্বামিদিগকে মনোনীত করিয়া লইতে পারিত।
ডাক্তর সাহেবের বিবি কহিলেন, আহা! আমি কেমন আহ্লাদিতা হইলাম, যে ঐ প্রিয়া কন্যা আমার নিকটে নিত্য থাকিতে পারিবে। চন্দ্রকান্তের সহিত তাহার বিবাহ হইলে পর আমি আপন বাটীর সীমার মধ্যে তাহাদের জন্যে এক খানা ঘর বাঁধাইয়া সর্ব্বদা তাহাদিগকে সেই খানে রাখিব।
পরে পাদরি সাহেব পুনর্ব্বার বলিলেন, ভাল, এখন দেখিতেছি যে সকলে আহ্লাদিত হইয়াছে, কেবল আমার যুব বন্ধুর বিষয়ে কেহ কিছু মনোযোগ করে নাই। তিনি স্ত্রী খুজিতে এত দূর আসিয়াছেন, এখন আমি কি বলিয়া তাঁহাকে রিক্ত হস্তে ফিরাইয়া দিব?
আমি কহিলাম, মহাশয়, আমি ইহার একটি উপায় দেখাইতে পারি। যদি সে বাবু বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করিতে সম্মত হন, তবে রাণীকে বিবাহ করুন; সুন্দরী ছাড়া তেমন মেয়্যা আর কোন স্থানে পাইবেন না।
পাদরি সাহেব ঐ কথাতে বড় সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, হা মেম সাহেব, আপনি ভাল বলিয়াছেন। রাণীর বিষয় এতক্ষণ স্মরণ হয় নাই, সে বাবুর পক্ষে উত্তম স্ত্রী হইবে বটে, কারণ রাণী জ্ঞানী মেয়্যা, এবং এখন দেখিতেছি যে সে সম্পূর্ণরূপে খ্রীষ্টের লোক হইয়াছে। তাহার পূর্ব্ব স্বামির মূর্খতা ও দুষ্টতা প্রযুক্ত সে তাহার সহিত সুখে বাস করিতে পারিত না বটে; কিন্তু যদ্যপি উপযুক্ত স্বামিকে পাইত, তবে ঐ সকল গোলমাল কখন হইত না। বোধ হয়, যদি বাবু তাহাকে বিবাহ করেন, তবে তাঁহারা উভয়ে বড় সুখে কালযাপন করিবেন।
অতঃপর রাণীর বিষয় বাবুকে জ্ঞাত করা গেল, তাহাতে তিনি দুই তিন বার তাহার সহিত কথোপকথন করিয়া তাহাকে বিবাহ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন; এবং রাণীও তাহাতে আহ্লাদ পূর্ব্বক সম্মতা হইল, কারণ তাহার দুষ্টা শাশুড়ী তাহাকে বড় ক্লেশ দিত। বাবুর আগমনের প্রায় এক মাস পরে রাণীর সহিত তাহার বিবাহের কথা গীর্জা ঘরে তিন রবিবার পর্য্যন্ত প্রচার হইলে কেহ তাহাতে বাধা না দেওয়াতে, আগত বৃহস্পতিবারে তাহাদিগের বিবাহ দিতে স্থির করা গেল। কেবল এক বিষয়ে একটি গোল উপস্থিত হইল। রাণী আপনার ছোট মেয়্যা সুমতিকে সঙ্গে লইয়া কলিকাতায় যাইতে চাহিল, কিন্তু ঐ মেয়্যার পিতা মধু মৃত্যুকালে বলিয়া গিয়াছিল, যে আমার ছেল্যাকে এস্থানের পাদরি সাহেবের মেমের স্কুলে দিও; এবং রাণীর শাশুড়ী বড় রাগ প্রকাশ করিয়া কহিল, ঐ মেয়্যা আমার, তুমি তাহাকে কখন লইয়া যাইতে পারিবা না। রাণী ইহাতে অতিশয় দুঃখিতা হইয়া কাঁদিতে লাগিল।
তখন ফুলমণি বলিল, মধু আমাকে আপনার সন্তানের ভার দিয়া ইহা কহিল, সে যেন ধর্ম্মের বিষয় শিক্ষা পায় এই জন্যে তাহাকে পাদরি সাহেবের মেমের স্কুলে দিও; ইহাতে স্পষ্ট বোধ হয় যে মধুর কেবল এই বাঞ্ছা ছিল, যেন আমার ছেল্যা ধার্ম্মিক হয়। অতএব সুমতি কাহার নিকটে থাকে কিম্বা কোন্ স্কুলে যায়, ইহা অতিক্ষুদ্র বিষয়, মেয়্যাটি ধার্ম্মিক হইলে হয়। আমি বোধ করি, ইহাই সাধন করণার্থে তাহাকে আপন মাতার কাছে রাখিলে ভাল হয়, কেননা যে সময়ে মধু মরিল, সে সময়ে রাণী ধর্ম্মের বিষয়ে বড় একটা মনোযোগ করিত না; কিন্তু এখন সে ধর্ম্মকে অতিশয় প্রিয়জ্ঞান করে, অতএব সে আপন মেয়্যাকে সুপথে লওয়াইতে অবশ্য চেষ্টা করিবে।
ফুলমণির এই কথাতে আমরা সকলে সম্মত হইলে ইহা স্থির হইল যে ছোট সুমতি আপন মায়ের সহিত কলিকাতায় যাইবে। রাণীর শাশুড়ী ইহাতে বড় রাগান্বিতা হইল, কিন্তু তাহার সান্ত্বনার্থে রাণী আপন পূর্ব্ব স্বামির ঘর জমী ইত্যাদি যাহা ছিল, সকলি তাহাকে দিয়া কহিল, ওগো! যত দিন তুমি বাঁচিয়া থাক তত দিন তুমি জমী আদির খাজনা ভোগ করিও; এবং যখন মরিবা তখন তোমার নাতনীকে সকলি দিয়া যাইও; আমি ঐ ধনের লেশ মাত্র স্পর্শ করিব না। রাণীর এই সুশীল ব্যবহার প্রযুক্ত তাহার শাশুড়ীর যাবজ্জীবন কোন দ্রব্যের অভাব ছিল না।
পাঠকবর্গেরা অনেক্ষণ পর্য্যন্ত আমার আয়ার বিষয়ে কিছু কথা শ্রবণ করেন নাই, কিন্তু এখন লিখিতে হইল, আয়া অনেক কাল ধার্ম্মিক আচরণ করিয়া সম্প্রতি বাপ্টাইজ[২] হইতে অতিশয় ইচ্ছুক হইল। তাহাতে পাদরি সাহেব স্থির করিলেন, যে দিবসে রাণীর বিবাহ দেওয়া যাইবে, সেই দিবসে আয়া বাপ্টাইজিতা হইবে।
আহা! ঐ দিবস আমার পক্ষে কেমন আনন্দের দিন হইল; কেবল আমার পক্ষে হইল তাহা নয়, বরং সমুদয় খ্রীষ্টিয়ান পাড়ার লোক সকল সেই দিনে উল্লাসিত হইল।
রাণীর পিতা মাতা না থাকাতে আমি তাহার জন্যে বিবাহের ভোজ প্রস্তুত করিতে চাহিয়া পাদরি সাহেবকে জিজ্ঞাসিলাম, মহাশয়, আপনার মণ্ডলীর লোকেরা যদি সেই দিবসে কিঞ্চিৎ উৎসব করে, তবে আপনি কি তাহাতে অসন্তুষ্ট হইবেন? তিনি কহিলেন, না, আমি অসন্তুষ্ট হইব কেন? আমাদের প্রভু আপনি বিবাহের ভোজে উপস্থিত হইয়া তাহা সম্ভ্রান্ত করিলেন। অতএব আপনি আমার লোকদের জন্যে যদি ভোজ প্রস্তুত করেন, তবে ভাল; আমিও তাহাদের আমোদ দেখিয়া আমোদিত হইব। কিন্তু যাহারা অতিশয় দরিদ্র কিম্বা যাহারা ঋণে বদ্ধ আছে, এমত ব্যক্তিরা যদি বিবাহের সময়ে অন্যের টাকা লইয়া উৎসব করে, কিম্বা স্ত্রীর নিমিত্তে গহনা ক্রয় করে, তবে আমি তাহাদের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হই বটে।
এই কথা শুনিয়া আমি প্রেমচাঁদকে টাকা দিয়া তাবৎ আবশ্যক দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করিতে বলিলাম। পরে বিবাহের দিন উপস্থিত হইলে পাড়ার মধ্যে কোন পরিষ্কার স্থানে একটি বৃহৎ লাল ও শাদা কাপড়ের চন্দ্রাতপ টাঙ্গান গেল, এবং ভূমিতে বিছাইবার জন্যে আমি কএকটি শপ পাঠাইয়া দিলাম। ফুলমণির সন্তানেরা ছোট নবীনকে সঙ্গে করিয়া সুদৃশ্য ফুল ও পাতার হার গাঁথিয়া ঐ চন্দ্রাতপের চতুষ্পার্শ্বে টাঙ্গাইয়া দিল। নবীনের বিষয়ে এস্থানে বলিতে হয়, যদ্যপি সে লেখা পড়াতে বড় নিপুণ ছিলনা, তথাপি ক্রমে২ অত্যুত্তম বালক হইয়া খানসামার কর্ম্ম উত্তম রূপে শিখিয়াছিল। ফুলমণি এবং আর চারি জন স্ত্রীলোক বিবাহে না গিয়া ভোর অবধি ঐ ভোজ প্রস্তুত করিতে লাগিল। এগার ঘণ্টা হইলে আমি আয়াকে আপন গাড়ীতে লইয়া রাণীকে গীর্জায় লইবার নিমিত্তে খ্রীষ্টিয়ান পাড়াতে গেলাম। রাণী অতি সুন্দর গোলাপি রঙ্গের একখানা রেসমের শাড়ি পরিয়া প্রস্তুতা হইয়া আমার অপেক্ষায় ফুলমণির ঘরে বসিয়া ছিল; তাহাতে আমার গাড়ী দেখিবামাত্র সে প্রফুল্ল বদন হইয়া বাহিরে আইল। রাণী যদ্যপি সুন্দরীর সমান রূপবতী ছিলনা, তথাপি সে দিবসে যাহারা তাহাকে দেখিল, সকলে অতি সুরূপা বলিয়া সর্ব্ব প্রকারে তাহার প্রশংসা করিল। আমার বিশ্বস্থা আয়া প্রায় তাবৎ পথ কাঁদিতে২ গেল; কিন্তু ঐ অশ্রুপাত দুঃখপ্রযুক্ত নয়, কেবল ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতাদ্বারা হইল। সে একবার আপনা আপনি উচ্চৈঃস্বরে বলিল, হে পরমেশ্বর! দীনহীন পাপিষ্ঠা যে আমি, আমার প্রতি তুমি কেমন দয়া প্রকাশ করিয়াছ; এবং যাইতে২ সে আর দুই তিন বার কহিল, হে পিতঃ, তোমার ধন্যবাদ করি!
পরে আমরা গীর্জায় উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, পাদরি সাহেব বরকে লইয়া আমাদের অপেক্ষায় বসিয়া আছেন, অতএব তিনি প্রথমে আয়াকে বাপ্টাইজ করিয়া পরে রাণীর বিবাহ দিলেন। বিবাহ হইলে পর আমরা পুনরায় সকলে খ্রীষ্টিয়ান পাড়ায় ফিরিয়া গেলাম। বিবাহের ভোজ প্রস্তুত হইবামাত্র পাড়ার তাবৎ লোক উক্ত চন্দ্রাতপের নীচে বসিয়া ভোজন করিতে লাগিল। সকল নিমন্ত্রিত লোকদের মুখ প্রফুল্লিত ছিল, এক জনেরও বিষণ্ণ বদন দৃশ্য হইল না।
ভোজন সাঙ্গ হইলে লোকেরা বিবাহের গীত গাইল, পরে পাদরি সাহেব গাত্রোত্থান করিয়া নূতন খ্রীষ্টিয়ানীর এবং বর কন্যার অনুরোধে ঈশ্বরের স্থানে প্রার্থনা করিলেন। তখন রাণী ও তাহার স্বামী ফুলমণির বাটীতে গমন করিল। ফুলমণি রাণীর প্রতি মাতাস্বরূপ ব্যবহার করিয়াছিল, অতএব সে এখন তাহাদিগকে রাখিতে চাহিলে তাহারা কলিকাতায় যাইবার পূর্ব্বে তাহার গৃহে দুই তিন দিন থাকিতে স্থির করিল। রাণীর নিকটে বিদায় হইবার সময়ে আমি তাহাকে একাকিনী কিছু সদুপদেশ দিতে চাহিয়া তাহার সঙ্গে২ ফুলমণির গৃহে গেলাম। কুঠরীর মধ্যে আমরা উভয়ে বিস্তর অশ্রুপাত করিলাম; শেষে তাহাকে অনেক প্রেমের কথা কহিয়া আমি বাহিরে আসিয়া শীঘ্র গাড়ীতে উঠিতেছিলাম, এমন সময়ে করুণা একখানা উত্তম তসর শাড়ি পরিয়া উপস্থিত হইল।
করুণা আমাকে দেখিয়া বলিতে লাগিল, ও মেম সাহেব, একটু বিলম্ব করিয়া আমার সৌভাগ্যের কথা শুনুন! ও ফুলমণি দেখ, নবীনের বাপ আমাকে এই শাড়ি খানি কিনিয়া দিয়াছে। ইহার মূল্য চারি টাকা, কিন্তু সে টাকা তাহার ধার করিতে হয় নাই, কেননা আমার স্বামী এখন প্রত্যহ কর্ম্মে যাইয়া আট দশ টাকা মাসে উপার্জন করে। অদ্য গীর্জায় যাইবার সময়ে সে এই শাড়ি খানি বাহির করিয়া বলিল, এই লও করুণা, সকলের স্ত্রী অদ্য ভাল কাপড় পরিবে, অতএব তুমি কেন মোটা কাপড় পরিয়া যাইবা? আমার যদি শক্তি থাকিত, তবে আমি তোমাকে দশ টাকার শাড়ি আনিয়া দিতাম, কেননা তুমি তাহার যোগ্যপাত্র বটে। পরে করুণা আরো উল্লাসিতা হইয়া বলিতে লাগিল, মেম সাহেব, দশ টাকার শাড়ি আমার কি আবশ্যক? তাহার নিকটে যে এমত প্রেমিক কথা শুনিলাম, সেই আমার যথেষ্ট হইল। এবং এই শাড়ি খানি যে মন্দ তাহাও নয়; আমার বিবাহের দিবস অবধি আজি পর্য্যন্ত আমি রেসমের কাপড় কখন পরি নাই, কিন্তু অদ্য আমার এই সৌভাগ্য হইল।
এই ক্ষুদ্র ঘটনাতে প্রকাশ হইল যে করুণা মৃদু ব্যবহার ও শিষ্ট কথাদ্বারা আপন দুষ্ট স্বামিকে নিতান্ত বশীভূত করিয়াছিল। হে পাঠক বর্গেরা! তোমাদের মধ্যে কাহারও পতি যদি অশিষ্ট থাকে, তবে সে করুণার অনুকারিণী হউক।
ফুলমণি আপন বন্ধুর কথা শুনিয়া আহ্লাদপূর্ব্বক স্বর্গের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিল, পরমেশ্বরের নাম ধন্য হউক, কারণ তিনিই মনুষ্যদের মনকে পরিবর্ত্ত করেন। আমি আনন্দ প্রযুক্ত কান্দিতে২ কিছুই বলিতে পারিলাম না, কিন্তু করুণার এমত কথা শুনিয়া আমার মন প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতাতে পরিপূর্ণ হইল। পরে গাড়ীতে আরোহণ করিয়া আমি ঐ দিবসের সকল ঘটনার নিমিত্তে ঈশ্বরের ধন্যবাদ করিতে২ আপন বাটীতে গেলাম।
উক্ত খ্রীষ্টিয়ান পরিবারগণের সহিত আমার প্রায় আরও দুই বৎসর পর্য্যন্ত নিত্য২ আলাপ হইত, কিন্তু তাহার পর আমাকে সপরিবারে সে নগর ছাড়িয়া অন্য স্থানে যাইতে হইল। তাহাতে আমরা পৃথক হইলে পরস্পর দুঃখিত হইলাম বটে, কিন্তু সাংসারিক লোকদের মত বিলাপ করিলাম না; কেননা এই দৃঢ় ভরসা ছিল, যে আমরা পুনর্ব্বার ঈশ্বরের সিংহাসনের সম্মুখে মিলিত হইয়া অনন্তকাল পর্য্যন্ত প্রভুর উদ্দেশে স্তব স্তুতির গীত গাইব।
করুণা শেষে সত্য খ্রীষ্টিয়ান হইল, কিন্তু সে ধর্ম্মেতে কখন প্রফুল্লিতা হইতে পারিল না; কেননা তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্ত্রের মৃত্যু অনেকবার মনে পড়িত, তাহাতে সে কখন২ ভাবিত, ঈশ্বর আমাকে গ্রাহ্য করিবেন না। এমত সময়ে সে কেবল প্রভুর বাক্য পাঠ করিয়া সান্ত্বনা পাইত। ফুলমণি আমাকে বলিয়াছে, করুণা কখন২ পাঁচ সাত ঘণ্টা পর্য্যন্ত বসিয়া ধর্ম্মপুস্তক পাঠ করিয়া থাকে। অল্প দিন হইল আমি কোন ব্যক্তির প্রমুখাৎ শুনিলাম, যে সুন্দরী আপন মনোনীত স্বামিকে বিবাহ করিয়া এক্ষণে বড় সুখে কাল যাপন করিতেছে; আর সে ব্যক্তি কহিল, যে সুন্দরীর দুই পুত্ত্র এক কন্যা হইয়াছে, এবং সে আপন মাতার মত তাহাদিগকে ঈশ্বরের বিষয় শিক্ষা দিয়া ধর্ম্মপথে লওয়াইতেছে।
এক্ষণে পাঠকবর্গের প্রতি আমার একটি নিবেদন আছে। তোমরা যে সকল লোকদের ইতিহাস পড়িয়াছ, তাহারা তোমাদেরই দেশের লোক; তোমাদের ন্যায় তাহারাও পূর্ব্বে হিন্দু ছিল, এবং তোমাদের আচার ব্যবহার ও রীতি মত তাহাদের আচার ব্যবহার ও রীতি ছিল, কিন্তু পশ্চাৎ তাহারা খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম গ্রহণ করিল। চেষ্টা করিলে তোমরা অনায়াসে ফুলমণির অনুগামী হইতে পার, কেননা সে কোন আশ্চর্য্য কর্ম্ম করিল না; অতএব যে কোন ব্যক্তির মন খ্রীষ্টের প্রতি নিতান্ত আসক্ত আছে, সে অবশ্য তাহার মত সদ্ব্যবহার করিতে পারিবে। এই হেতু আমি তোমাদিগকে বিনয় করিয়া বলি, ফুলমণি যেমন খ্রীষ্টের অনুকারী ছিল, তেমনি তোমরাও তাহার অনুকারী হও। সে দরিদ্রদের প্রতি কিরূপ দয়া করিত, ও অন্য লোকদের পারমার্থিক মঙ্গল কেমন চেষ্টা করিত, তাহা তোমরা বিবেচনা করিয়া তাহার পশ্চাদ্গামী হও। বিশেষতঃ, হে স্ত্রীগণ! সে যেরূপ আপন স্বামিকে প্রেম করিয়া তাহার গৃহ পরিষ্কার রাখিত, ও সকলের প্রতি সরল আচরণ করিয়া কেবল মিষ্ট বাক্য কহিত, তেমনি তোমরাও করিও। হে মাতাগণ! ফুলমণি যেরূপ আপন সন্তানদিগকে সুশিক্ষা দিয়া তাহাদের নিমিত্তে নিত্য২ প্রার্থনা করিত, ও তাহাদের সাক্ষাতে সর্ব্বদা সদ্ব্যবহার করিত, তেমনি তোমরাও করিও। আর বৃদ্ধা প্যারীর ইতিহাস বিস্মৃত হইও না। সে নিত্য২ ধর্ম্মপুস্তক পাঠ ও প্রার্থনা করিত, ইহাতে তোমরা তাহার অনুকারিণী হও। মধুর ভয়ানক মৃত্যু স্মরণ করিয়া তোমরা সাবধান ও সতর্কা হইয়া থাক, কেননা কোন্ দণ্ডে মৃত্যু আসিবে তাহা তোমরা জান না। আর করুণা যে সন্তানকে শিক্ষা দেয় নাই, তাহার মৃত দেহের উপর পড়িয়া সে যে রূপ বিলাপ করিল, তাহাও তোমাদের মনে থাকুক; এবং তোমরা যদি করুণার মত দোষী হইয়া এপর্য্যন্ত আপন সন্তানদিগকে ধর্ম্মোপদেশ না দিয়া থাক, তবে আমি বিনয় করি, তোমরা ঐ কুপথহইতে শীঘ্র ফির, এবং করুণা যেমন শেষে করিল, তেমনি তোমরাও যীশু খ্রীষ্টের চরণ ধরিয়া তাঁহার সত্য শিষ্য হও। তিনি কহেন, “হে পরিশ্রান্ত ও ভারাক্রান্ত লোক সকল! তোমরা আমার নিকটে আইস, আমি তোমাদিগকে বিশ্রাম দিব।”
উক্ত পরামর্শানুসারে যদি চল, তবে এই ক্ষুদ্র পুস্তক রচনা করণ তোমাদের পক্ষে বৃথা হইবে না, এবং রচনা কালে যে সকল প্রার্থনা পাঠকবর্গের নিমিত্তে ঈশ্বরের সিংহাসনের সম্মুখে করা গিয়াছে, তাহা সফলা হইবে। ইতি।
ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত সমাপ্ত।
